মানবাধিকার কমিশন ‘অস্তিত্বহীন’

ব্যক্তির মানবাধিকার একটি উচ্চ ধারণাগত বিষয়। এ ধারণা সুরক্ষাবিষয়ক ধারণা ও প্রতিকারের ধারণার ওপরও নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে একটি কার্যকরী মানবাধিকার কমিশন। দেশে মানবাধিকার, সুরক্ষার অধিকার ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে তার দেখভালের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের। অথচ এখনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ন্যূনতম ভূমিকা কোথাও দেখা যায় না।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে এন্তার সমস্যা নিয়ে চলা এ সংস্থার সক্ষমতা, দুর্বলতা নিয়ে সমালোচনা তো ছিলই; এখন চেয়ারম্যান ও সদস্যবিহীন কমিশনে সে সমস্যা আরও বেড়েছে। রাজনৈতিক সরকারের সময় নানা সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও শক্ত ভিত পাচ্ছে না অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় এ সংস্থাটি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্য পদ খালি রয়েছে পৌনে তিন মাস ধরে। ফলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ জমা পড়লেও বন্ধ রয়েছে প্রতিকারের পথ। একদিকে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন তারা অন্যদিকে কমিশনে কর্মরতদের দিন কাটছে অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আভাস নেই বললেই চলে, যার ফলে জনমনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে বিরূপ ধারণা বাড়ছে।

গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছর ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ৭ নভেম্বর তিন বছরের মেয়াদ শেষের আগেই পদত্যাগ করেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ। পদত্যাগ করেন একজন সার্বক্ষণিক সদস্যসহ ছয় সদস্য। ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর তারা নিয়োগ পেয়েছিলেন। সম্প্রতি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কমিশনের কার্যালয়ে গিয়ে জানা গেছে, চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদত্যাগের পর গত বছর ৮ নভেম্বর থেকে গত ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ১৪২টি অভিযোগ জমা পড়েছে কমিশনে। কিন্তু কমিশনের কিছু করার নেই। অভিযোগ ও সুয়োমোটো (স্বতঃপ্রণোদিত) অভিযোগের প্রতিকার বা সমাধানের পথ রুদ্ধ। কমিশনের দাপ্তরিক কাজ চলছে কোনোমতে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতন, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন, বল প্রয়োগে উচ্ছেদসহ দৃশ্যমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অভিযোগকারীদের পক্ষে অথবা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নালিশ আমলে নিয়ে কাজ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

সংস্থার সচিব সেবাস্টিন রেমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন আমরা শুধু অভিযোগই নিচ্ছি। কমিশন না থাকায় সমাধান দেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই। কমিশনের মূল যে কাজ অর্থাৎ অভিযোগের ওপর শুনানি, সুপারিশ এগুলো হচ্ছে না। আমরা শুধু রুটিনওয়ার্ক করছি।’ কমিশনের বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্বরত অন্তত চারজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা প্রচন্ড হতাশ। নাম প্রকাশ না করে এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে সমালোচনা আছে এ কথা ঠিক। কিন্তু এটি আইনের দুর্বলতার কারণে। কমিশন অন্তত ভুক্তভোগীর অভিযোগ নিয়ে প্রতিকারের পথ বাতলে দেয়। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি কিংবা কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে। ভুক্তভোগীরা আসছেন, কান্নাকাটি করছেন। অনেকের থানা বা আদালতে যেতে অস্বস্তি ও ভয় রয়েছে। তারা প্রতিকার চাইছেন কমিশনে। কিন্তু আমাদের কিছুই করার নেই।’

২০০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’ প্রণীত হয়। প্রতিষ্ঠার পর ১৫ বছরের বেশি সময় কমিশন ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, কমিশনের আইনের নানা দুর্বলতা ও ত্রুটি দীর্ঘ সময়েও সংশোধন করেনি আওয়ামী লীগ সরকার। উপরন্তু সেই সময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানটিকে অগুরুত্বপূর্ণ করে রাখা হয়েছে। আমলানির্ভর কমিশন, সার্বিক স্বাধীনতা না থাকা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষমতা না থাকা; কমিশনের নিজস্ব ভবন, কর্মরতদের আর্থিক সুবিধা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা না থাকা, দক্ষ আইনজীবী প্যানেলের ঘাটতি ছিল কমিশনে। বিশ্লেষকরা বলেন, প্রতিষ্ঠার পর ১৭ বছরে কিছু ব্যতিক্রম বাদে কমিশনের সক্ষমতা ও কার্যক্রম নিয়ে যে জটিলতা, হতাশা ও সমালোচনা তার থেকে এখনো নিস্তার মেলেনি। প্রসঙ্গত, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বৈশি^কভাবে ‘বি’ স্ট্যাটাস নিয়ে চলছে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, সদস্য নিয়োগসহ সাচিবিক দায়িত্ব পালন করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ। মন্ত্রণালয়ের ওয়াকিবহাল ব্যক্তিরা বলছেন, চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগসংক্রান্ত কমিশনের আইনের একটি ধারা সংশোধন করতে অধ্যাদেশের খসড়া দুই মাসের বেশি সময় আগে উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনে অধ্যাদেশ হিসেবে জারি হয়। অন্যদিকে কমিশনের আইন পরিবর্তনে আড়াই মাস আগে কমিশন থেকে একটি খসড়া প্রস্তাব পাঠানোর কথা জানিয়েছিলেন দায়িত্বরতরা। তবে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা বলছেন, তারা খসড়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে পাননি।

এতদিন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের ৫ ও ৭ ধারা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের স্পিকারের সভাপতিত্বে সাতজনের একটি কমিটির মাধ্যমে কমিশনের একজন চেয়ারম্যান, একজন সার্বক্ষণিক সদস্য ও পাঁচজন অবৈতনিক সদস্য নিয়োগ হতো। এখন জাতীয় সংসদ নেই। স্পিকার পদত্যাগ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ কমিটির সভাপতির অবর্তমানে কমিটির সভায় উপস্থিত যেকোনো সদস্য যাতে সভাপতিত্ব করতে পারেন, সদস্য পদে শূন্যতা বা বাছাই কমিটি গঠনে ত্রুটির কারণে যাতে এর কার্যধারা অবৈধ না হয়, প্রশ্ন উত্থাপন করা না যায় সে-সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ গত ২০ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। গত ৫ ডিসেম্বর আইনের ৭ ধারা সংশোধন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি হয়। তবে প্রায় দুই মাস পার হলেও চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়োগের বিষয়ে কিছু প্রক্রিয়া আছে। মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট অন্যরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। আশা করি শিগগির হয়ে যাবে।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কমিশনের সক্ষমতা, দক্ষতা ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমরা এমন একটি কমিশন চাই যারা সত্যিকার অর্থে মানুষ ও মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করবে। এমন একজন ব্যক্তিকে চাই যিনি মানবাধিকারের সুরক্ষায় সবসময় সক্রিয় থাকবেন এবং দেশে প্রতিষ্ঠিত যত মানবাধিকার সংগঠন আছে, তাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন।’

আইনের সংশোধনীর জন্য আরও অপেক্ষা : কার্যকরী মানবাধিকার কমিশনের জন্য সংশ্লিষ্ট আইনের সংশোধনীর দাবি দীর্ঘদিনের। তবে এখনো তা হয়ে ওঠেনি। মানবাধিকারের সুরক্ষা ও উন্নয়নে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মানদ- সম্পর্কিত নীতিমালার (প্যারিস নীতিমালা) আলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্ত ও প্রতিকারের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯-এর বিভিন্ন ধারা/উপধারা সংশোধনের লক্ষ্যে গত বছর ১২ নভেম্বর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের একটি খসড়া প্রস্তাব আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় বলে কমিশন গণমাধ্যমকে জানায়। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্ত করার ক্ষমতা পেতে আইনের ১৮ ধারা বিলুপ্তি, ৭ ধারাতে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগে বাছাই কমিটি ৭ সদস্যের স্থলে ৯ সদস্যের করা, বাছাই কমিটিতে হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক ও সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধি রাখা, চেয়ারম্যান নিয়োগের পর কমিশনের মেয়াদ পাঁচ বছর করা, কমিশনে পাঁচজন পূর্ণকালীন সদস্য থাকা, লিঙ্গ নিরপেক্ষ থাকতে ‘চেয়ারম্যান’ বাক্যের পরিবর্তে ‘চেয়ারপারসন’ যুক্ত করা, কমিশনের সমন জারির পরও কোনো ব্যক্তি হাজির না হলে জামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করার ক্ষমতা চেয়েছে মানবাধিকার কমিশন।

আইনের সংশোধনীর খসড়া নিয়ে আশার আলো দেখেছিলেন কমিশনে কর্মরতরা এবং মানবাধিকারকর্মীরা। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা বলছেন, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ খসড়া এখনো পাননি। লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব হাফিজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা আসলে আমাদের কাছে অফিশিয়ালি পাঠানো হয়নি। আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছি। তাই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নই।’ তিনি বলেন, ‘কমিশনের পদত্যাগের পর এটি করা হয়েছে। কমিশন না থাকলে সেটি দেখবে কে? নতুন কমিশন এসে কী সিদ্ধান্ত নেয় সেটি দেখতে হবে।’