আমানত ব্যাপক একটি শব্দ। এর মধ্যে মানুষের কথাবার্তা, লেনদেন, পরামর্শ, নসিহতসহ যাবতীয় কাজকর্ম অন্তর্ভুক্ত। এক কথায় মানুষের পুরো জীবনটাই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। এ জন্যই পরকালে প্রতিটি কাজকর্মের হিসাব দিতে হবে। ইসলাম আমানত রক্ষার প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের কতই না সুন্দর উপদেশ দিচ্ছেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৫৮)
যার দায়িত্বে কোনো আমানত থাকবে, সেই আমানত প্রাপককে পৌঁছে দেওয়া তার কর্তব্য। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমানত রক্ষার ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ প্রদান করেছেন। হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এমন খুব কম হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো ভাষণ দিয়েছেন অথচ তাতে এ কথা বলেননি যে, ‘যার মধ্যে আমানতদারী নেই তার মধ্যে ইমান নেই। আর যার মধ্যে প্রতিশ্রুতি রক্ষার নিয়মানুবর্তিতা নেই, তার দ্বীন নেই।’ (মুসনাদে আহমাদ)
আমানত বলতে আমরা কেবল টাকা-পয়সার বিষয়টি বুঝি। কিন্তু আমানতের অর্থ ও মর্ম ব্যাপক। এর পরিধি বিশাল। মহান আল্লাহর প্রদত্ত সবকিছুই আমাদের কাছে আমানত। ধনসম্পদ, সন্তানসন্ততি, এমনকি আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও মহান আল্লাহর দেওয়া আমানত। নেতৃত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন আমানত। এ ব্যাপারে অবহেলা বেশি প্রকাশ পায়। অথচ এর খেয়ানতের ভয়ে ইসলামের চার খলিফা সবসময় তটস্থ থাকতেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এক পয়সাও যেন এদিক সেদিক না হয়, তারা সেদিকে তীক্ষè নজর রাখতেন। ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠায় তারা ছিলেন সদা প্রস্তুত।
রাষ্ট্রীয় কোষাগার লুণ্ঠন করে বিলাসবহুল জীবনযাপন মানে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা এবং জনগণের আমানতের খেয়ানত করা। এই আমানত রক্ষার জন্য যোগ্যতা, সততা ও আল্লাহভীরুতা ছাড়াও প্রয়োজন হলো ভার বহনের সৎসাহস। প্রখ্যাত সাহাবি আবু জর গিফারি রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি আমাকে কোনো এলাকার শাসক নিযুক্ত করবেন না? তখন তিনি আমার কাঁধে আঘাত করে বললেন, হে আবু জর! তুমি দুর্বল। আর শাসনকার্য হলো একটি আমানত। নিশ্চয় তা হবে কেয়ামতের দিন অপমান ও লাঞ্ছনার কারণ। তবে সে ব্যক্তি নয়, যে তা যথার্থভাবে গ্রহণ করে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে।’ (সহিহ মুসলিম ১৮২৫)
জনগণের সঙ্গে শাসকদের কোমল ব্যবহার করা, তাদের মঙ্গল কামনা করা, তাদের প্রতি স্নেহপরবশ হওয়ার আদেশ দিয়েছে ইসলাম। জনগণকে ধোঁকা দেওয়া, তাদের প্রতি কঠোর হওয়া, তাদের স্বার্থ উপেক্ষা করা, তাদের প্রয়োজন সম্বন্ধে উদাসীন হওয়া নিষিদ্ধ। হজরত আনাস বিন মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ প্রত্যেক রক্ষককে তার রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে এবং প্রত্যেক তত্ত্বাবধায়ক ও অভিভাবককে তার তত্ত্বাবধান ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন। যথার্থই কি তারা তাদের কর্তব্য পালন করেছে? নাকি অবহেলাবশত তা বিনষ্ট করেছে?’ (সহিহ ইবনে হিব্বান ৪৪৯২)
নেতার মধ্যে দায়িত্বশীলতা ও নম্রতার গুণ থাকতে হবে। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাযি.) বলেছেন, আমার এ ঘরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এই দোয়া করতে শুনেছি, ‘হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি আমার উম্মতের যেকোনো কাজে দায়িত্বশীল হিসেবে নিযুক্ত হন এবং লোকদের সঙ্গে নম্র ব্যবহার করেন, আপনিও তার সঙ্গে নম্র ব্যবহার করুন।’ (সহিহ মুসলিম ৪৭২২) অপর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমান জনগোষ্ঠীর নেতা হয়। অতঃপর তাদের সঙ্গে প্রতারণামূলক কাজ করে এবং ওই অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তবে মহান আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি ৭১৫১)