আত্মার ভয়ংকর ব্যাধি হিংসা

আত্মার ভয়ংকর ঘৃণিত এক ব্যাধি হিংসা, যা আত্মবিধ্বংসী প্রবৃত্তি। কোরআন ও হাদিসে হিংসা-বিদ্বেষের বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা মানুষকে পারস্পরিক ভালোবাসা, ক্ষমা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার শিক্ষা দিয়েছেন। হিংসা একটি নেতিবাচক মানসিকতা, যা ব্যক্তি, সমাজ ও উম্মাহর মধ্যে বিভেদ ও শত্রুতা সৃষ্টি করে। হিংসা আমলকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়, যেমন আগুন কাঠকে জ্বালিয়ে দেয়। হিংসুক নিজেই তার আগুনে জ্বলতে থাকে। হিংসা মানুষের আত্মা ও সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজন প্রকৃত ইমানদার হিংসাকে পরিহার করে আল্লাহর পথে চলার চেষ্টা করে। এ বিষয়ে কোরআনের কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হলো।

হিংসার নিন্দা : সম্পদের প্রতি হিংসা এবং অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং লোকদের সম্পদের কিছু অংশ জেনেশুনে অবৈধভাবে গ্রাস করার উদ্দেশে তা বিচারকদের কাছে পেশ করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৮)

হিংসা পরিহারের নির্দেশ : হিংসা মানুষের আত্মিক ক্ষতি করে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞ করে তুলে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আকাক্সক্ষা করো না সেসবের, যেসবের মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের এক জনকে অন্য জনের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৩২)

শয়তানের প্ররোচনা : শয়তানের কাজ হলো মানুষকে বিভ্রান্ত করা এবং তাদের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতার বীজ বপন করা। তাই শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘শয়তান তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত ৯১)

ক্ষমা ও সহমর্মিতা : আল্লাহতায়ালা মন্দের প্রতিশোধ নিতে নিষেধ করেছেন। ক্ষমা করতে বলেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা নুর, আয়াত ২২) এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা হিংসার পরিবর্তে ক্ষমার আদেশ দিয়েছেন। ক্ষমা একটি মহৎ গুণ, যা মানুষের হৃদয়ে শান্তি এনে দেয়।

নবীজির আদর্শ : নবীজি (সা.) কখনো ব্যক্তিগত হিংসা বা বিদ্বেষ পোষণ করতেন না। তিনি সবসময় মানুষকে ক্ষমা করতেন এবং তাদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতেন। হিংসা মানুষের আত্মা ও সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। হাদিসে রাসুল (সা.) হিংসা থেকে বাঁচার উপদেশ দিয়েছেন। কয়েকটি প্রাসঙ্গিক হাদিস উল্লেখ করা হলো।

হিংসা ধ্বংসাত্মক : রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হিংসা থেকে বাঁচো, কারণ হিংসা ভালো কাজগুলোকে এমনভাবে ধ্বংস করে দেয়, যেমন আগুন কাঠকে পুড়িয়ে ফেলে।’ (আবু দাউদ ৪৯০৩)

মুমিন হিংসামুক্ত : মুমিন ব্যক্তি নিজের ভেতর হিংসা পোষণ করতে পারে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের প্রতি হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না এবং সম্পর্ক ছিন্ন করো না। আল্লাহর বান্দারা ভাই ভাই হয়ে থাকো।’ (সহিহ মুসলিম ২৫৬৩)

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী শুধু দুই ক্ষেত্রে ঈর্ষা করা বৈধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, দুই শ্রেণির লোক ছাড়া কারও প্রতি ঈর্ষা করা যাবে না। এক. যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন এবং হক পথে খরচ করার ক্ষমতা দান করেছেন। দুই. যাকে আল্লাহ কোরআনের জ্ঞান দিয়েছেন এবং তিনি দিন-রাত তা অনুসারে আমল করেন। (সহিহ বুখারি ৭৩১৫) এই দুই ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঈর্ষা করা বৈধ হওয়ার কারণ হলো, তাদের কাজ দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য কল্যাণকর। কেউ যদি এমন কল্যাণকর কাজ সম্পাদনকারী হতে চায় তাহলে তাতে ক্ষতির কিছু নেই। বরং তাতে কল্যাণ রয়েছে। আর ইসলাম কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা করতে বলেছে।