দাওয়াত ও তাবলিগ ইসলামের প্রাণশক্তি। বিশ্ব জুড়ে ইসলামের ঝা-া সমুন্নত করতে দাওয়াত ও তাবলিগের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর মনোনীত জীবনব্যবস্থা ইসলামের যাবতীয় অনুশাসন যথার্থ মেনে চলার মধ্যেই উভয় জগতের প্রকৃত শান্তি, সফলতা ও মুক্তি নিহিত রয়েছে। এই বোধ ও অনুভূতি মানবমনে জাগ্রত করতে যুগে যুগে মহান আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলরা দ্বীনের দাওয়াতের এই মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের প্রতি দাওয়াতের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার সুস্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অন্যায় কাজে বাধা দান করবে। তারাই হলো সফলকাম।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৪)
মহান আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, ‘হে ইমানদাররা! নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে রক্ষা করো সেই আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। তাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয় ও কঠোর স্বভাবের ফেরেশতারা। আল্লাহ যা আদেশ করেন তারা তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয় তাই করে।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত ৬) তাই সামগ্রিক আজাব থেকে বাঁচতে হলে শুধু নিজেই আমল করা যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি দ্বীনের পথভোলা মানুষগুলোকেও আল্লাহর পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। তাদের দাওয়াত দিতে হবে। দ্বীনের পথে দাওয়াত প্রদানকারীদের মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘সেই ব্যক্তির চেয়ে কার কথা উত্তম হতে পারে, যে মানুষকে আলাহর পথে দাওয়াত দেয় এবং নিজেও সৎকাজ করে, আর বলে আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা হামিম সেজদাহ, আয়াত ৩৩)
বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা একটি বাণী হলেও আমার পক্ষ থেকে অন্যের কাছে পৌঁছে দাও।’ (তিরমিজি) সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলিইহি ওয়া সাল্লাম এই পবিত্র বাণীর মাধ্যমে পুরো উম্মতের ওপর দ্বীনের দাওয়াতের গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাহাবায়ে কেরাম ইসলামের চিরন্তন পয়গাম নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে ছড়িয়ে পড়েন। সাহাবায়ে কেরামের যুগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যোগে দাওয়াতের কাজ হয়েছে। এক ব্যক্তি এবং তার অল্পসংখ্যক অনুসারীদের দরদি প্রচেষ্টায় বিরাট বিরাট সাফল্য এসেছে। ধারাবাহিকভাবে সব যুগেই দাওয়াতের কাজ হয়েছে। কোনো যুগেই দাওয়াত ও তালিম একেবারে বন্ধ ছিল না। যে যুগে যেমন দরকার ছিল, সেটার সম্পূর্ণ না হলেও কাছাকাছি চাহিদা পূরণ হয়েছে। কাজের নেজামে কেবল পরিবর্তন এসেছে। মৌলিক নীতিমালা ঠিক রেখে কিছু এন্তেজামি সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে যুগে যুগে। অতীতের এক একজন দাঈ কী পরিমাণ দাওয়াতের কাজ করেছেন, তা চিন্তা করলে আমাদের কালের সুসংগঠিত বিশাল আয়োজনকেও অতি সামান্য মনে হবে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, হিন্দুস্তানে এক খাজা মইনুদ্দীন আজমিরী (রহ.)-এর দাওয়াতে প্রায় কোটি মানুষ দ্বীন কবুল করেছে!
এই ধারাবাহিকতায় মহান আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদের নিরলস প্রচেষ্টায় বিভিন্ন উপায় ও পদ্ধতিতে আজও দ্বীনি দাওয়াতের পবিত্র খেদমত অব্যাহত রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই দাওয়াতি ধারায় যেসব উপায় ও পদ্ধতি কার্যকর তার মধ্যে হক্কানি ওলামায়ে কেরামের ওয়াজ-নসিহত, বুজুর্গানে দ্বীন কর্তৃক আত্মশুদ্ধির খেদমত, দ্বীনি মাদ্রাসায় তালিম-তরবিয়ত, তাবলিগি মেহনত, স্বচ্ছধারার ইসলামি রাজনৈতিক তৎপরতা এবং ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক ও লেখকদের লেখনী অন্যতম।
দাওয়াতের এসব অবলম্বনের মধ্যে তাবলিগি মেহনত বিশ্ব সমাদৃত ও জনমুখী অন্যতম একটি ধারা। মহান আল্লাহর হুকুম এবং হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলিইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের যথার্থ অনুসরণে তাবলিগি মেহনতে আত্মনিবেদিত ভাইয়েরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দ্বীনি দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছেন। বিশ্বনন্দিত আলেমে দ্বীন আল্লামা ইলিয়াস (রহ.) বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে ইমানের দাওয়াত পৌঁছানোর মহান প্রয়াসে তাবলিগি মেহনতের ঐতিহাসিক এই ধারার সূচনা করেন।
প্রত্যেক মানুষ কীভাবে প্রকৃত ইমানদার হতে পারে, সেই লক্ষ্যেই বিশ্বব্যাপী চলছে দাওয়াত ও তাবলিগের বিরামহীন মেহনত। সব ধরনের পার্থিব লোভ-লালসা ত্যাগ করে মহান আল্লাহর দেওয়া ধনসম্পদ, শক্তি ও সময় মহান আল্লাহর পথে কোরবানি দিয়ে তাবলিগের সাথীরা যে নিরবচ্ছিন্নভাবে দাওয়াতের জিম্মাদারি পালন করে চলেছেন তা সত্যিই নজিরবিহীন ও প্রশংসনীয়। উম্মাহর এই ক্রান্তিকালে কোনো ধরনের পার্থিব বিনিময় ছাড়া মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে, মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত কোমল ও নম্র ভাষায় মানুষকে আল্লাহর পথে নিয়ে আসার লক্ষ্যে তাবলিগের আত্মত্যাগী ভাইয়েরা ইখলাসপূর্ণ প্রচেষ্টার মাধ্যমে দ্বীনের যে দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছেন, তা মহান আল্লাহর বিশাল নেয়ামত।
ইসলামের সঠিক রূপরেখা সবক্ষেত্রে বাস্তবায়নের মাধ্যমে উভয় জগতের কাক্সিক্ষত সফলতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে তাবলিগি মেহনতে শামিল ভাইয়েরা বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছেন। ফলে পবিত্র এই দাওয়াতি মেহনতের অবদানে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ছে ইসলামের সৌরভ ও সৌন্দর্য। ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে সমবেত হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। এভাবে বিশ্বব্যাপী ইসলামের পুনর্জাগরণে দাওয়াত ও তাবলিগের ভূমিকা অনন্য এবং অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে।
প্রতি বছর আমাদের দেশে অনুষ্ঠিত হয় তাবলিগের বিশ্ব ইজতেমা। সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মুমিন-মুসলমান এই ইজতেমায় ইমানি চেতনা ও আমলি স্পৃহাকে শানিত করার নিষ্ঠাপূর্ণ মেহনতে শামিল হন। নিবিষ্ট হন ইমান ও আমলের মৌলিক অনুশীলনে। টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমায় বিশ্ব সমাদৃত মুবাল্লিগে ইসলাম ও বরেণ্য ওলামা-মশায়েখের ওয়াজ-নসিহত এবং অসংখ্য মুমিন-মুসলমানের জিকির-আজকারের পবিত্র ধ্বনিতে আল্লাহ প্রেমের ঢেউ তরাঙ্গায়িত হয়। ইমানদার জনতার উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে উঠে তুরাগ তীর। হক্কানি ওলামা-মশায়েখের সুষ্ঠু দিকনির্দেশনায় দাওয়াত ও তাবলিগের ইখলাসপূর্ণ মেহনতের এ ধারাকে মহান আল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত জারি রাখুন। আমিন।