প্রতিশ্রুতি পূরণ সাধারণ মানুষের কল্যাণার্থেই হবে

একটি দীর্ঘস্থায়ী সরকারের দাম্ভিক ধারাবাহিকতাকে চুরমার করে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। শুরুতে সরকারের প্রধান হিসেবে নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দায়িত্ব গ্রহণ জনমনে ভিন্নমাত্রার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ যদিও নিজ নিজ প্রত্যাশা অনুযায়ী, সরকারের নীতিনির্ধারকদের ওপর নজর রাখছে। ‘দেশটি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার’। ‘আপনারা স্বাধীন, মন ভরে লিখুন। অনিয়ম-অনাচারকে তুলে ধরুন, আমি খুব খুশি হব আমাকে চিঠি লিখুন’ এমন কথায়, প্রত্যাশা খুঁজে পেয়েছিল দিশেহারা মানুষ। শাসকদের রক্তচক্ষু এক সময় যাদের তটস্থ করে রাখত, সেই নিপীড়িত কলম সৈনিকরাও আশার আলো খুঁজে পেয়েছিলেন। সরকারের বয়স ছয় মাস পূর্ণ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি? জনপ্রত্যাশা আর সরকারের প্রতিশ্রুতির সমীকরণ কি প্রত্যাশা অনুযায়ী পূর্ণ হয়েছে? সম্প্রতি একজন সংবাদকর্মী সরকারের কাছে পাঁচটি চিঠি লেখার কথা উল্লেখ করেছেন। মানে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাহেবের কথায় আস্থা রেখে, পাঁচ মাসে পাঁচটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তিনি চিঠির কোনো উত্তর পাননি! বিষয়গুলো সরকারের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, এমন কোনো লক্ষণও দেখতে পাননি।

তবে এটা ঠিক, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন যেকোনো ইস্যুতে রাষ্ট্র ও সমাজে নানা রকম অস্থিরতা কাজ করে। অনেকেই ভেবেছিলেন প্রকাশ্যে যা ঘটুক, লরিয়েটের সরকার হয়তো ৫৩ বছরের নিপীড়িত মানুষের মনের ভাষা বুঝেই কাজ করছে। তবে সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানের একটি স্ট্যাটাস, আমার চিন্তার জগতে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। আতঙ্কের এই বৃদ্ধি শতভাগ সঠিক কি না, তাও আমি নিশ্চিত নই। তবে দৃঢ়ভাবে এখনো বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার সবকিছু ভালোমতোই সামলে নেবে। দেশের অভ্যন্তরীণ কিংবা বিশ্বের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা কোনোভাবেই দেশকে আন্দোলিত করবে না। হয়তো খুবই অল্প সময়ের জন্য, বিভিন্ন কর্মসূচি আটকে যেতে পারে, তবে তার উত্তরণ ঠিকই হবে। সেই বিশ্বাস আমি দৃঢ়ভাবেই রাখি। তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে একেবারেই  নতুন নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মুখে যাই বলুক, অভিজ্ঞতা বলে আমজনতা তত্ত্বাবধায়কের আমলেই শান্তি খুঁজে পায়। দুর্নীতিবাজরা পালিয়ে বেড়ায় আর পটকাবাজ, প্রতারকরা আতঙ্কে প্রহর গুনে। শাসকরা সেবকের রূপে জনতার পাশে দাঁড়ায়! অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এবারের অন্তর্বর্তী সরকার জনতার প্রত্যাশা পূরণের কাছাকাছি যেতে সক্ষম হবে।

আমাদের দেশের সংবাদ জগতে দ্বিধাবিভক্তি আছে। নানা মত, পথের মানুষের সমাহারে নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তারকা সাংবাদিকদের সম্পদের বিবরণী শুনলে, চমকে যেতে হয়। গাড়ি, বাড়ি আর চলনে বলনে, এরা তৃতীয় বিশ্বের সাংবাদিক, এটি বোঝা দুষ্কর! এত অনাচারের মাঝেও কিছু কিছু মানুষ অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আজকাল বড় বড় সাংবাদিক নেতা আর তারকাখ্যাতি পাওয়া জার্নালিস্টদের কথাবার্তা আমাকে খুব টানে না। তবে শওগাত আলী সাগর, শরিফুল হাসান আর অলিউল্লাহ নোমানকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করি। এরা তিনজন একই মত-পথের মানুষ, এমন নয়। তবুও একটি বিষয়ে তিনজনের মাঝে দারুণ মিল খুঁজে পাই। এরা প্রত্যেকেই নির্লোভ আর সততায় দারুণ নির্ভীক। তাই অলিউল্লাহ নোমানের সাম্প্রতিক স্ট্যাটাসটি আমার মনবেদনার কারণ হয়েছে।

প্রতি ঘণ্টায় হাজার হাজার লাইক, শত শত শেয়ার। চব্বিশ ঘণ্টায় শেয়ারের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে! কী লিখেছেন নির্বাসন ফেরত অলিউল্লাহ নোমান? দেশে কয়েক সপ্তাহ ব্যস্ততম সময় কাটিয়ে তিনি গত ১৬ জানুয়ারি লন্ডন ফিরছিলেন। পথিমধ্যে শুভানুধ্যায়ী, ফ্যান ফলোয়ারদের উদ্দেশ্যে একটি ফেসবুক পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, ‘শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন এটুকুই শান্তি। বাকি সব আগের চেয়েও অবনতি হয়েছে। বদলি, পোস্টিংয়ে টাকার ছড়াছড়ি। ঘুষ, দুর্নীতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে। লুটেরা, চাঁদাবাজ শুধু চেহারার পরিবর্তন হয়েছে। চাঁদার রেট কোনো কোনো জায়গায় বেড়ে গেছে আগের তুলনায়। ফাইল আগের মতোই আটকে থাকে ঘুষের অপেক্ষায়। বিপ্লব বলতে যা বোঝায় তার ধারেকাছেও কিছু নেই। এত রক্ত ও শহীদের আত্মা আমাদের অভিশাপ দেবে।’ আওয়ামী শাসনামলে এক যুগেরও বেশি সময় নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন অলিউল্লাহ নোমান। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। চিন্তা, চেতনা, মত-পথে ভিন্নতা থাকলেও তার সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর ভিন্ন মতের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ অতুলনীয়! ৫ আগস্টের পর দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে বিমানবন্দরে ফুলেল শুভেচ্ছায় সংবর্ধিত হয়েছেন। এটি তার প্রাপ্য। বিশ্বাস ছিল, পরিবর্তনপ্রত্যাশী অন্তর্বর্তী শাসকদের কার্যকলাপে অলিউল্লাহ নোমানদের চিন্তাচেতনা ও দর্শনের প্রতিফলন ঘটবে! দুদিন আগে তার স্ট্যাটাসে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন ‘আমি হতাশ’! এ সরকারের আমলে অলিউল্লাহ নোমানরা হতাশ হবেন কেন? তাহলে কি দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নবিরোধী বক্তৃতা-বিবৃতি সবই ছিল কথার কথা!  আর এসব যদি কথার কথাই হয়, তবে সমাজ পরিবর্তনের ভাবনা কি প্রকৃতভাবে সম্ভব?

একজন চিন্তাশীল, আধুনিক মনস্ক মানুষের সঙ্গে আরেকজন চিন্তাশীল, আধুনিক মানুষের পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু নিজ দেশের কিছু মৌলিক প্রশ্নে কখনো পার্থক্য থাকে না। এটা স্বাভাবিকও নয়। কিন্তু যখন দেখা যায়, কোনো মানুষের চিন্তার  বিষয়টি একেবারেই মধ্যযুগীয় বর্বরতা এবং অন্ধত্বে ঠাসা, তখন তাকে দেশপ্রেমিক মানুষের জোটগতভাবে এড়িয়ে চলাই উত্তম। কিন্তু তা যদি হয় বৃহৎ গোষ্ঠীর, তখন সরকার সেটি মোকাবিলা করে নিজস্ব বিশ্বাস এবং বাস্তবতার নিরিখে।  বর্তমান সরকারের প্রতি আমাদের আস্থা অগাধ। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, যদি এমন কোনো চিন্তাসমষ্টি দেশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে, তখন সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সরকারই তা প্রতিহত করবে। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এখন সময় আধুনিক চিন্তাকে সঙ্গী করে এগিয়ে যাওয়ার। বাস্তবতা বলে, বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতির সমীকরণ সাধারণ মানুষের কল্যাণেই অগ্রসর হবে। গুটিকয়েক মানুষ বিক্ষিপ্তভাবে যা-ই বলুক।

লেখক : কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক

mahssan8691@gmail.com