৩২ বছর কেটে গেল, ইংল্যান্ডের কোচরা এখনো স্বপ্ন দেখেন, আশা করেন—একদিন তারা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা উঁচিয়ে ধরবেন। কিন্তু ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে লিগ শুরুর পর থেকে প্রতিবারই বিজয়ের মঞ্চে দেখা যায় বিদেশি কোচদের আধিপত্য। স্যাম অ্যালারডাইস, হ্যারি রেডন্যাপরা কখনও কাউকে কথা দিয়েছিলেন কিনা সেটা জানা না গেলেও, তাদের মতো ইংলিশ কোচরা যে কখনও প্রিমিয়ার লিগ জেতেননি সেটা সবারই জানা!
প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, চেলসি, আর্সেনাল ও লিভারপুলের মতো ক্লাব আধিপত্য দেখালেও এক জায়গায় ইংল্যান্ডের ব্যর্থতা স্পষ্ট—দেশটির কোচরা কখনও এই প্রতিযোগিতার শিরোপা জিততে পারেননি!স্যার আলেক্স ফার্গুসন ১৩ বার লিগ জিতেছেন, পেপ গার্দিওলা ম্যানচেস্টার সিটিকে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করিয়েছেন, মরিনিয়ো ও ওয়েঙ্গারও সফল। অথচ ইংল্যান্ডেরই কোনো কোচ ট্রফি জয়ের কাছাকাছি যেতে পারেননি, যা দেশটির ফুটবলের জন্য বড় এক ব্যর্থতা।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক কেন সফল হন না ইংলিশ কোচরা? এর পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ।
কৌশলগত সীমাবদ্ধতা
ইংলিশ কোচদের বেশিরভাগই প্রথাগত ফুটবলে অভ্যস্ত, যেখানে সরাসরি আক্রমণাত্মক স্টাইল এবং লং বলের ওপর নির্ভরতা বেশি। আধুনিক ফুটবলে যেখানে পেপ গার্দিওলার পজিশনাল প্লে, জার্গেন ক্লপের জেনেগ্রেসিং ও আনচেলত্তির ফ্লেক্সিবল ট্যাকটিকস সফল, সেখানে ইংলিশ কোচদের বেশিরভাগই কৌশলগতভাবে পিছিয়ে থাকেন।
বড় ক্লাবে সুযোগের অভাব
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, চেলসি, লিভারপুল ও আর্সেনালের মতো শীর্ষ ক্লাবগুলো ইংলিশ কোচদের কখনোই প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়নি। তারা বরং গার্দিওলা, মরিনিয়ো, ওয়েঙ্গার, ক্লপদের মতো আন্তর্জাতিক মানের কোচদের নিয়োগ দিয়ে এসেছে। যখন বড় দলেই দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ নেই, তখন শিরোপা জেতার স্বপ্নও দুরূহ হয়ে যায়।
বিদেশি কোচদের আধিপত্য
প্রিমিয়ার লিগ বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক লিগ, যেখানে প্রতিটি ক্লাবে বিশ্বের সেরা ফুটবলার ও কোচদের দেখা যায়। স্বাভাবিকভাবেই বিদেশি কোচরা উন্নত কৌশল, অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে আসেন, যা ইংলিশ কোচদের চেয়ে এগিয়ে রাখে। গার্দিওলা, ক্লপ, মরিনিয়ো বা অ্যান্তোনিও কন্তের মতো কোচরা প্রিমিয়ার লিগে এসে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছেন, কিন্তু ইংলিশ কোচদের মধ্যে সে মানের কেউ উঠে আসেননি।
ইংলিশ কোচদের ব্যর্থতার ইতিহাস
সর্বশেষ ৩২ বছরে ইংলিশ কোচদের মধ্যে কেবল হ্যারি রেডন্যাপ, স্যাম অ্যালারডাইস ও এডি হাও তুলনামূলক সফল বলা যায়। রেডন্যাপ ২০০৯-১০ মৌসুমে টটেনহ্যামকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তুলেছিলেন, স্যাম অ্যালারডাইস রেলিগেশন বাঁচানোর বিশেষজ্ঞ হলেও কোনো বড় সাফল্য পাননি, আর এডি হাও সম্প্রতি নিউক্যাসল ইউনাইটেডকে দুই দশকের মধ্যে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তুলেছেন। কিন্তু শিরোপা? সেটি এখনও অধরা।
প্রিমিয়ার লিগের আগে ইংলিশ কোচদের সোনালি যুগ
১৯৯২ সালে প্রিমিয়ার লিগ চালু হওয়ার আগে ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগ ছিল ফার্স্ট ডিভিশন, যেখানে ইংলিশ কোচদের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট।
বব পেইসলি (লিভারপুল, ১৯৭৪-১৯৮৩) – তিনি ৬ বার ইংলিশ লিগ ও ৩ বার ইউরোপিয়ান কাপ (বর্তমান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) জিতেছেন।
ব্রায়ান ক্লফ (নটিংহ্যাম ফরেস্ট, ১৯৭৫-১৯৯৩) – ১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে নটিংহ্যাম ফরেস্টকে লিগ শিরোপা জেতান এবং টানা দুইবার (১৯৭৯, ১৯৮০) ইউরোপিয়ান কাপ জয় করেন।
স্যার আলফ রামসে (ইপসউইচ টাউন, ১৯৫৫-১৯৬৩) – ইপসউইচ টাউনকে ১৯৬১-৬২ মৌসুমে লিগ শিরোপা এনে দেন, যা ছিল ক্লাবের ইতিহাসে প্রথম ও একমাত্র লিগ জয়। পরে ইংল্যান্ড জাতীয় দলকে ১৯৬৬ বিশ্বকাপ এনে দেন।
তখনকার সময়ে ইংলিশ কোচরা কৌশলগতভাবে এগিয়ে ছিলেন এবং তাদের পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির ছাপ ছিল। কিন্তু প্রিমিয়ার লিগ যুগে বিদেশি কোচদের আধিপত্যের কারণে তারা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়েছেন।
চলতি মৌসুমে শিরোপার দৌড়ে কোনো ইংলিশ কোচ আছেন?
২০২৪-২৫ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপার অন্যতম দাবিদার দলগুলো হচ্ছে –
ম্যানচেস্টার সিটি (পেপ গার্দিওলা, স্পেন)
আর্সেনাল (মিকেল আর্তেতা, স্পেন)
লিভারপুল (আর্নে স্লট, নেদারল্যান্ডস)
অ্যাস্টন ভিলা (উনাই এমেরি, স্পেন)
এই চারটি ক্লাবই বর্তমানে শিরোপার জন্য লড়ছে। কিন্তু এদের কোনো ক্লাবেরই প্রধান কোচই ইংলিশ নন। ফলে চলতি মৌসুমেও ইংলিশ কোচদের ট্রফি জয়ের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে!
ইংলিশ কোচরা কি অভিশাপ ভাঙতে পারবেন?
বর্তমানে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের এডি হাও ও কিছু তরুণ ইংলিশ কোচ ভালো পারফর্ম করছেন, তবে তারা লিগ জয়ের দৌড়ে নেই। আগামী কয়েক বছরে যদি বড় ক্লাবগুলো তাদের সুযোগ দেয় এবং তারা কৌশলগত উন্নতি ঘটাতে পারেন, তবে হয়তো ৩২ বছরের অভিশাপ ভাঙতে পারে ইংল্যান্ডের কোনো কোচ। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগে ইংলিশ কোচদের জন্য সাফল্যের পথ বেশ কঠিন।
৩২ বছর ধরে শূন্য হাতে থাকা ইংলিশ কোচদের ভাগ্য কি বদলাবে? নাকি শিরোপার লড়াইয়ে বিদেশিদেরই জয়জয়কার থাকবে? সেটাই দেখার বিষয়!