অবশেষে ক্যানসার হাসপাতাল পেল রেডিওথেরাপি মেশিন

ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় দেশের একমাত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল একটি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন পেয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে হাসপাতালের নিচতলায় নতুন বাংকারে মেশিনটি স্থাপন করা হয়েছে। তবে মেশিনটি চালু হতে আরও এক সপ্তাহর মতো সময় লাগবে। অর্থাৎ এক সপ্তাহ পর এই হাসপাতালে আবার রেডিওথেরাপি চিকিৎসা পাবে রোগীরা।

এর আগে এই হাসপাতালে চালু থাকা দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন গত বছরের ২১ ও ২২ ডিসেম্বর পালাক্রমে নষ্ট হয়ে যায়। অন্য কোনো মেশিন না থাকায় সেদিন থেকে হাসপাতালে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়। দেড় মাস ধরে এই হাসপাতালে ক্যানসার রোগীদের কোনো রেডিওথেরাপি হচ্ছে না।

নতুন মেশিন স্থাপনের মধ্য দিয়ে এখন পর্যন্ত সাতটি রেডিওথেরাপি মেশিন পেল হাসপাতালটি। পুরনো ছয়টি মেশিনের মধ্যে চারটি নষ্ট সাত বছর ধরে। বাকি দুটির মেয়াদও পাঁচ-ছয় বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। পরে সেগুলো পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। নানা জটিলতার কারণে অকেজো মেশিনগুলো এখনো মেরামত করা সম্ভব হয়নি। ফলে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের রেডিওথেরাপি নিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সরকারি হাসপাতালের তুলনায় ২০-৩০ গুণ বেশি দামে রেডিওথেরাপি নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে প্রতিটি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১০০ জনকে রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব। সে হিসেবে ছয়টি মেশিন চালু থাকলে প্রতিদিন এখান থেকে সেবা পেতেন ৬০০ রোগী। এখন এসব রোগীকে ২০-৩০ গুণ বেশি টাকায় বাইরে থেকে রেডিওথেরাপি নিতে হচ্ছে।

তারা আরও বলেন, ক্যানসার হাসপাতালের রেডিওথেরাপি মেশিন অকেজো হয়ে যাওয়ায় এখন আর ঢাকায় সরকারি পর্যায়ে কোনো রেডিওথেরাপি মেশিন চালু নেই। এত দিন ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় ক্যানসার হাসপাতাল মিলে ১৪টি রেডিওথেরাপি মেশিন ছিল। বর্তমানে সেগুলো সব অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে।

বর্তমানে সারা দেশে সরকারি পর্যায়ে মাত্র দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন চালু রয়েছে। এর একটি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও অন্যটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চালু রয়েছে।

নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপনের ব্যাপারে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবীর গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন দুটি মেশিনের একটি স্থাপন করা হয়েছে। আশা করছি, অন্যটা মার্চে স্থাপন করা যাবে। নতুন মেশিনটি হাসপাতালের নিচতলায় নতুন বাংকার করে স্থাপন করা হয়েছে। এটি দামি লিনাক মেশিন। এর দাম ২৭ কোটি টাকা। এই মেশিনে প্রতিদিন গড়ে ১০০টি রেডিওথেরাপি করা যাবে। এখানে প্রতি এক্সপোজারে রোগীর ২০০ টাকা লাগে। একজন রোগীর ২৫ দিনে গড়ে ৫০-৭৫টি এক্সপোজার লাগে। অনেক রোগীর এক দিনে বিকাল ৩টা পর্যন্ত রেডিওথেরাপি নিতে হয়।

তিনি আরও বলেন, মেশিনটি ১০ বছরের ওয়ারেন্টি দেওয়া আছে। প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে নষ্ট হলে কোম্পানি মেরামত করে দেবে ও পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে নষ্ট হলে এটি বদলিয়ে নতুন মেশিন দেবে। সিমেন্স কোম্পানির এই মেশিনটি জার্মানির হলেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি।

তবে মেশিনটি চালু হতে আগামী সাত দিন লাগবে বলে জানান পরিচালক। তিনি বলেন, মেশিন সার্ভে করা হচ্ছে। সেফটি মেজারের জন্য কিছু টেকনিক্যাল কাজ করা হচ্ছে। আশা করছি, সবকিছু শেষ করে আগামী এক সপ্তাহ পর রোগীদের সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। রোগীরা এই হাসপাতালে আবার রেডিওথেরাপি সেবা পাবে।

ডা. জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি মানুষ যেন সেবা পায়। মেশিন কেনা ও স্থাপন করা একটি দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। মানুষের আস্থা ফিরে আসুক। মানুষের আর বিদেশ যেতে হবে না।’

সময় লাগল তিন বছর : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আরও তিন বছর আগে এই মেশিন কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর মধ্যে তিনজন পরিচালক বিদায় নিয়েছেন। এর আগের পরিচালকের সময় মেশিনটি ক্রয় প্রক্রিয়া শেষ হয়। আর মেশিনটি স্থাপন হলো বর্তমান পরিচালকের সময়। এটা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছিল। এর জন্য হাসপাতালের সবাইকে বেশ যুদ্ধ করতে হয়েছে। তবুও ভালো শেষ পর্যন্ত মেশিনটি স্থাপন হয়েছে এবং একটি ভালো মেশিন এলো।