দেশে ক্যানসারের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান। তিনি বলেছেন, ইতিমধ্যে এই খাতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। ৫০ শয্যার ক্যানসার হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। সংযোজন করা হচ্ছে নতুন উন্নত আধুনিক যন্ত্রপাতি। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক নতুন চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার ‘বিশ্ব ক্যানসার দিবস’ উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ সহকারী এ কথা বলেন।
অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘সরকার একদিকে যেমন প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছে, তেমনি বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করে দেশেই বিশ্বমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করছে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবীর বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেন এবং দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যানসার হাসপাতাল স্থাপন ও দেশের একমাত্র বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, দেশেই ক্যানসারের সুচিকিৎসা আছে। অপ্রয়োজনে বিদেশে গিয়ে কষ্টার্জিত অর্থ অপচয় করবেন না। ক্যানসার চিকিৎসা যথেষ্ট ব্যয়বহুল। দেশে ক্যানসার বীমার গুরুত্ব রয়েছে।
পরে অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত ও সেবার মান আধুনিকায়নের লক্ষ্যে নতুন দুটি রেডিওথেরাপি মেশিনের উদ্বোধন করেন। এর আগে দিবসটি উপলক্ষে এক শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব সাইদুর রহমান, স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের সচিব ডা. মো. সারোয়ার বারী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
তামাক সেবন বন্ধের পরামর্শ : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করে।
এ সময় অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার ওরাল ক্যানসার প্রতিরোধে তামাক জাতীয় পণ্য বিশেষ করে তামাক পাতা, জর্দা ও সুপারি পরিহার করার আহ্বান জানান।
বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, একটু সচেতন হলেই নারীরা স্তন ও জরায়ু মুখের ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারেন। সময় মতো ভ্যাকসিন নিলে জরায়ু মুখের ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ক্যানসারে সন্তানহারা চিকিৎসক দম্পতির ক্যানসার ফাউন্ডেশন : ক্যানসারে মারা যাওয়া সন্তানের চিকিৎসক বাবা-মা একটি ক্যানসার ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। অধ্যাপক ডা. মো. নওফেল ইসলাম ও অধ্যাপক ডা. আইরিন পারভীন নামে এই চিকিৎসক দম্পতি গত ২০০৩ সালে এই ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন। দিগন্ত মেমোরিয়াল ক্যানসার ফাউন্ডেশন নামে এই প্রতিষ্ঠানটি গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
এই ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক ডা. মো. নওফেল ইসলাম জানান, ক্যানসার রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর কর্মসূচি নিয়েই এ প্রতিষ্ঠানের পথচলা।
গত বছর প্রতিষ্ঠানটি এক হাজার ৪২০ জন রোগীকে দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসাসেবা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি হাসপাতালের মতো করে একটি ক্যানসার হোম পরিচালনা করছে। সেখানে রোগীদের থাকা, নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা, কাউন্সেলিং, নিয়মিত নার্স ও চিকিৎসকের মাধ্যমে ফলোআপ, নাস্তা, তিন বেলা নিয়ম মাফিক খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
নিজ সন্তানের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার খবর দিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, সন্তানের চিকিৎসার জন্য জমাকৃত তহবিলের অব্যবহৃত অর্থ (ব্যাংকে রাখা এফডিআরকৃত অর্থের লভ্যাংশ), সদস্যদের চাঁদা ও অনুদান এবং জাকাত থেকে পাওয়া অর্থ ক্যানসার রোগীদের সুস্থতায় ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ব্যয় হয়।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, এই চিকিৎসক দম্পতির ক্যানসার আক্রান্ত ছেলে ২০০৩ সালে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে তিনি চিকিৎসা ব্যয় সংকুলানের জন্য বিভিন্ন জনের থেকে আর্থিক সহযোগিতা নেন। সন্তানের মৃত্যুর পর থেকে যাওয়া অর্থ দিয়ে তিনি ফাউন্ডেশন গড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এই হোমে ক্যানসার রোগীসহ দুজনের থাকার জন্য দৈনিক ৩০০ টাকা নেওয়া হয়। এখান থেকেই রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। এটি রাজধানীর মগবাজারের ১৮, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিতে, অর্থাৎ ইনসাফ বারাকাহ হাসপাতালের পাশেই অবস্থিত।
সভায় একুশে পদকপ্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার বলেন, দেশে অনেকগুলো ক্যানসার হাসপাতাল আছে। কিন্তু একটাতেও রেডিওলজি মেশিন ভালো নেই, সবখানে সিন্ডিকেট।’
সভায় সভাপতিত্ব করেন ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ও ইনসাফ বারাকা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম ফখরুল ইসলাম।