অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ৬ মাস পরও দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি খুবই উদ্বেগের বিষয়। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হলেও, তা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগ করা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনলাইন ভাষণকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অরাজক পরিস্থিতি। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর-আগুনের পর দেশ জুড়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপিদের) বাড়ি ও দলীয় কার্যালয়ে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে আওয়ামী লীগের অন্তত ১২ নেতার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়ি ভাঙচুর করতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলায় অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
চলমান পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করুন। অন্যথায় দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির প্রসার ঘটবে। সুতরাং কঠোরভাবে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা দৃশ্যমান করা এখন সময়ের দাবি।’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতৃত্ব, জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে আসা নেতৃত্বও উন্মত্ততা থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতে ইসলামী, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিও প্রায় বিএনপির সুরেই বিবৃতি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছে। দল ও সংগঠনগুলো বলেছে, গত দুদিনে ঢাকাসহ দেশব্যাপী সংঘটিত অরাজক পরিস্থিতির কারণে গণঅভ্যুত্থানের অর্জন হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক দেশের আলেম-ওলামা, ইসলামপ্রিয় জনতাসহ সব দেশপ্রেমিক নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই যেন সহিংসতা না ঘটে।’ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টা এ-সংক্রান্ত এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নিয়েও তার দলীয় সন্ত্রাসীদের একত্র করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, দেশের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে।’ এর ফলে দেশের মানুষের মনে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে সেটি বোধগম্য জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘তা সত্ত্বেও সরকার দেশের সব নাগরিককে আইন মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছে।’
অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে ভাঙচুরের এসব ঘটনাকে ‘অস্বাভাবিক ভাঙচুর ও সহিংসতা’ বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি এসব ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের ভূমিকাকে ‘বিবৃতিনির্ভর নির্লিপ্ততা’ উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দেশবাসীর ক্ষোভের মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে পলাতক শেখ হাসিনা ও তার দেশি-বিদেশি সহযোগীদের নির্লজ্জ ও ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণার পরিপ্রেক্ষিতে। তাই বলে আইনসিদ্ধ প্রতিক্রিয়ার পথ অনুসরণ না করে দেশব্যাপী যে প্রতিশোধপ্রবণ ভাঙচুর ও সহিংসতা চলেছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, এটি জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ সম্পর্কে দেশ-বিদেশে ইতিবাচক কোনো বার্তা দেবে না।’ জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর জনমনে যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, সেটা পূরণ করার দায়িত্ব যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের, তেমনি আন্দোলনের অংশীজনদেরও। তারা স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটাতে দৃঢ় ঐক্যের পরিচয় দিয়েছেন। আশা করব, পতিত রেজিম ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, ইন্ধন মোকাবিলায়ও তারা সুবিবেচনার পরিচয় দেবেন। গত সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা সংশ্লিষ্টদের ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো’ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। সন্দেহ নেই, সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। স্বার্থান্বেষী মহল সব রাজনৈতিক পালাবদলের সুযোগ নিতে চায়। জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ সরকারের উচিত, সব পক্ষকে শান্ত রেখে সেই সুযোগের পথ রুদ্ধ করা।