ফুটবলের ঐতিহ্যের আরেকটি অধ্যায় হয়তো বন্ধ হতে চলেছে। উয়েফা নাকি পরিকল্পনা করছে চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্ব থেকে অতিরিক্ত সময় তুলে দেওয়ার। ফুটবলের উত্তেজনা, নাটকীয়তা ও ঐতিহ্যকে সরিয়ে রেখে ব্যবসার স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অতিরিক্ত সময় ফুটবলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি অনেক স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করেছে। ১৯৮২ সালের এফএ কাপ ফাইনালে গ্লেন হডলের ১১০ মিনিটের গোলে টটেনহ্যাম এগিয়ে গিয়েছিল, যদিও পাঁচ মিনিট পর টেরি ফেনউইক সমতা ফেরান। ১৯৮২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ৯০ মিনিট শেষে ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানির ম্যাচ ছিল ১-১, কিন্তু ৯৮ মিনিটে ফ্রান্স ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ৩-৩ সমতায় গিয়ে পেনাল্টিতে জয় পায় পশ্চিম জার্মানি।
বলা হচ্ছে, খেলোয়াড়দের ক্লান্তি কমাতে এই পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে, ফুটবলারদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত ম্যাচের কারণে, অতিরিক্ত সময়ের কারণে নয়। চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন সংস্করণে গ্রুপ পর্বে বাড়তি দুটি ম্যাচ যোগ করা হয়েছে, নতুন নকআউট পর্বের ধারণাও এসেছে। এছাড়া ক্লাব বিশ্বকাপের সম্প্রসারণের ফলে দলগুলোকে আরও বেশি ম্যাচ খেলতে হবে। তাই অতিরিক্ত সময় বাদ দেওয়াটা ক্লান্তি কমানোর যথার্থ কারণ হতে পারে না।
সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও টিভি সম্প্রচার সহজ করাই সম্ভবত মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু তখন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) নিয়ে ১০ মিনিট ধরে বিতর্ক চললে সেটি কি সময় বাঁচানোর ক্ষেত্রে বিরোধী নয়? ফুটবলকে আরও আকর্ষণীয় করার নামে এই পরিবর্তন করলে, খেলার মৌলিকত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।
অতিরিক্ত সময় বাদ দেওয়া মানে আরও বেশি ম্যাচ পেনাল্টিতে গড়ানো। কিন্তু পেনাল্টি ফুটবলের অংশ হলেও এটি পুরো ফুটবল নয়। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা ভাবুন—লিওনেল মেসির দ্বিতীয় গোল, কিলিয়ান এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক সম্পন্ন করা, এমিলিয়ানো মার্তিনেজের শেষ মুহূর্তের দুর্দান্ত সেভ—এসব মুহূর্ত কি আমরা হারাতে চাই?
কখনো কখনো অতিরিক্ত সময় একপেশে বা উত্তেজনাহীন হতে পারে। কিন্তু সেটি খেলারই অংশ। ২০২২ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদ ও ম্যানচেস্টার সিটির লড়াইয়ে অতিরিক্ত সময়েই করিম বেনজেমার গোল জয় এনে দিয়েছিল। ফুটবল এমনই—ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলে নাটকীয়তা আসবেই।
এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য ফুটবলের স্বার্থ নয়, বরং বাণিজ্যিক স্বার্থ সংরক্ষণ। বড় দলগুলোর আরও বেশি রাজস্ব নিশ্চিত করতেই এই পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে, ফুটবলের সামগ্রিক উন্নতির জন্য অর্থের সুষম বণ্টনই সবচেয়ে জরুরি।
উয়েফার উচিত ফুটবলের মৌলিকত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখা। অতিরিক্ত সময় বাতিল করা মানে খেলার নাটকীয়তা কমিয়ে ফেলা। সংক্ষিপ্ততা মানেই উত্তেজনা নয়। বরং খেলাটির ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এটি স্পষ্ট যে উয়েফা ফুটবলের গুণগত মানের চেয়ে রাজস্ব বৃদ্ধিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ প্রকৃত সমস্যা হলো বৈষম্যমূলক রাজস্ব বন্টন এবং ক্লাবগুলোর ক্রমবর্ধমান আর্থিক শক্তির পার্থক্য। পরিবর্তনের নামে ফুটবলের ঐতিহ্যকে বাদ দেওয়া কি আদৌ সমাধান আনবে? ফুটবল কেবলই ব্যবসা নয়, এটি আবেগ, কৌশল ও ঐতিহ্যের মিশ্রণ। অতিরিক্ত সময় তুলে দিলে ফুটবল আরও উত্তেজনাপূর্ণ হবে নাকি একঘেয়ে ও কম আকর্ষণীয় হয়ে পড়বে—এমন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।