৩১ দফা নিয়ে সরকারকে উচ্চতর কমিটি গঠনের পরামর্শ গয়েশ্বরের

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফা নিয়ে উচ্চতর কমিটি গঠনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেছেন, আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে চায়, কিন্তু সরকার সেটা প্রয়োজন মনে করে কিনা? আজ প্রেসক্লাবের চারপাশে দেখি অনেক মানুষের অনেক দাবি। কিন্তু তারা কার কাছে এই দাবি করছে। তারা জানে না এই দাবি পূরণের এখতিয়ার এই সরকারের আছে কিনা।

রবিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক সভায় এ কথা বলেন তিনি। প্রজন্ম একাডেমি ও মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের যৌথ উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বিনা আন্দোলনে এদেশে কিছু আদায় হয় না, এখনো আদায় হবে না, আমাদের হয়তো পুনরায় রাজপথে নামতে হবে এবং অতীতের চেয়েও আরও বেশি শক্তি নিয়ে নামার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। বর্তমান সরকার কি চায় সেটা আমরাও বুঝতে পারি না, দেশেরও মানুষও বুঝতে পারে বলে মনে হয় না। তারা সংস্কারের কথা বলছে, সংস্কার একটি দীর্ঘ মেয়াদী প্রচেষ্টা। একজন অসুস্থ রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠাও একধরনের সংস্কার। বিএনপিই প্রথম ২৮ দফা সংস্কার কর্মসূচি প্রদান করে। এরপর ডান, বাম সকল রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে সেটাতে ৩১ দফা করা হয়েছে। এই সংস্কারের পরিধি আরো বিস্তৃত হতে পারে। দেশে যারা সুশীল আছেন, জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি আছেন তাদের মতামত সাপেক্ষে এই সংস্কারের দফা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। আপনারা কি করতে চান? জনগণ কি চায়? তার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকতে হবে। বাকশালও একটা সংস্কার ছিল, কিন্তু সেই সংস্কার কর্মসূচি সম্পর্কে আ’লীগের নেতাকর্মীরা জানতো না। কারণ সে রকম মনস্তাস্তিক প্রস্তুতিও তাদের ছিল না। ফলে সেই বাকশাল কর্মসূচি মার খায়।

বর্তমান সরকারের উদ্দেশ্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আপনারা ৫ সদস্যের একটি উচ্চতর কমিটি গঠন করতে পারেন। তারা বিএনপি’র ৩১ দফাসহ সকল সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে পারেন। প্রয়োজনে একে সংযোজন-বিয়োজনও করতে পারেন। তার জন্য বড়জোর ৩ মাসই যথেষ্ট। ৩ মাস পরে তারা যে প্রস্তাব করবেন সে অনুযায়ী সংস্কার প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। যারা পরবর্তীতে সরকার গঠন করবেন তারাও এই সংস্কার কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। তার জন্য বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করার কোন প্রয়োজন নেই।

আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন দৈনিক খোলা বাজার সম্পাদক ও প্রকাশক, গণতান্ত্রিক জাগ্রত বাংলাদেশের সভাপতি মো. জহিরুল ইসলাম কলিম, শিল্পপতি ও সমাজসেবক শাহীন মো. সোলায়মান মোল্লা, যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এসএম মিজানুর রহমান, রমিজ উদ্দীন রুমি, প্রতিবাদ’র সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন, গণতান্ত্রিক জাগ্রত বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজু আহমেদ শাহ, মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের ঢাকা মহানগর সভাপতি ওসমান কোরাইশী, মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের সদস্য মুকসেদুর রহমান মুকুল, মো. কবির হোসেন প্রমুখ।

সম্প্রতি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ভাঙচুরের বিষয়ে তিনি বলেন, ফজরের আজানের সময় ফজরের আজান দিতে হয়। সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আজান দিলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। ৫ আগস্টের পরে মুজিবের বাড়ি ভাঙা হলে সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতো না। এখন হঠাৎ করে ৬ মাস পরে এভাবে বাড়ি ভাঙাটাকে আমরা বিভ্রান্তির অংশ বলে মনে করি। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে চলেছে এবং এই সংগ্রামে কত মানুষ জীবন আত্মাহুতি দিল, হাজার হাজার নেতাকর্মী আহত-নিহত হল, কত মায়ের বুক খালি হল, এটা কখনো ১৫ দিনের আন্দোলনের ফসল নয়। কিন্তু আমরা বর্তমান সরকারের এবং তার সমর্থিত লোকজনের মুখে যখন ১৭ বছরের ত্যাগের কথা শুনি না তখনই মনে হয় এর মধ্যে কিন্তু আছে। আমরা বর্তমান সরকারকে মাথার মুকুট করে রাখতে চাই। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস একজন মুকুটের মত মানুষ। কিন্তু তালবাহানা করে তিনি যদি অদক্ষতা দেখান সেটা কারো জন্যই কল্যাণকর হবে না।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা আপনারা শুনে থাকতে পারেন। এই স্বাধীনতাও পরিপূর্ণ স্বাধীনতা নয়। কারণ মালিকের স্বাধীনতা চাইলে সংবাদকর্মীর স্বাধীনতা থাকে না। দেশে যা ঘটে তার প্রকৃত রিপোর্ট তারা করতে পারে না। করতে হলে সাংবাদিকের চাকরি চলে যায়। স্বাধীন সংবাদের জন্য সময় দরকার হয়। একইভাবে সংস্কার কর্মসূচিও শুরু করা যেতে পারে, সেটা অন্যরা এসে শেষ করবে। তিনি বাজার দর প্রসঙ্গে বলেন, বাজারদর আগে যেমন ছিল এখন তার চেয়েও খারাপ অবস্থা। মানুষের আয় রোজগারও যেমন বাড়েনি, তেমনি জীবনযাত্রার মানও বাড়েনি। আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলব, আপনারা মনস্তাস্তিকভাবে প্রস্তুতি নিন, প্রয়োজনে আমরা আবারও নির্বাচনের দাবিতে মাঠে নামবো।

বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, শিশুদের হাতে খেলনা দিলে সেটা সে ভাঙতেও পারে, নষ্টও করতে পারে, কিন্তু মেরামত করতে পারে না। মেরামত করতে হলে অভিজ্ঞ লোকের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে যারা দেশ চালাচ্ছেন অভিজ্ঞতার অভাব। তাদেরকে আমরা সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। তারা অভিজ্ঞ লোকদের পরামর্শ দিয়ে কাজ করতে পারতো। তাহলে যে সমস্যাগুলো তৈরী হয়েছে সেগুলো আগে থেকেই নিরসন করা যেতো। তিনি বলেন, বড়ই কষ্টের সাথে লক্ষ্য করছি বাজারমূল্য সরকার চেষ্টা করেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। প্রফেসর ইউনূস একজন মহাসম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু আমাদের উপদেষ্টারা যেভাবে দেশ পরিচালনা করছেন তারা জানেনই না বাজারে কোন জিনিসের কত দাম। বিশ্ববাজারে সয়াবিনের দাম কমে গেছে, অথচ আমাদের বাজারে সয়াবিন তেল পাওয়াই যাচ্ছে না। এটাতো অদক্ষতার নমুনা।

তিনি ভারতের উদ্দেশ্যে বলেন, আমাদেরও দাদা আছে, আমাদের দেশের বড় দাদা বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি থাকতে আপনাদের পরদেশে এসে দাদাগিরি করার প্রয়োজন নেই। তিনি প্রশ্ন তুলেন এখনো কিভাবে আ’লীগ ফনা তোলে। তারা কিভাবে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের বুকে গুলি চালায়?

তিনি রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের কথা দিচ্ছি আপনাদের আমরা হতাশ করবো না, জিয়া পরিবারের সমস্ত যন্ত্রণা এবং কষ্ট মাথায় রেখেই আপনাদের আমরা এই আশ্বাস দিতে পারি যে, দেশে নির্বাচন হলে বিএনপি আপনাদের নিয়েই সরকার গঠন করবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আমেরিকার ইন্টারস্টেট বিএনপি’র সভাপতি ও ফোবানা’র স্টিয়ারিং কমিটির সভাপতি কাজী সাখাওয়াত হোসেন আজম বলেন, আপনারা যথাসময়ে নির্বাচন দিন। আমরা নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য দেশে এসেছি। গত ১৭ বছরে আমরা দেশে আসতে পারি নাই, ভোটও দিতে পারি নাই। জাতি আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে দ্রুত একটি নির্বাচন দেয়ার জন্য। আপনারা জাতির এই আশা পূরণে তাদের নিরাশ করবেন না।

সভাপতির বক্তব্যে কালাম ফয়েজী বলেন, গতকাল একটি দলের প্রধান তার কর্মী সম্মেলনে বলেছেন, বিচারকার্য সম্পন্ন করে নির্বাচন দিতে। কথার মধ্যে এক ধরনের চক্রান্তের সুর লক্ষ্য করা যায়। কারণ বিচার প্রক্রিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। বিচার সম্পন্ন করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। ততদিন কি মানুষ নির্বাচনের অপেক্ষা করবে।