মনে রবে কি না রবে আমারে

পৃথিবীতে এমন কিছু প্রকল্প রয়েছে, যেগুলোর কাজ শেষ হতে শত, হাজার এমনকি লাখ বছর লেগে যাবে। আমাদের চোখের সামনেই এগুলোর শুরু, কিন্তু শেষটা দেখার সৌভাগ্য আমাদের হবে না। লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

আমরা এমন এক যুগে বাস করি, যেখানে ধৈর্য্যরে অভাব প্রকট। আধা ঘণ্টা দেরি হলেই রাগ, খাবার একটু দেরিতে এলে বিরক্তি, আর ওয়াইফাই ধীরগতির হলে যেন জীবন থমকে যায়। কিন্তু ভাবুন তো, যদি এমন কোনো কাজ করতে হয়, যার ফলাফল দেখতে আমাদের ৩০ প্রজন্মেরও বেশি সময় লেগে যাবে? আমরা তো ধৈর্য ধরে এক সিনেমাও মাঝখানে থামিয়ে রাখতে পারি না। অথচ আজ আমরা বলব সেসব অসাধারণ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের গল্প, যেখানে সময় ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করে এগিয়ে চলে।

১২০০ বছরের ধৈর্যের পরীক্ষা

ধরুন, আপনি একটা বাড়ি বানাতে শুরু করলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রতি দশকে মাত্র একটি ইট বসানো যাবে। বাড়ি শেষ হতে কত বছর লাগবে? গুনে গুনে ১২০০ বছর। অবিশ্বাস্য শোনালেও, জার্মানির ওয়েমডিং শহরে এমনই এক পিরামিড বানানো হচ্ছে, যার নাম টাইম পিরামিড। এটি শুধুই একটি স্থাপত্য নয়, এটি ধৈর্য, সময় ও ভবিষ্যতের প্রতি মানুষের প্রতিজ্ঞার প্রতীক। কারণ আমরা তো জানিই সব ভালো জিনিসই ধীরে ধীরে আসে। এটি বানাতে মোট ১২০টি কংক্রিট ব্লক লাগবে। কিন্তু ধীরে ধীরে, একেবারে ধীরগতিতে প্রতি দশকে মাত্র একটি ব্লক বসানো হবে। ১৯৯৩ সালে প্রথম ব্লকটি বসানো হয়েছিল। এরপর ২০০৩, ২০১৩ আর ২০২৩ সালে আরও তিনটি ব্লক যোগ হয়েছে। ভাবুন, আমরা যারা এখন বেঁচে আছি, তারা শুধু প্রথম কয়েকটি ব্লকই দেখতে পাবো। পুরো পিরামিডটি সম্পূর্ণ হবে ৩১৮৩ সালে, আমাদের আরও ত্রিশ প্রজন্ম পরে। চূড়ান্ত ব্লকটি স্থাপন করবে আমাদের ত্রিশ প্রজন্ম পরের কোনো এক বংশধর।

কিন্তু তারাও মিস করবে চেরনোবিল এক্সক্লুশন জোনে নিরাপদে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ। এই এলাকা ১৯৮৬ সালের পারমাণবিক দুর্ঘটনার ফলে এতটাই দূষিত হয়ে আছে যে, চার হাজার, পাঁচ হাজার, এমনকি ছয় হাজার সালেও সেখানে মানুষের নিরাপদ বসবাস সম্ভব হবে না। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, ২২,০০০ সাল নাগাদ এটি পুরোপুরি নিরাপদ হতে পারে।

১০ হাজার বছরের ঘড়ি

আমাদের ঘড়ির ব্যাটারি মাঝে মাঝেই বদলাতে হয়। কিন্তু কেমন হবে যদি এমন একটি ঘড়ি বানানো হয়, যা দশ হাজার বছর ধরে চলবে? এই অদ্ভুত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে লং নাউ ফাউন্ডেশন। তারা আমেরিকার টেক্সাসের এক পাহাড়ের মধ্যে বসাচ্ছে বিশাল এক ঘড়ি, যা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন এটি সহস্রাব্দ ধরে টিকে থাকে।

এই ঘড়ির মজার ব্যাপার হলো এটি প্রতি বছর মাত্র একবার ঘণ্টা বাজাবে এবং প্রতি হাজার বছর পর একবার কোকিল ডাকবে। কু কু ক্লকের আদলে বানানো এই ঘড়ি। কু কু ক্লক হলো একটি বিশেষ ধরনের ঘড়ি, যা সাধারণত পাখির আওয়াজে সময় জানান দেয়। এই ঘড়িতে প্রতি ঘণ্টায় একটি পাখি, সাধারণত কোকিল পাখি, বের হয়ে ‘কু কু’ শব্দে সময় ঘোষণা করে। ভাবুন, আজ থেকে হাজার বছর পর কেউ এই ঘড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে আর তার কানে ভেসে আসবে একবার মাত্র কোকিলের ডাক। এই ঘড়ির উদ্দেশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া যে, মানুষ কেবল আজকের জন্যই বাঁচে না, ভবিষ্যতের জন্যও পরিকল্পনা করা দরকার।

ভবিষ্যতের জন্য এক বাক্স বিস্ময়

আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর পরের পৃথিবীর মানুষ আমাদের সম্পর্কে কী জানবে? আমরা কেমন ছিলাম, কী খেতাম, কী নিয়ে চিন্তা করতাম? আমাদের সময়ের স্মৃতিচিহ্ন ভবিষ্যতে পাঠানোর জন্য তৈরি হয়েছে টাইম ক্যাপসুল। ১৯৩৬ সালে আমেরিকার ওগলথর্প ইউনিভার্সিটিতে তৈরি করা হয়েছিল এমনই একটি টাইম ক্যাপসুল, যার নাম ঈৎুঢ়ঃ ড়ভ ঈরারষরুধঃরড়হ। একবার খোলার পর দ্বিতীয়বার এটি খোলা হবে ৮১৭৪ সালে! তার মানে, এখন থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর পরে। আরেকটি চমকপ্রদ টাইম ক্যাপসুল হচ্ছে কঊঙ ঝঢ়ধপব ঞরসব ঈধঢ়ংঁষব। এটি পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকবে পঞ্চাশ হাজার বছর এবং তারপর পৃথিবীতে ফিরে আসবে, যাতে ভবিষ্যতের মানুষ আমাদের লেখা বার্তা পড়তে পারে! ভাবতে কেমন লাগে, পঞ্চাশ হাজার বছর পরও কেউ আমাদের পাঠানো চিঠি পড়বে?

পৃথিবীর শেষ বীজের ভান্ডার

ধরুন, ভবিষ্যতে কোনো একদিন পৃথিবীর সব ফসল ধ্বংস হয়ে গেল। তখন কী হবে? মানুষ কি আর কোনো দিন কৃষি ফসল করতে পারবে না? এই ভয়ংকর ভবিষ্যতের জন্যই নরওয়ের বরফে ঢাকা এক দ্বীপে তৈরি হয়েছে সোয়ালবার্ড গ্লোবাল সিড ভল্ট। এটি এক বিশাল ভান্ডার, যেখানে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের ফসলের বীজ সংরক্ষণ করা হয়েছে। যদি কোনো কারণে কৃষি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে এখান থেকে সংরক্ষিত বীজ নিয়ে আবার চাষাবাদ শুরু করা যাবে।

এক কথায়, এটি পৃথিবীর কৃষির জন্য এক ব্যাকআপ কপি।

মহাবিশ্বের যা মিস করব

কখনো কি মনে হয়েছে, ‘ইশ! এই জিনিসটা দেখার জন্য আমি আরও কয়েক মিলিয়ন বছর বাঁচতে চাই।’ কারণ মহাবিশ্বে এমন কিছু দারুণ ঘটনা ঘটতে চলেছে, যা আমাদের দেখা হবে না, কিন্তু সত্যি বলতে গেলে, আমাদের ভবিষ্যতের প্রপৌত্রেরও দেখা হবে না। আরে বাবা, এসব ঘটনা ঘটতে লাখ, কোটি এমনকি বিলিয়ন বছর লেগে যাবে।

মহাজাগতিক রেসলিং : এক বিশাল মহাজাগতিক রেসলিং ম্যাচ আমরা মিস করব। আমাদের প্রিয় ছায়াপথ মিল্কিওয়ে, যার বাসিন্দা আমরা, আস্তে আস্তে তার প্রতিবেশী অ্যান্ড্রোমেডা গ্যালাক্সির দিকে ছুটে চলেছে। প্রতি সেকেন্ডে ৩০০ কিলোমিটার গতিতে! এভাবে চলতে থাকলে ৩.৭৫ বিলিয়ন বছর পর দুই গ্যালাক্সির মহাসংঘর্ষ ঘটবে।  কী হবে তখন? বিশাল বিশাল নক্ষত্রের জন্ম হবে। রাতের আকাশ হবে অদ্ভুত সুন্দর, রঙিন আলোয় মোড়ানো। দুই গ্যালাক্সি এক হয়ে একটি নতুন সুপার-গ্যালাক্সিতে পরিণত হবে, যার নাম ‘মিল্কড্রোমেডা’। 

দুর্ভাগ্যবশত, এই মহাজাগতিক লড়াই আমরা মিস করব। কারণ ভবিষ্যতের প্রাণীরা আবার ইন্টারনেটের সূচনা, প্রথম ভাইরাল মিম আর রিকরোল্ড হওয়া মিস করবে।

চাঁদ সরে যায় দূরে :  চাঁদ প্রতি বছর পৃথিবী থেকে ১ সেন্টিমিটার দূরে সরে যাচ্ছে। ছোট ব্যাপার মনে হচ্ছে? এভাবে চলতে থাকলে ৬০০ মিলিয়ন বছর পর, চাঁদ আর সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে রাখতে পারবে না, মানে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ তখন আর সম্ভব হবে না।  এখন যে মোহনীয় সূর্যগ্রহণ আমরা দেখি, ভবিষ্যতের মানুষেরা শুধু সেই গল্প শুনবে আর হয়তো ছবি দেখবে। তখন তারা ভাববে, ‘ইশ! আমরা যদি ২০২৪ সালে জন্মাতাম, তখন ইন্টারনেটও ছিল, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণও ছিল!’

থাকবে না শনির রিং : মানুষ যেদিন শনি গ্রহ আবিষ্কার করল সেদিন থেকেই সে ভালোবাসতে শুরু করে শনিগ্রহের চারপাশে থাকা রিংগুলো। এই বিখ্যাত বলয়গুলো আর ৫০-১০০ মিলিয়ন বছর পর থাকবে না অবশ্য। তারা হয় মহাকাশের অন্যদিকে ছড়িয়ে যাবে, নয়তো শনির অভ্যন্তরে গিয়ে পতিত হবে। ভবিষ্যতের প্রজন্ম হয়তো একদিন বলবে, ‘ওহ, তোরা কি শনি গ্রহের রিং দেখেছিস? কত ভাগ্যবান।’ কিন্তু আমরা তখন উত্তর দিতে পারব না, কারণ আমরা আর থাকব না।

আপনার বয়সী একটি তারা : আপনি যখন আকাশের দিকে তাকান, তখন হয়তো দেখছেন নক্ষত্রের আলো, যা আপনার জন্মের সময়েই যাত্রা শুরু করেছিল। আপনার জন্মের আগে, এমনকি সেই দিনগুলোতে, মহাবিশ্বের কোনো এক কোণে একটি ছোট আলোকবিন্দু একটি ফোটন একটি তারার অন্তরাল থেকে বের হয়ে পৃথিবী পর্যন্ত আসতে শুরু করেছিল। এই ফোটনটি মহাকাশে ভেসে ভেসে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসে, যেন একটি দীর্ঘ যাত্রা শুরু হয়। অবশেষে, সেই আলো আপনার চোখে এসে পৌঁছায়। যখন তা আপনার চোখের রেটিনায় পৌঁছায়, তখন আপনি সেই আলোর যাত্রার সমাপ্তি অনুভব করেন। যেন মহাবিশ্বের এক দীর্ঘ যাত্রা শেষ হয়ে আপনার জন্মের মাধ্যমে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এটি একটি একদম অন্যরকম অনুভূতি। আপনি যদি আপনার জন্মদিন বা গর্ভধারণের তারিখটি ডযবহ ডধং ও ঈড়হপবরাবফ? ওয়েবসাইটে দিয়ে হিসাব করেন, তখন হয়তো এমন একটি নক্ষত্র খুঁজে পাবেন, যা আপনার বয়সের সমান আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। ভাবুন তো, আপনি যখন সেই তারার দিকে তাকান, আপনি আসলে দেখতে পাচ্ছেন এমন একটি আলোর ঝলক, যা মহাকাশের অন্তহীন পথ অতিক্রম করতে করতে, আপনার গর্ভধারণের সময় ছেড়ে দিয়েছিল। এটি যেন এক অদ্ভুত মহাজাগতিক সংযোগ, যেখানে আপনার জীবনের একটি মুহূর্ত, মহাবিশ্বের অন্য প্রান্তে থাকা এক আলোর ঝলককে পুনরায় জীবন্ত করে তোলে।

মহাকাশ এতটাই বিশাল যে, আমরা তার সীমানার এক কল্পনাও আঁকতে পারি না, অথচ আমাদের জীবন এতটাই ক্ষুদ্র যে, তার ছোট্ট একটা ক্ষণ-ই আমরা অনুভব করি। মহাবিশ্বের নিঃসীমতা যেন আমাদের অস্তিত্বকে তুলনায় আরও ক্ষণস্থায়ী করে তোলে। আমরা কখনো নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, ছায়াপথের সংঘর্ষ বা শনির রিংয়ের পতন দেখার সৌভাগ্য অর্জন করব না। এসব কিছুই আমাদের জীবনের সীমার বাইরে চলে গেছে, তারপর আমরা কী পাব? তবে চিন্তা করবেন না। মহাবিশ্ব এতটাই বিস্তৃত যে, আমরা আমাদের নিজস্ব সময়েই অসংখ্য বিস্ময় আবিষ্কার করতে পারি। আমরা এমন অনেক কিছু দেখছি, যা আমাদের পূর্বপুরুষের জন্য ছিল অদেখা আলোর গতির কথা, ব্ল্যাকহোল, মহাকাশে মানুষের প্রথম পদচিহ্ন, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ আর ইন্টারনেটের সেই আশ্চর্য শুরুর দিনগুলো। এগুলোর সবই আমাদের জন্য এক মহাকাব্যিক অভিজ্ঞতা।

যদি আপনাকে ১০,০০০ বছরের জন্য কিছু রেখে যেতে বলা হয়, আপনি কী রেখে যাবেন?