‘‘দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শক্তিশালী করতে দুদক সংস্কার কমিশন ৪৭টি সুপারিশ তুলে ধরেছে। যার মধ্যে অনেকগুলো সুপারিশই ভালো। এসব সুপারিশের কিছু বাস্তবায়ন করবে সরকার, আর কিছু দুদক। তবে সংস্কার কমিশন প্রতি জেলায় ‘স্পেশাল জজ আদালত’ প্রতিষ্ঠার যে সুপারিশ করেছে, সেটি সঠিক হয়নি। দুর্নীতির মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে ‘পৃথক স্পেশাল আদালত’ করা প্রয়োজন। দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে এ বিষয়টি আসেনি। এটি আসার দরকার ছিল। এটি না হলে দুর্নীতির মামলার বিচারকাজ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা রয়েই যাবে। বিচারকরাও অন্যান্য মামলার চাপে দুর্নীতির মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে রায় ঘোষণা করতে পারবেন না।’’
গতকাল রবিবার দুদকের লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন সাবেক মহাপরিচালক সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. মইদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরের কাছে এসব মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘‘সারা দেশে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৩ হাজার দুর্নীতির মামলা করা হয়। এসব মামলার মাত্র ১০ শতাংশের বেশি বিচারকাজ নিষ্পত্তি করা যায় না। দুর্নীতির মামলার বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দুদক সংস্কার কমিশন যেসব জেলায় দুদকের কার্যালয় আছে সেখানে ‘স্পেশাল জজ আদালত’ স্থাপনের সুপারিশ করেছে। ভবিষ্যতে যেসব জেলায় দুদকের কার্যালয় স্থাপন করা হবে, সেখানে দ্রুত সময়ের মধ্যে ‘স্পেশাল জজ আদালত’ স্থাপন করতে হবে। দুদক সংস্কার কমিশন কী মনে করে এই সুপারিশ করেছে, সেটি জানি না। বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলায় স্পেশাল জেলা জজ আদালত রয়েছে। সেই আদালতে দুর্নীতির মামলাসহ অন্যান্য মামলার বিচারকার্য চলে। আদালতগুলোতে এত পরিমাণ মামলার জট লেগে আছে যে, বিচারকরা দুর্নীতির মামলার বিচারের ক্ষেত্রে তেমন কোনো নজর দিতে পারেন না। মামলার বিচারকাজ শেষ হতেও অনেক সময় লেগে যায়। তাই স্পেশাল জজ আদালত করলেই দুর্নীতির মামলার বিচারকাজে গতি আসবে না। দুর্নীতির মামলা বিচারের জন্য পৃথক স্পেশাল আদালত স্থাপন করতে হবে, যেই আদালতে শুধু দুর্নীতির মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন করা হবে। তাহলে বিচারকরা দুর্নীতির মামলার গুরুত্ব বুঝে রায় দিতে পারবেন এবং মামলার বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। আর প্রতি জেলায় দুদকের আলাদা আদালতের দরকার নেই। প্রতি বিভাগে একটি করে আদালত করলেই হবে।
মইদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘প্রতি বছর বহুসংখ্যক দুর্নীতির মামলার বিষয়ে হাইকোর্টে আপিল করা হয়। সেখানেও একই অবস্থা। যেখানে দুর্নীতির মামলার আপিল করা হয়, সেখানে অন্যান্য মামলার আপিলও হয়। এতে হাইকোর্টে আপিল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। আপিলের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সেখানেও পৃথক আদালত করা দরকার। যেখানে শুধু দুর্নীতির মামলার আপিল নিষ্পত্তি করা হবে। এ দুটি বিষয় দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে আসলে ভালো হতো।’
দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ পাচারে ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে বিভিন্ন এজেন্সির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করা এবং ‘স্বাধীন’ ও ‘সাংবিধানিক’ স্বীকৃতি দেওয়াসহ দুদক সংস্কারে ৪৭টি সুপারিশ করেছে দুদক সংস্কার কমিশন। গত শনিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এর আগে গত ১৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল দুদক সংস্কার কমিশন।
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে দুদককে একটি ‘কার্যকর’ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেব গড়ে তুলতে এবং প্রতিষ্ঠানটির আমূল সংস্কারে ৪৭ সুপারিশের পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার, আইন পরিবর্তনসহ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করে দুদক সংস্কার কমিশন। সংস্কার কমিশন মনে করে, দুর্নীতি প্রতিরোধ দুদকের একার কাজ নয়। দুর্নীতি নির্মূলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি। দুদকের রাজনৈতিক, আমলাতান্ত্রিক প্রভাব ও সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, অনিয়ম যে ধরনের অনাচার রয়েছে সেগুলো দূর করতে টাস্কফোর্স গঠন করার সুপারিশ করছে।