আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে দেশ জুড়ে চলছে বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’। গত শনিবার রাত ১২টা থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানের প্রথম দিন গতকাল রবিবার দুপুরের মধ্যেই যৌথ বাহিনীর সদস্যরা রাজধানী ঢাকা ও এর পাশের জেলা গাজীপুরসহ সারা দেশ থেকে গ্রেপ্তার করেছেন অন্তত ১ হাজার ৩০৮ জনকে। যাদের মধ্যে রয়েছেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাষ্ট্র ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বহু নেতাকর্মী। চলমান এ অভিযানের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, সারা দেশে ‘ডেভিল’ যতদিন শেষ না হবে, ততদিন পর্যন্ত অপারেশন চলবে। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, দেশকে যারা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেই অপারেশন ডেভিল হান্ট পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম চলমান এ বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে দ্রুতই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া সব বাহিনীর সমন্বয়ে একটি ‘সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার’-এর মাধ্যমে এ অভিযান সমন্বয়ের কথা জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর জানিয়েছেন, শনিবার রাত থেকে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ১ হাজার ৩০৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’সহ পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে তাদের আটক করা হয়। এর মধ্যে দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ২৭৪ জনকে। অন্যদিকে সারা দেশের রেঞ্জ পুলিশ গ্রেপ্তার করে ১ হাজার ৩৪ জনকে।
চলমান অভিযানের বিষয়ে গতকাল ফার্মগেটের মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের নতুন মৃত্তিকা ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “সারা দেশে ‘ডেভিল’ যতদিন শেষ না হবে, ততদিন পর্যন্ত অপারেশন চলবে। যারা দেশকে অস্থিতিশীল করবে তাদের টার্গেট করে ডেভিল হান্ট অপারেশন চলবে। গাজীপুরে যারা ছাত্র-জনতার ওপর হামলা করেছে তাদের অনেককেই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাড়াতাড়ি বাকিদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।”
এর আগে গতকাল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ সম্পর্কে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান। স্বরাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘বিপ্লব যে দেশে হয়, সে দেশে পরাজিত শক্তিকে কেউ রাখে না। তবে বাংলাদেশে সরকার অতটা অমানবিক হতে পারেনি।
দেশকে যারা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধেই অপারেশন ডেভিল হান্ট পরিচালিত হচ্ছে। আমরা বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছি, তার অনেকগুলো চলমান রয়েছে। আগামীতে তার কিছুটা আমরা রিভিউ করতে যাচ্ছি। তার একটা যেটা কালকে (শনিবার) হয়েছে ডেভিল হান্ট অপারেশন। যেখানে যৌথভাবে সবাই ফোকাসড ওয়েতে কিছু কাজ করবে। যেসব কাজের মধ্যে দেশের স্টেবল (স্থিতিশীল) অবস্থাকে আনস্টেবল (অস্থিতিশীল) করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেটাকে আমরা নিউট্রালাইজ (নিষ্ক্রিয়) করব। এর জন্য আইনানুগপন্থায় যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেটা নেব।’
অপারেশন ডেভিল হান্ট সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে ‘সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার’ সন্ধ্যা (গতকাল) থেকেই কাজ শুরু করবে।” গতকাল বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রেস সচিব বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণের জন্য সব বাহিনীর সমন্বয়ে একটা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার আজ (গতকাল) সন্ধ্যা থেকে কাজ শুরু করবে। এর ফলে খুব দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছি।’
গাজীপুরে গত শুক্রবার রাতে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং পাল্টা হামলায় কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনার পর সারা দেশে শনিবার থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামের এ অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী ছাড়াও পুলিশ, বিজিবি, আনসার, কোস্ট গার্ড সদস্যদের সমন্বয়ে এ অভিযান চালানো হবে বলেও জানানো হয়েছে।
‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ কেন প্রয়োজন হলো জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, ‘এখন দেখা গেল র্যানডম শুরু হয়ে গেছে দেশকে আনস্টেবল করার চেষ্টা। এ জিনিসটা যেন না থাকে। যাতে মানুষের মনকে উদ্বেলিত না করে, সেজন্য এ প্রচেষ্টা। আরেকটু ফোকাসড ওয়েতে।’
অভিযানের নামকরণ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকটা অপারেশনের একটা কোড নেইম হয়। ফোকাস করার জন্য। পুলিশের এবং ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা আছে, সে ক্ষমতাই ডেভিল হান্ট অপারেশনে প্রয়োগ করা হচ্ছে।’
অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জামিন পাওয়া নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘অনেক লোক মনে করেছে ওই সময় বের হলে আমার অসুবিধা হবে। কিন্তু এখন যারা সাজা খেটে বের হয়েছে তারা ২৫ বছর-২০ বছর জেলে থেকেছে। হতে পারে সন্ত্রাসী এখনো হয়তো। যদি সেরকম কোনো অ্যাকশন হয় তাহলে ধরব।’
গাজীপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় গ্রেপ্তার ৩৪ : গাজীপুর মহানগরীর ধীরাশ্রমে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত আওয়ামী লীগের ৩৪ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে মহানগর পুলিশ। অন্যদিকে চলমান অপারেশন ডেভিল হান্টে আওয়ামী লীগের ৪০ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ। মহানগর পুলিশ ও জেলা পুলিশের অভিযানে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের এক ভাতিজা ও তার স্ত্রী রয়েছেন। তারা হলেন আমজাদ মোল্লা ও তার স্ত্রী সাবিনা আক্তার। গ্রেপ্তার আতঙ্কে ধীরাশ্রমসহ নগর জুড়ে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক কর্মী-সমর্থক বাড়িছাড়া হয়ে গেছেন।
এদিকে শনিবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশ শেষে সন্ধ্যায় গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে রাজবাড়ী সড়কে দুর্বৃত্তের গুলিতে মোবাশ্বির নামে এক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় মোবাশ্বির বাদী হয়ে সদর মেট্রো থানায় মামলা করেছেন।
গত শুক্রবার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের নগরীর ধীরাশ্রমের বাড়িতে মারধর করে আহত করার ঘটনা এবং শনিবার বিকেলে এক শিক্ষার্থীকে গুলি করার ঘটনায় উত্তাল গাজীপুর গতকাল অনেকটা শান্ত ছিল। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। রবিবারও ধীরাশ্রম এবং দক্ষিণখান এলাকা ছিল থমথমে। এলাকার দোকানপাটগুলোর বেশিরভাগ বন্ধ ছিল। রাস্তায় পুরুষ মানুষের চলাচল ছিল খুবই কম। গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেক বাড়ি থেকে ভাড়াটিয়াও চলে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল সদর উপজেলার ভাওয়াল মির্জাপুরে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে।
কুমিল্লায় গ্রেপ্তার ৩ : অপারেশন ডেভিল হান্টে কুমিল্লায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার তিনজনই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
ঈশ্বরদীতে ৩ যুবলীগ নেতা গ্রেপ্তার : ঈশ্বরদীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলার ঘটনায় ঈশ্বরদী পৌর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিনসহ তিন যুবলীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সকালে তাদের আটক করে পুলিশ।
ঠাকুরগাঁওয়ে গ্রেপ্তার ১৫ : অপারেশন ডেভিল হান্টে ঠাকুরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের ১৫ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় চার, পীরগঞ্জ থানায় দুই, রুহিয়া থানায় দুই, রানীশংকৈল থানায় দুই এবং বালিয়াডাঙ্গী থানার পাঁচজন রয়েছেন।
নোয়াখালীতে সাবেক চেয়ারম্যানসহ আটক ৭ : অপারেশন ডেভিল হান্টের প্রথম দিনে নোয়াখালীর হাতিয়ায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে চরঈশ্বর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলাউদ্দিন আজাদসহ সাতজনকে আটক করেছে। শনিবার রাতে হাতিয়ার বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।
কুমারখালীতে দুই ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার : অপারেশন ডেভিল হান্টের অংশ হিসেবে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ছাত্রদের করা নাশকতা মামলায় নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সকালে কুমারখালী পৌরসভার পদ্মপুকুর এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে দুপুরে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তাররা হলেন কুমারখালী পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি খন্দকার মুবিন হাসান প্রান্ত ও উপ-দপ্তর সম্পাদক মেজবাউল হক হৃদয়।
রাঙ্গামাটিতে আওয়ামী লীগ নেতাসহ আটক ৩ : রাঙ্গামাটিতে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনছুর আলীকে আটক করে ডিবি পুলিশ। এর আগে ডিবি পুলিশ রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মো. মুছা মাতব্বরের বাসভবনে অভিযান পরিচালনা করলে তাকে তার বাসায় পাওয়া যায়নি। পরে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের বাসভবনে অভিযান চালিয়ে সাধারণ সম্পাদক মনছুর আলীকে আটক করে।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিরা