নির্বাচন আয়োজনের চাপ 

ভোটাধিকার গণতন্ত্রের ভিত্তি। বাংলাদেশের মানুষ গত দেড় দশকে টের পেয়েছে যে, ভোটাধিকার হরণ করে নিলে দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহির ন্যূনতম জায়গা থাকে না; জন্ম হয় ভয়াবহ, অপ্রতিরোধ্য স্বৈরাচারের। গণঅভ্যুত্থানের মুখে হাসিনার পতনের পর ক্ষমতায় এসেছে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। একদিকে হাসিনাশাহীর ফেলে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ, অন্যদিকে গণআন্দোলনের পরে মানুষের আকাশচুম্বী আকাক্সক্ষার ফলে ইউনূস সরকারের জন্য দায়িত্বটি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। নির্বাচনব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিচার বিভাগসহ প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রই হাসিনার শাসনামলে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ফলে, একদিকে যেমন নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে ফেরার আকাক্সক্ষা অন্যদিকে মাথায় রাখতে হয় এইসব ক্ষেত্রের সংস্কারের, কেননা সংস্কার ছাড়া তড়িঘড়ি নির্বাচনে গেলে তা আদতে আবারও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ফলত, ইউনূস সরকারের প্রথম থেকেই প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় নির্বাচনের তারিখ। বেশি সময় নিয়ে অধিক সংস্কার করে নির্বাচন নাকি অল্প সংস্কারেই যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন? রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন নিয়ে চাপ থাকলেও সংস্কার প্রশ্নে তারা সরকারের প্রতি সহযোগিতাই দিয়ে চলছেন। তবে, আগস্টের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা আকাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছেনি। নানা রকম সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও পতিত স্বৈরাচারের যেসব দোসর গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের বিচারকাজে বিলম্ব জনমনে ক্ষোভ তৈরি করছে, বাজারে দ্রব্যমূল্যের রাশ টেনে ধরা যায়নি, দেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আস্থার পরিবেশ নেই। এমতাবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। দ্রুত নির্বাচন দিয়ে রাজনৈতিক সরকারের জন্য চাপ বাড়ছে।

প্রধান উপদেষ্টা ১৬ ডিসেম্বরের বক্তব্যে বলেছিলেন, যদি অল্প পরিমাণে সংস্কারসহ নির্বাচন করতে হয় সেখানেই যদি রাজনৈতিক মতৈক্য গিয়ে দাঁড়ায় তাহলে পরে এ বছরের শেষ নাগাদ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ইলেকশন; আর যদি আরেকটু সংস্কার করার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে ২০২৬-এর জুন নাগাদ ইলেকশন করা সম্ভব। তবে, অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের জন্য কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘জনগণের যে প্রত্যাশা আছে নির্বাচনের একটা রোডম্যাপ ঘোষণা করবেন প্রধান উপদেষ্টা এবং সেটার মধ্য দিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি।’

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর সোমবার মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘দ্রুত নির্বাচনের জন্য আমরা তাদের তাগাদা দিয়েছি। ন্যূনতম যে সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে, রিফর্ম কমিশন করেছেন, তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে কনসেনসাস হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার বিষয়ে আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলেছি।’ দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচন চায় বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে, অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন চায়। এ ক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান পুরো বিপরীতে। অন্যরা তেমন স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি। বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমরা খুব পরিষ্কার করে আগেও বলেছি, এখনো বলছি, জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে না। আমরা এ ব্যাপারে কোনোভাবেই একমত হব না।’ অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ডিসেম্বরে ভোট ধরেই সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো প্রস্তুতি নেই নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থাটির। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ইসির অবস্থান তুলে ধরে এ কথা জানান।

সরকারের তরফ থেকে জানা গেছে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠক হবে যাতে সভাপতিত্ব করবেন প্রধান উপদেষ্টা। ছয় সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে সেদিন থেকে সংলাপ শুরু হবে। সংস্কার কমিশনের সদস্যরা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শরিকরা বৈঠকে অংশ নেবেন। সেই বৈঠক থেকেই নির্বাচনের রূপরেখা পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বৈঠকের ওপর গোটা দেশের চোখ থাকবে।