সংস্কারে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সহায়তা চান ড. ইউনূস

ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট সামিট বা ‘বিশ্ব সরকার সম্মেলন ২০২৫’-এ অংশ নিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত যাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আজ বুধবার সন্ধ্যায় এমিরেটসের একটি ফ্লাইটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শহর দুবাইয়ের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন তিনি। আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দুবাইয়ে চলবে এ সম্মেলন।

সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য গত ১৩ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টাকে আমন্ত্রণ জানান সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এবং দুবাইয়ের শাসক মোহাম্মেদ বিন রাশেদ আল মোকতাম। সম্মেলন সম্পর্কে গত রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, এবারের সম্মেলন সরকারগুলোর মধ্যে কার্যকরী অংশীদারত্ব ও বৈশ্বিক মতবিনিময় এবং সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকার ও জনগণের মধ্যকার সেতুবন্ধ সৃষ্টিতে প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে। প্রধান উপদেষ্টার সম্মেলনে যোগদানের মাধ্যমে বৈশ্বিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে তার চিন্তা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া, সে সময় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।

রফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে সুসম্পর্ক বিদ্যমান। অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং অভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে এ সম্পর্ক ক্রমেই সুসংহত হয়েছে। দেশটিতে বসবাসরত বড়সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এ ছাড়া টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও ক্রমবর্ধমান। উভয় দেশ জাতিসংঘ ও ওআইসির মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে কাজ করছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার বাংলাদেশের অবকাঠামো ও স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিয়মিতভাবে বিনিয়োগ করছে। প্রধান উপদেষ্টার সফরকালে এ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্মেলনের আয়োজক বিভিন্ন সেশনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য প্রধান বিচারপতি, উপদেষ্টা, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়কসংক্রান্ত বিশেষ দূত এবং নির্বাহী চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষকে (বিডা) আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচির প্রতি বিশ্বব্যাংকের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত : এদিকে বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজার গতকাল ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহীত চলমান সংস্কার কর্মসূচির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

এ সময় মার্টিন রেইজার বাংলাদেশে চলমান সংস্কার কর্মসূচির প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। বৈঠকে উভয়ে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কর ব্যবস্থাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন পদ্ধতি চালু এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয় আলোচনায় উঠে আসে।

বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে সুশাসন ও জবাবদিহির উন্নয়নে জরুরি সংস্কারে সহায়তা করছে, যার মধ্যে করনীতি ও প্রশাসন, সরকারি ক্রয় এবং পরিসংখ্যান সংক্রান্ত সংস্কার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

রেইজার বলেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, ভবিষ্যৎ সরকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য এ সংস্কারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, এ সংস্কারগুলো জনগণ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসন ও জবাবদিহির প্রতি আস্থা তৈরি করতে সহায়তা করবে, যা ভবিষ্যতের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করবে।

রেইজার কর প্রশাসন ও করনীতির পৃথকীকরণের আহ্বান জানান, যাতে রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, কর রেয়াত ও ছাড় দেওয়ার একমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্র্তৃপক্ষ হওয়া উচিত সংসদ।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এবং সংস্কারে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সহায়তা কামনা করেছেন। গতকাল ঢাকায় মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি জ্যাকবসনের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি এ সহায়তা চেয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং বিশ্বব্যাপী ইউএসএআইডির কাজ স্থগিত করার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডা, রোহিঙ্গা সংকট, অভিবাসন এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন। অধ্যাপক ইউনূস একটি ঐকমত্য কমিশন গঠন এবং এর তত্ত্বাবধানে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করার জন্য তার সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংস্কারগুলোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর পর রাজনৈতিক দলগুলো সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য ‘জুলাই সনদে’ স্বাক্ষর করবে। চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জ্যাকবসন জোর দিয়ে বলেছেন, নতুন সরকারের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া উচিত। তিনি সম্প্রতি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্র্তৃক শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ সম্পর্কেও প্রধান উপদেষ্টাকে জিজ্ঞাসা করেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তিনি বাংলাদেশি সমাজে পুনর্মিলনের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রতিশোধের চক্র ভেঙে দেশে শান্তি ও সম্প্রীতির ভিত্তি তৈরি করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই এই দেশের সন্তান। তাই আমাদের মধ্যে প্রতিশোধের কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। তিনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে তাদের অভিযানের সময় যেকোনো মূল্যে মানবাধিকার বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য মার্কিন প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মার্কিন সহায়তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

অধ্যাপক ইউনূস বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বির জীবন রক্ষাকারী প্রচেষ্টাসহ বাংলাদেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সহায়তা স্থগিত করার মার্কিন সিদ্ধান্তের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশ এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের হাইতির মতো দেশগুলোতে ডায়রিয়া ও কলেরাজনিত মৃত্যু প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে আইসিডিডিআর,বির ভূমিকা তুলে ধরেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ইউএসএআইডির ক্ষেত্রে যাই ঘটুক না কেন, পুনর্গঠন, সংস্কার এবং পুনর্নির্মাণের এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের মার্কিন সহায়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, এটা এখন বন্ধ করার সময় নয়।