যে মেলায় মাছ কিনতে প্রতিযোগিতায় নামেন জামাইরা

৪০০ বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বগুড়ার গাবতলীতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহের মেলা। সন্নাসী পূজার মেলা হিসেবে এটির যাত্রা শুরু হলেও কালের বিবর্তনে এটি পোড়াদহ মাছের মেলা এবং জামাই মেলা হিসেবে পরিচিত লাভ করে। একদিন ব্যাপী এ মেলার প্রধান আকর্ষণ বিভিন্ন প্রজাতির বিশাল আকৃতির মাছ।

আজ বুধবার পোড়াদহ মেলায় অন্যতম আকর্ষণ ছিল- যমুনা নদীতে ধরা পড়া ২৭ কেজি ওজনের বাঘাইড় মাছ। মাছটি মেলায় নিয়ে এসেছেন সিরাজগঞ্জের মাছ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম ও জমির উদ্দিন। তারা মাছটি কেজি প্রতি ১৬৫০ টাকা দাম হাঁকালেও পরে তা ৩৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। স্থানীয় মহিষাবান গ্রামের কয়েকজন মিলে মাছটি কিনে নেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, প্রতিবছর বাংলা সনের পৌষের শেষ বুধবার জেলার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়নের ইছামতী নদীর অদূরে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ এলাকায় বসে এ মেলা। ঈদে জামাইরা না আসলেও তারা মেলায় আসেন এবং শ্বশুরের দেওয়া টাকার সঙ্গে নিজে টাকা দিয়ে বড় মাছ কিনে নিয়ে যান।

সরেজমিনে মেলায় গিয়ে দেখা যায়, মেলা প্রাঙ্গণেও রয়েছে প্রায় ৪ শতাধিক খুচরা মাছ বিক্রেতা। সারিবদ্ধভাবে এসব ব্যবসায়ীরা মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। দোকানে মাঝারি, ছোট বিভিন্ন জাতের মাছ রয়েছে। 

গাবতলীর মহিষবান গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ জানান, এবার মেলায় তিনি নিয়ে এসেছেন জয়পুরহাট থেকে ২৫ কেজি ওজনের কাতলা মাছ, ২৫ কেজি ব্ল্যাককার্প মাছ। প্রতি কেজি ১৫শ’ হাজার টাকা করে দাম হাঁকিয়েছেন। 

অপরদিকে মেলায় নজর কেড়েছে গাবতলী উপজেলার সোনাকানিয়া এলাকার আব্দুল বারী হালাইগরের ১৫ কেজি ওজনের বিশালাকৃতির মাছ মিষ্টি। যার দাম হাঁকিয়েছেন প্রতি কেজি ৬৫০ টাকা করে। মাছটির দাম এ পর্যন্ত ৬ হাজার টাকা উঠেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

মেলায় মাছ বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি কেজি গাঙচিতল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চিতল ৭০০-১৬০০ টাকা, বোয়াল আকার ভেদে ৮০০-১৫০০ টাকা, রুই ৩৫০-৬০০ টাকা, কাতলা ৩০০-৮০০ টাকা, মৃগেল ৩৫০-৮০০ টাকা, হাঙড়ি ২৫০-৪০০ টাকা, গ্রাসকার্প ৩৫০-৫০০ টাকা, সিলভার কার্প ৩০০-৫০০ টাকা, ব্ল্যাক কার্প ৬০০-১৫০০ টাকা, ব্রিগহেড ৩০০-৮০০ টাকা, কালবাউশ ৪০০-৬০০ টাকা, পাঙ্গাস ৩৫০-৭০০ টাকা।

মেলায় আসা দুর্গাহাটা গ্রামের জামাই শিপন মন্ডল বলেন, ‘২০ বছর আগে বিয়ে করেছি। তারপর থেকে প্রতিবছর এই মেলায় আসি। শ্বশুর-শাশুড়িরা মেলায় মাছ কিনতে টাকা দেয়। আমিও মেলায় আসি মাছ কিনতে। চেষ্টা করি বড় মাছ কেনার। এবার ১৪ কেজি ওজনের ব্রিগহেড মাছ কিনেছি ৮০০ টাকা কেজি দরে।’

মেলা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও মহিষাবান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমরা তিন পুরুষের এই মেলা পরিচালনা করে আসছে। প্রতিবছরের ন্যায় মেলাটি আবারও মিলনমেলা সৃষ্টি করেছে। প্রতি বছরের মত এবারও ২০ কোটি টাকার মাছ কেনা-বেচা হয়েছে। এটি সন্নাসী মেলা হলেও এখন তা জামাইদের মেলায় পরিণত হয়েছে। মেলাটি এখন সার্বজনীন মেলা হিসেবে সারাদেশে সমাদৃত।’

তিনি বলেন, ‘বিগত বছরের ন্যায় এবারও মেলা জমজমাট ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সবমিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার দোকান বসেছে। এরমধ্যে প্রায় ৪০০ দোকান শুধু মাছ রয়েছে।’

গাবতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিক ইকবাল বলেন, ‘মেলায় কোনো জুয়া বা অশ্লীল নাচ হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’