স্বাচিপ চিকিৎসকের যোগ দেওয়া নিয়ে উত্তাপ

আওয়ামী লীগপন্থি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) এক চিকিৎসকের চাকরিতে যোগদান কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানীর জাতীয় নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতাল। গতকাল বুধবার ওই চিকিৎসকের কাজে যোগদানের প্রতিবাদ করায় চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেন হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীরা। তারা বহির্বিভাগ ও টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দেন। এতে সকালে এক ঘণ্টারও বেশি সময় বন্ধ থাকে রোগীদের বহির্বিভাগে চিকিৎসা ও রুটিন অস্ত্রোপচার। এ নিয়ে দিনভর দুপক্ষের মধ্যে চলে উত্তেজনা।

চিকিৎসকরা তাদের ওপর কর্মচারীদের হামলার পেছনে পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, স্বাচিপের চিকিৎসককের কাজে যোগদানের প্রতিবাদ করার সময় পরিচালকের সঙ্গে চিকিৎসকদের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর তারা পরিচালকের কক্ষ থেকে বের হয়ে এলে পরিচালক কর্মচারীদের ডেকে বিষয়টি অবহিত করেন। এরপরই কর্মচারীরা চিকিৎসকদের ওপর হামলা করে ও হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেন।

এ ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ ও যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম ম-লের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে এসেছেন। মন্ত্রণালয় খুব দ্রুত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না নিলে চিকিৎসকরা কর্মবিরতিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব শাখার সাধারণ সম্পাদক ও নিউরো সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিচালক এসব কর্মচারীকে লেলিয়ে দিয়েছেন। আমাদের সঙ্গে মিটিংয়ের পর পরিচালক ওনাদের ডেকে এসব করতে বলেছেন। তারপর তারা এসব করেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। আমরা বলেছি, তাদের দুজনকে (পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালক) চাই না। মন্ত্রণালয় যদি কোনো উদ্যোগ না নেয়, তা হলে আমরা ধারাবাহিকভাবে কঠোর পদক্ষেপে যাব। কর্মবিরতি করব ও কর্মবিরতির সময় বাড়াব।’

ডা. জালাল উদ্দিন রুমি বলেন, ‘আমরা চাই মন্ত্রণালয় দ্রুত ব্যবস্থা নেবে। স্বৈরশাসনের দোসরদের সরিয়ে দেবে। আমরা চাই না রোগীরা বিপদে পড়ুক- এমন কিছু করতে বাধ্য করা হোক আমাদের।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালক- তারা দুজনই স্বৈরাচারের দোসর। তারা দুজনই চাকরি শেষ হওয়ার পরও ১০ বছর ধরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে আছেন। ওনারা দুজন আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে পরিচালক আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির সদস্য। সরকারি চাকরি করা অবস্থায় উনি ২০২২ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের মাধ্যমে জাতীয় কমিটির সদস্য হন। তিনি সর্বশেষ যেটা করেছেন, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের চিকিৎসকদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছেন। এ রকম ন্যক্কারজনক কাজ বাংলাদেশের ইতিহাসে আছে কি না সন্দেহ।’

কী ঘটেছিল : চিকিৎসক ও কর্মচারীরা জানান, দুই মাস আগে নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতাল থেকে স্বাচিপ নেতা সহযোগী অধ্যাপক ডা. গুরুদাস ম-লকে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়। সম্প্রতি তাকে আবার বদলি করে ফিরিয়ে আনা হলে চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। এর প্রতিবাদ ও এ আদেশ বাতিলের দাবিতে গতকাল সকালে হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে দেখা করেন চিকিৎসকরা। সেখানে তারা ওই চিকিৎসককে ফের বদলির দাবি জানান। এ সময় চিকিৎসকদের সঙ্গে পরিচালকের বাগবিত-া হয়। একপর্যায়ে চিকিৎসকরা পরিচালকের পদত্যাগ দাবি করেন ও তার অধীনে কাজ করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে আসেন।

তারা আরও জানান, পরে সেখান থেকে এসে চিকিৎসকরা ৪০২ নম্বর কক্ষে আলোচনায় বসেন। এমন সময় চতুর্থ শ্রেণির কিছু কর্মচারী ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কিছু কর্মী হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে নেমে আসেন এবং মিছিল করতে থাকেন। তারা আউট ডোর টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দেন। পরে দলবেঁধে ৪০২ নম্বর কক্ষের সামনে এসে মিছিল করতে থাকেন ও চিকিৎসকদের গালাগাল করতে থাকেন। একসময় তারা ডা. জালাল উদ্দিন রুমিকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ও তার কক্ষে তালা দেওয়ার হুমকি দেন। তখন একজন চিকিৎসক তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা ওই চিকিৎসককে ধাক্কা দেন। একপর্যায়ে অন্য চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেন। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন।

এ বিষয়ে কথা বলতে অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম ম-ল গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘একজন চিকিৎসকের বদলি কেন্দ্র করে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। দুপক্ষের মধ্যে একটু বাদানুবাদ হয়েছে। বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে।’