ঢাকার বিভিন্ন জায়গার বিচিত্র সব নাম। আর এই নামের পেছনে আছে দারুণ সব ইতিহাস, গল্প আর কখনো মিথ। এ বিষয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
ঢাকা শুধু একটি শহর নয়, এটি এক বিশাল ইতিহাসের পাতা, যেখানে প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি এলাকা একটি করে গল্প বয়ে নিয়ে চলেছে। এই শহরের অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়বে বিচিত্র সব নাম কোথাও রাজকীয় গন্ধ, কোথাও ইতিহাসের ছাপ, আবার কোথাও বা মিশে আছে রহস্য আর লোককথা। কিছু নাম শুনলেই মনে হবে, আহা, কী সুমধুর। আবার কিছু নাম শুনে মাথা চুলকাতে ইচ্ছে করবে এমন নাম আসলেই এলো কোত্থেকে? এই লেখায় আমরা ঢাকার কিছু জায়গার নামের পেছনের চমৎকার সব গল্পের খোঁজ নেব।
ঢাকায় পুরের ছড়াছড়ির শেষ নেই কল্যাণপুর, শাহজাহানপুর, সূত্রাপুর, মোহাম্মদপুর, নবাবপুর, কমলাপুর, আরও কত যে পুর তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু যেই পুরটা এখন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, সেটি হলো মিরপুর। এক সময় এই এলাকায় বসবাস করতেন এক ব্যক্তি, যার নাম ছিল মীর সাহেব। তার নামানুসারেই গোটা এলাকা পরিচিত হয় মিরপুর নামে।
এখন আসল মজার গল্পটা হচ্ছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়। ওই সময় বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা শত্রুমুক্ত হলেও, মিরপুর ছিল ব্যতিক্রম। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, যখন বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা স্বাধীন হয়ে যায়, মিরপুর ছিল সেই এলাকা, যা শেষ পর্যন্ত ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি শত্রুমুক্ত হয়েছিল। আর সেই কারণেই মিরপুরকে আজও মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন বলা হয়।
চকবাজার এই নামটি শুনলেই রমজান মাসের ইফতারির বিশাল বাজারের কথা মনে পড়ে। তবে চকবাজারের ইতিহাস শুধু খাবারেই সীমাবদ্ধ নয়। মুঘল আমলে, চকবাজারের নাম ছিল চৌক বন্দর। তখন এই এলাকা ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ১৭০২ সালে, নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ এই বাজারকে এক নতুন রূপ দেন এবং এটিকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আধুনিক বাজারে পরিণত করেন। এরপর, ওয়াল্টার সাহেব আবার চকবাজারের সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করেন, যার ফলে এটি আরও আধুনিক ও সুন্দর হয়ে ওঠে।
চকবাজারের পর আছে আরেক বাজার, সেটা হলো কারওয়ান বাজার। এর নামের মধেই লুকিয়ে আছে এক পুরনো গল্প। কম-বেশি অনেক মানুষই জানেন যে শেরশাহ সুরি ঢাকাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় সেই বিখ্যাত গ্রান্ড ট্রাংক রোড বা সড়ক-ই-আজম তৈরি করেছিলেন। ঢাকার টঙ্গী পর্যন্ত এই রাস্তা নির্মাণ করেন মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খাঁ। আর এই রাস্তার পাশে থাকা সরাইখানাগুলোর সংস্কার করেন মীর জুমলা। সরাইখানাগুলোই ছিল তখনকার কারাবান অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা যে জায়গায় বিশ্রাম নিতেন।
আজ যেখানে কারওয়ান বাজার দাঁড়িয়ে, এক সময় সেখানে ছিল সেই কারাবান।
খিলগাঁওয়ের ইতিহাস বেশ মজার। পুরনো এক কিংবদন্তি বলে, এক সময় এখানে বয়ে চলত পা-ু নদী নামের একটি নদী, যা ঘুরে ঘুরে চলে যেত খিলগাঁও, বাসাবো, মাদারটেক হয়ে। নদীর ধারে গড়ে উঠেছিল এক গ্রাম, যার নাম ছিল কূলগ্রাম। পুরনো দলিল-দস্তাবেজেও এই নাম পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, সময়ের সঙ্গে সেই কূলগ্রামই ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে আজকের খিলগাঁওতে পরিণত হয়েছে। এক ধরনের রূপান্তরের গল্প, যা এই অঞ্চলের ঐতিহ্যকে আরও রঙিন করে তুলেছে।
নামের বাগান
ঢাকা শহরের এক রাজকীয় অংশ এবং নামটাও একেবারে রাজকীয়। শাহবাগ মানে ‘রাজকীয় বাগান’, আর মুঘল সম্রাটরা যখন ঢাকাকে প্রাদেশিক রাজধানী ঘোষণা করলেন, তখন তারা এখানেই একটা দৃষ্টিনন্দন বাগানও তৈরি করেছিলেন। আজ সেই বাগানের কোনো চিহ্ন নেই, তবে স্থানীয় মানুষদের স্মৃতিতে এখনো গেঁথে আছে সেই বাগান এবং সেই স্মৃতির কারণেই এই এলাকা এখনো শাহবাগ নামেই পরিচিত।
আরেকটি জায়গার নাম পরীবাগ, যা শাহবাগের খুব কাছেই। অনেকের মতে, এই এলাকাটি গড়ে উঠেছিল নবাব সলিমুল্লাহর সৎ বোন পরীবানুর জন্য, যিনি এখানে বসবাস করতেন। সলিমুল্লাহ তার সৎ বোনের জন্য একটি বাগানবাড়ি তৈরি করেছিলেন, আর সেই বাড়ির নাম অনুসারেই এলাকাটির নাম হয়ে যায় পরীবাগ।
এক সময় ঢাকা ছিল সত্যিকারের বাগানের শহর। চারদিকে ছিল সবুজের ছড়াছড়ি, আর সেই বাগানগুলোর পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকতেন মালিরা। ধনী বাড়ির উঠোন তো ছিলই, অনেকে শখ করে বিশাল বিশাল ফুলের বাগানও করতেন। তখনকার দিনে বাগানের দেখভালের জন্য মালিদের বেশ কদর ছিল। আর এই মালিদের বসবাসের জায়গাটাই সময়ের পরিক্রমায় হয়ে গেল মালিবাগ। বাগান তো এখন তেমন নেই, কিন্তু ‘বাগ’ শব্দটা টিকে আছে, ইতিহাসের এক মজার সাক্ষী হয়ে।
এবার আসি স্বামীবাগ-এ। এই এলাকার নামের ইতিহাস বেশ মজার। এক সময়ে এখানে বাস করতেন একজন নামকরা, ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি তিনি ছিলেন ত্রিপুরালিংগ স্বামী। সবাই তাকে আদর করে স্বামীজি বলেই ডাকতেন। সেই নামই তো এলাকার নাম হয়ে গেল স্বামীবাগ।
জায়গার নামের শেষে ‘বাগ’ শব্দটা দেখলেই মনে হয়, আহ! নিশ্চয়ই এখানে কোনো সুন্দর বাগান ছিল। কিন্তু গোপীবাগ এটা একটু আলাদা। এখানে কোনো বাগান তো নেই, বরং আছে ইতিহাসের এক দারুণ গল্প। এই এলাকার নামকরণের পেছনে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী গোপীনাথ সাহা’র হাত রয়েছে। তিনি এখানে নির্মাণ করেছিলেন গোপীনাথ জিউর মন্দির, আর মন্দিরের নাম অনুসারেই এলাকার নাম হয়ে গেল গোপীবাগ।
হাতিকান্ড
ঢাকায় মাহুত থাকত, তার আবার আলাদা এলাকা লাগবে কেন? আসলে মুঘল শাসনামলে রাজকীয় হাতির বিশাল দল নিয়ে এসেছিলেন শাসকরা। সেই হাতিগুলোকে দেখাশোনার জন্য দরকার ছিল দক্ষ মাহুতদের। একপর্যায়ে এত বেশি মাহুত এসে জড়ো হলেন যে, তাদের জন্য আলাদা একটি আবাস গড়ে তোলা হলো। সেই মাহুতদের বসতি গড়ে ওঠার কারণেই জায়গাটির নাম হলো মাহুতটুলি। এখন আর এখানে হাতি দেখা যায় না, কিন্তু নামটাই মনে করিয়ে দেয় এককালের রাজকীয় হাতির মিছিলের কথা। মুঘলদের শৌখিনতার তালিকায় বেশ উঁচুতে ছিল হাতির লড়াই। ঢাকায় তখন হাতির বিশাল সংগ্রহ ছিল। সেই হাতিগুলোকে কোথায় রাখা হবে? বানানো হলো এক বিশাল খাঁচার মতো এলাকা, যেখানে হাতিগুলো আরামে থাকত। ফারসি ভাষায় ‘পিল’ মানে হাতি, আর ‘খানা’ মানে আবাসস্থল। এভাবেই জায়গাটির নাম দাঁড়িয়ে গেল পিলখানা। এখন এখানে হাতি নেই, আছে বিডিআরের সদর দপ্তর, কিন্তু নামটি ঠিকই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। ঢাকার মধ্য দিয়ে একদল হাতি প্রতিদিন শোভাযাত্রা করছে এমন দৃশ্য এখন কল্পনাতেও আসে না। কিন্তু একসময় এটি ছিল একেবারে সাধারণ ব্যাপার। পিলখানার হাতিগুলোকে প্রতিদিন গোসল করাতে নেওয়া হতো হাতিরঝিলে। তারপর রমনা পার্কে নিয়ে যাওয়া হতো রোদ পোহাতে। বিকেল হতেই সারি বেঁধে তারা আবার ফিরে যেত নিজেদের থাকার জায়গায়। এই হাতি চলাচলের রাস্তাটি ধীরে ধীরে পরিচিতি পেয়ে যায় এলিফ্যান্ট রোড নামে। আজ এখানে শুধু গাড়ির স্রোত বয়ে যায়, কিন্তু নামটা মনে করিয়ে দেয়, এক সময় এখানে সত্যিকারের হাতির রাজত্ব ছিল।
নারিন্দা
কথা বলছিলাম বাগান আর দ্বীপ নিয়ে, কিন্তু একবার নারিন্দার কথাও শুনুন। পুরনো নাম ছিল নারায়ণদিয়া বা নারায়ণদি, যার মানে নারায়ণের দ্বীপ। অবাক হচ্ছেন? তবে পুরো ব্যাপারটা এমন এই এলাকাটি একসময় ছিল নিম্নাঞ্চল, আর বর্ষায় চারপাশ থেকে পানি উঠে এসে এটা একটা ছোট দ্বীপের মতো দেখাত। আর সেই থেকেই নাম হয়ে যায় নারিন্দা। সোজা করে বললে, ‘নারায়ণদিয়া’ থেকে ‘নারিন্দা’ আর দ্বীপ হয়ে গেল শহরের অংশ।
ইন্দিরা রোড
১৯৩০ সালের দিকে এই এলাকায় বসবাস করতেন দ্বিজদাস বাবু, এক ধনী ও সম্মানিত ব্যক্তি। তার ছিল এক বিশাল বাড়ি, আর সেই বাড়ির পাশ দিয়েই গিয়েছিল একটি পথ। কিন্তু একদিন তার সংসারে নেমে আসে গভীর শোক তার বড়
মেয়ে ইন্দিরা অকালে মৃত্যুবরণ করেন। বাবার হৃদয়ে মেয়ের স্মৃতি চিরঅমলিন রাখতে, দ্বিজবাবু তার নামেই এই পথের নামকরণ করেন ইন্দিরা রোড। সময় বদলেছে কিন্তু বাবার সেই ভালোবাসা আজও ইন্দিরা রোডের নামের মধ্যে অমর হয়ে আছে।
গেণ্ডারিয়া
ঢাকা শহরের একসময়ের আলোচিত একটি এলাকা গ্র্যান্ড এরিয়া। জমিদার ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের থাকার কারণে ইংরেজরা এলাকাটির এমন রাজকীয় নাম দিয়েছিল। কিন্তু বাঙালিরা তো আর মুখ বাঁকিয়ে ‘গ্র্যান্ড এরিয়া’ উচ্চারণ করবে না। তাই তারা নিজেদের মতো করেই নামটাকে সহজ করে ফেলল গেণ্ডারিয়া। তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে। অনেক ইতিহাসবিদের দাবি, এলাকাটিতে একসময় প্রচুর গেণ্ডারি বা আখ জন্মাত। সেই গেণ্ডারি থেকেই নাকি এসেছে গেণ্ডারিয়া নামটি। আসল রহস্যটা যা-ই হোক, নামটা বেশ মজার।
ভূতের গলি
ঢাকা শহরে এমন অনেক জায়গার নাম শুনলে মাথা চুলকাতে হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় নাম ভূতের গলি। ভূতেরা কি সত্যিই এখানে দল বেঁধে থাকত? নাহ, ব্যাপারটা অতটা ভুতুড়ে নয়। একসময় এখানে বসবাস করতেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম মিস্টার বুথ। এলাকায় তিনিই ছিলেন প্রথম কোনো ইংরেজ। তখন সবাই তার নামেই জায়গাটির নাম রেখে দিল বুথের গলি। কিন্তু বাঙালি উচ্চারণের জাদুতে বুথের গলি ভূতের গলি হয়ে গেল। ইংরেজ সাহেবের অস্তিত্ব মুছে গেল, কিন্তু ভূতের নাম রয়ে গেল চিরকাল।
মহাখালী
নাম শুনেই বোঝা যায়, ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়। শোনা যায়, এই এলাকাতে এক সময় ছিল মহাকালী দেবীর একটি মন্দির। সেই মন্দিরের নাম থেকেই এলাকাটির নাম হয় মহাখালী। এখন মন্দিরের অস্তিত্ব নেই, কিন্তু মহাখালী রয়ে গেছে। তবে জায়গাটি এখন মন্দিরের জন্য নয়, যানজট আর অফিসপাড়ার জন্যই বেশি বিখ্যাত।