আইসিটি খাত

দুই মাসের মধ্যে প্রকাশ হবে দুর্নীতির শ্বেতপত্র

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সময় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দু-এক দিনের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে, যারা আগামী দুই মাসের মধ্যে এই শ্বেতপত্র প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রেস সচিব। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।

শফিকুল আলম বলেন, ‘আইসিটি ও ডিজিটালাইজেশনকে ঘিরে অনেকগুলো অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস চাচ্ছিলেন এ খাত নিয়ে একটি শ্বেতপত্র যাতে তৈরি করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের এটি একটা সিদ্ধান্ত।’

শ্বেতপত্র তৈরির জন্য কমিটিতে দেশি-বিদেশি অর্থনীতিবিদ যারা আইসিটি নিয়ে কাজ করেন, সেসব বিশেষজ্ঞ থাকবে বলে জানান তিনি।

২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে ১২ ডিসেম্বর ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরে নির্বাচনী ইশতিহার ঘোষণা করেছিল আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ৬ জানুয়ারি সরকার গঠন করা হয়।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইশতেহার দেয় টানা ক্ষমতায় থাকা দলটি। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের।

হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীত, অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠার মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতির হালচাল জানতে একটি শ্বেতপত্র কমিটি করে। কমিটি গত ডিসেম্বরে সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

এবার আইসিটি খাতের অবস্থা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেন, কমিটির মূল কাজ হবে ডিজিটাল বাংলাদেশের নামে যে ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, সেসব কীভাবে করেছে, কত টাকা পাচার হয়েছে, দেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই পুরো জিনিসগুলো তারা দেখবে।

শফিকুল আলম বলেন, গত রেজিমের সময় যে পরিমাণ চুরি হয়েছে, করাপশন হয়েছে, তার একটা হোয়াইট পেপার কমিটি করে দিয়েছিলেন ড. দেবপ্রিয়র নেতৃত্বে। তারা পুরো ইকোনমিক খাতগুলোই দেখেছে। এই শে^তপত্র হবে পুরোপুরি আইসিটি খাতে, ডিজিটালাইজেশন খাতে। কীভাবে অনিয়ম হয়েছে, কীভাবে দুর্নীতি হয়েছে। তিনি বলেছেন, শ্বেতপত্রে ওই সরকারের সময় সম্পাদিত সব ধরনের চুক্তি এবং প্রকল্পের প্রস্তাব (ডিপিপি), সব নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও তদন্ত প্রতিবেদন খতিয়ে দেখবে।

আমিরাতের ভিসা নিষেধাজ্ঞা খুব দ্রুত উঠে যাবে, আশা প্রেস সচিবের : ব্রিফিংয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘শফিকুল আলম বলেন, দুবাইয়ে গভর্নমেন্ট সামিট প্রতিবছর হয়। এ উপলক্ষে সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার দেড় দিনব্যাপী সফর ছিল। ওই সফরে তিনি ছিলেন মেজর (প্রধান) পার্টিসিপেন্ট (অংশগ্রহণকারী)। আমিরাতের সঙ্গে আমাদের ভিসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা চলছে। আমিরাতে আমাদের ভিসা রেস্ট্রিকশন (নিষেধাজ্ঞা) আছে। এটা বহু বছরের একটা পুরনো সমস্যা। ২০১২ সাল থেকে একটি পুঞ্জীভূত সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমাদের যারা জাহাজের ক্রু, তারা ভিসা পাচ্ছেন না। সবার জন্য ভিসা একটা বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি বলেন, গভর্নমেন্ট সামিটে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে যখন আমিরাতের মন্ত্রীদের বৈঠক হয়, তখন তিনি বারবার বিষয়টি উঠিয়েছেন। এ বিষয় নিয়ে সিরিয়াস আলাপ হয়েছে। এই আলাপগুলো সামনে আরও অব্যাহত থাকবে।

প্রেস সচিব আরও বলেন, ‘এ আলাপের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সঙ্গে আমরা নতুন করে অনেক বিষয় নিয়ে আলাপ করছি। ওদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে কম্প্রিহেনসিভ ডায়ালগ হয়েছে। এর ফলে কয়েকটি বিষয় হবেÑ আমিরাত থেকে বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসবে। এ ছাড়া আমাদের ওপর যে ভিসা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেটা দ্রুত উঠে যাবে। ভিসা নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে অনেক বাংলাদেশি বিশেষ করে প্রশিক্ষিত শ্রমিকরা সেখানে চাকরি পাবেন।’

শফিকুল আরও বলেন, ‘এ বিষয়টি দেখার জন্য অধ্যাপক ইউনূস তার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকীকে নিযুক্ত করেছেন। তিনি সেখানকার চার-পাঁচজন মন্ত্রীর সঙ্গে বিস্তারিত কথাবার্তা বলেছেন। কথাবার্তা বলার পর আমিরাত এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে সিরিয়াস।’

‘আমিরাতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছে গিয়েছিল। সেখান থেকে সম্পর্ক (বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা উন্নতির দিকে যাবে। বিশেষ করে আমাদের জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে,’ যোগ করেন তিনি।

আওয়ামী লীগ আমলে নানা কারণেই সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, বাহরাইনসহ অনেক দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক ভালো ছিল না উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিতে চায়।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনের পর হাসিনার ওপর চাপ বেড়েছে : ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে সে দেশে চাপ বাড়ছে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

প্রেস সচিব বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য তাকে (শেখ হাসিনা) দেশে এনে বিচার করা। কিছুদিন আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে কী ধরনের অপরাধ তিনি করেছেন। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে তারা।’

‘এটা খুবই বড় ও ভয়ংকর ধরনের অপরাধ। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এই রিপোর্ট ও অন্যান্য কিছু মানবাধিকারবিষয়ক রিপোর্টের পর প্রচুর চাপ তৈরি হয়েছে। এর একটা ইঙ্গিত আছে ইন্ডিয়া টুডের একটা জরিপে। সেখানে দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ চান তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হোক। আবার একটা অংশ চান তাকে অন্য কোনো দেশে পাঠানো হোক। মাত্র ১৬-১৭ শতাংশ ভারতীয় চায় শেখ হাসিনাকে তাদের দেশে রাখতে,’ বলেন তিনি।

শফিকুল আলম বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) গত ১৫-১৬ বছরে যে নৃশংস স্বৈরাচারী ব্যবস্থা চালিয়েছেন, এটা স্পষ্টভাবে এসেছে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে। আমার মনে হয় এখন চাপ আরও হবে। আমরা তাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে একটা চিঠি দিয়েছি। চাপটা অব্যাহত থাকবে।’

‘আমরা চাইব তাকে এনে সশরীরে হাজির করে বিচার করতে। বাংলাদেশের মানুষ তার বিচার দেখতে চায়। এটা আমাদের অগ্রাধিকার এবং আমরা এটার জন্য যত কাজ করা দরকার সব করছি,’ বলেন তিনি।

স্বাধীন সাংবাদিকতা নিয়ে কমিটি টু প্রটেস্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) প্রতিবেদনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রেস সচিব বলেন, গত ৫৩ বছরে বাংলাদেশে এখন সর্বোচ্চ স্বাধীনভাবে কাজ করছেন সাংবাদিকরা।

সিপিজে-কে বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণ করার আহ্বান জানান প্রেস সচিব।

আওয়ামী লীগের খুনি-দুর্নীতিবাজদের বিচারের পর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে জনগণ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল সিদ্ধান্ত নেবে বলে মন্তব্য করে শফিকুল আলম।