জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরও দুই মাস সময় পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগ। আগামী ২০ এপ্রিলের মধ্যে এ প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ধার্য করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টাসহ ১৬ জনের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে একই তারিখ ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
গতকাল মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা, ১০ মন্ত্রী, দুই প্রতিমন্ত্রীসহ ১৬ জনকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। তারা হলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বেসরকারি বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক, আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান, একই দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাবেক সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, জুনাইদ আহমেদ পলক, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব জাহাঙ্গীর আলম। সকাল ১০টার দিকে তাদের ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এনে হাজতখানায় রাখা হয়। এরপর ১১টা ২০ মিনিটের দিকে তাদের কাঠগড়ায় তোলা হয়। কাঠগড়ায় সবাই ছিলেন নির্লিপ্ত। এর মধ্যে কয়েকজন কাঠগড়ায় বাইরে থাকা আইনজীবীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
এর আগে গত বছরের ১৭ অক্টোবর এই ১৬ জনসহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীসহ ৪৫ জনকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। একই দিন পৃথক আরেকটি মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ হয়। এরপর গুমের মামলায় তার বিরুদ্ধে আরেকটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পৃথক আদেশ হয় ট্রাইব্যুনাল থেকে।
শেখ হাসিনার মামলার শুনানিতে প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, তদন্তকাজ ইতিমধ্যে হয়ে গেছে বলা যায়। সারা দেশে বিস্তৃত আকারে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে। তাছাড়া জুলাই আন্দোলনে গণহত্যার বিষয়ে জাতিসংঘ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদন সংযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। যদিও দুই মাস সময় চাইছি। তবে, আশা করি আগামী মাসের মধ্যে প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে পারব। তিনি বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তকাজ খুব কঠিন। তবে, আমাদের তদন্ত সংস্থা দিনরাত কাজ করছে।’ এ সময় ট্রাইব্যুনালের বিচারক শফিউল আলম মাহমুদ চিফ প্রসিকিউটরের উদ্দেশে বলেন, ‘সময় লাগলে সময় নেবেন। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন যেন গ্রহণযোগ্য হয়। কোনো অসম্পূর্ণ তদন্ত যেন না হয়।’
আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের মামলার শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, তাদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির অভিযোগ রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের বিষয়ে আলাদা আলাদা তদন্ত হচ্ছে। প্রতিবেদনের জন্য আরও কিছু দিন সময় প্রয়োজন। পৃথক আরেকটি মামলায় ঢাকা-৭ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য সোলাইমান সেলিমের বিষয়ে তদন্ত চলছে। জুলাই-আগস্টে পুরান ঢাকায় তার নেতৃত্বে ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে। শুনানি নিয়ে আদালত ২০ এপ্রিলের মধ্যে তিন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তারিখ ধার্য করেন।
আসামিপক্ষে জেড আই খান পান্না
গতকাল সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্নার মৃত্যু গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে, গুজবের মধ্যেই তিনি সকাল ১১টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসেন। এ সময় তাকে নিয়ে কৌতূহল শুরু হয়। প্রসিকিউশনের শুনানির পর তিনি ডায়াসের সামনে যান। বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সকালে উঠে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম আমি মারা গেছি। তবে, আপনাদের কাছে দোয়া চাই, মউতটা যেন স্বাভাবিক হয়। একটি দিনও বেশি বাঁচতে চাই না।’ তিনি বলেন, ‘আমি এ মামলায় লিগ্যাল ডিসকাশন করতে চাই।’ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এ সময় তাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কার পক্ষে শুনানি করবেন?’ অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না এ সময় আমির হোসেন আমু, শাজাহান খানসহ কয়েকজনের নাম বলেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমি এদের সবার পক্ষে শুনানি করতে চাই।’ তিনি ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে বলেন, ‘এখানে (কাঠগড়ায় থাকা আসামি) অন্তত দুজন আছেন যাদের হাত ধরে আমি রাজনীতি শিখেছি। আমি তাদের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’ আদালত তার আরজি মঞ্জুর করেন।
‘মাই লর্ড’ ঔপনিবেশিকতার ছোঁয়া আছে : ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান
বিচারকদের ‘মাই লর্ড’ বলা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার। তিনি বলেছেন, ‘মাই লর্ড’ কথাটিতে ঔপনিবেশিকতার ছোঁয়া রয়েছে। গতকাল ট্রাইব্যুনালে অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না আসামিপক্ষে শুনানির আরজি জানানোর সময় বিচারকদের উদ্দেশে ‘ইয়োর লর্ডশিপ’ সম্বোধন করেন। আইনজীবী বলেন, ‘আমাদের বাধ্য করা হয় লর্ডশিপ বলতে। কিন্তু লর্ডশিপ তো একজন। মানুষ কখনও মানুষের প্রভু হতে পারে না।’ এ সময় বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার বলেন, ‘আমি তো প্রথম দিন বলেছি, ‘মাই লর্ড’ বলার দরকার নেই। লর্ড তো একজনই। আপনারা ‘ইয়োর ওনার’ ‘ইয়োর হাইনেস’ বলতে পারেন। আমরা সবকিছু চেঞ্জ করেছি, মাই লর্ড কেন চেঞ্জ হবে না। বাংলা ভাষা তো এত দুর্বল নয়, বাংলা ভাষাতেও অন্যকিছু বলা যেতে পারে। মাই লর্ডে ঔপনিবেশিকতার ছোঁয়া আছে।’ প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৬ অক্টোবর বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারসহ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই বিচারককে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়, সুপ্রিম কোর্ট বার ও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখা থেকে দেওয়া সংবর্ধনায় গোলাম মর্তূজা মজুমদার বিচারকদের ‘মাই লর্ড’ শব্দ বলা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শিখিয়ে গেছেন, লড়াই করতে হবে : পলক
শুনানি শেষে সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের হাজতখানায় নেওয়া হয়। হাজতখানায় প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় রাখার পর দুপুর সোয়া একটার পরে প্রিজনভ্যানে তোলার সময় সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘লড়াই করে বাঁচতে হবে। বঙ্গবন্ধু শিখিয়ে গেছেন। আমরা লড়াই করে যাচ্ছি। আইন ও ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করব। শাজাহান খান এ সময় হাত নাড়িয়ে সালাম জানান। কেমন আছেন প্রশ্নে দীপু মনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’