মামলার বেড়াজাল মুক্ত নির্ভার খালেদা জিয়া

আইনি বেড়াজালের শুরুটা ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর ফখরুদ্দীন সরকারের সময়। এরপর আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে একদিনের জন্যও এই বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারেননি বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। অবশেষে আইনি ঝামেলা থেকে অনেকটাই মুক্ত ও নির্ভার হলেন তিনি।

আলোচিত নাইকো দুর্নীতি মামলায় বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) খালাস পেয়েছেন খালেদা জিয়া। ১৭ বছর আগে এ মামলাটি হয়েছিল এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। 

গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ছয় মাসের বেশি সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত তিনটি মামলায় খালাস (দুটিতে ১৭ বছর সাজা ছিল) এবং তিনটি মামলায় অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। এ ছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহ, নাশকতাসহ আরও ২১টি মামলার মধ্যে তিনি খালাস, অব্যাহতি পেয়েছেন। কিছু মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের নির্দেশে বাতিল হয়েছে। গত কয়েক বছরে মামলা, কারাবাস, সাজা মওকুফ, উন্নত চিকিৎসার আবেদন এসব নানা ঘটনার পর বিএনপির চেয়ারপারসন গত ৭ জানুয়ারি লন্ডন যান। তিনি এখন সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। মামলার বেড়াজাল মুক্ত হওয়ার এই খবরটি নিঃসন্দেহে তাকে এবং দলকে স্বস্তি দিয়েছে বলে জানান বিএনপির শীর্ষ আইনজীবীরা। তারা বলেন, আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে খালেদা জিয়ার মামলা, কারাবাস, হাজিরা, জামিন নিয়ে আইনজীবীদের দৌড়ঝাঁপ ছিল নিত্য চিত্র। গতকালের এই রায়ে তারা সন্তুষ্ট এবং উৎফুল্ল। 

৩৭ মামলার বেশিরভাগই নিষ্পত্তি 

খালেদা জিয়ার মামলা সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে  আওয়ামী লীগের শাসনামলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ, দুর্নীতি,  নাশকতা, ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাত, মানহানি, হত্যা চেষ্টার অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আদালতে বিচারের জন্য আসা অন্তত ৩৭টি মামলার তথ্য মিলেছে বিভিন্ন সময়ে। এর মধ্যে হত্যার তিনটি, রাষ্ট্রদ্রোহের একটি, দুর্নীতির পাঁচটি, নাশকতার ১৬টি, মানহানির ছয়টি মামলা রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রদ্রোহ, নাশকতাসহ ২৭টি মামলা উচ্চ আদালত কিংবা অধস্তন আদালতে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। আরও ৯টি মামলার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পারলেও বিএনপির আইনজীবীরা জানান, এ মামলাগুলো উচ্চ আদালতের নির্দেশে বাতিল হয়ে গেছে। 

বিএনপির চেয়ারপারসনের অন্যতম আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে গত ১৭ বছরে থানা ও আদালতে ৫০টির মতো মামলা হয়েছে। নাইকো মামলায় খালাসের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া মামলামুক্ত হলেন। ‘তার নামে আর কোনো মামলা নেই। মাসুদ তালুকদার বলেন, ‘যে ৯টি মামলার কথা বলা হয়েছে এগুলো নাশকতার। ইতিমধ্যে হাইকোর্টের আদেশে এগুলো বাতিল হয়ে গেছে। তার নামে আর কোনো ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা নেই।’ 

৬ মাসে ২৭ মামলায় খালাস ও অব্যাহতি  

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ  আদালত- ৫ খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। ওই দিন থেকে তাকে রাখা হয় নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এ মামলাটি হয়েছিল ২০০৮ সালের ৩ জুলাই। আপিল শুনানির পর সাজা বাড়িয়ে খালেদাকে ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর ১০ বছর কারাদণ্ড দেয় হাইকোর্ট। গত ১৫ জানুয়ারি এ মামলার আপিল শুনানির পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাকে খালাস দেয়।   

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় করা মামলায় ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর খালেদা জিয়াকে সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ ও অর্থদণ্ড দেয় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত- ৫। এ সাজার বিরুদ্ধে আপিলের পর গত বছরের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টে তাকে খালাস দেয়। পরে খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ।

অন্যদিকে দুদকের আইনজীবী আসিফ হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তারাও আপিল করেছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার রায়ের পর দুবছরের বেশি কারাবাস খাটেন খালেদা জিয়া। 

২০২০ সালে মার্চে করোনার প্রকোপের সময় সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত হলে তিনি কারাবাস থেকে মুক্তি পান। এরপর ছয় মাস পরপর তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে ১৭ বছর সাজা হওয়া এ দুই মামলাতে খালেদা জিয়ার সাজা মওকুফ হয়েছিল গত বছরের ৬ আগস্ট। ওই দিন রাষ্ট্রপতি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা প্রয়োগ করে সাজা মওকুফ করেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা পরে অন্তর্বর্তী সরকারকে সাজা মওকুফের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, যেহেতু আইনের মাধ্যমে বিএনপির চেয়ারপারসন সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন তাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি আপিল করে সাজামুক্ত হবেন। 

এ দুটি ছাড়াও আরেকটি আলোচিত বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াসহ দলের তিন শীর্ষ নেতাকে গত বছরের ২৭ নভেম্বর অব্যাহতি দিয়ে অভিযোগ গঠন করে ঢাকার একটি আদালত। এ মামলাটি দায়ের হয়েছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। এর আগে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় গত বছরের ২৪ অক্টোবর খালেদা জিয়াসহ দলের তিন নেতাকে অব্যাহতি দিয়ে অভিযোগ গঠন করে সংশ্লিষ্ট আদালত। এ মামলাটিও দায়ের হয় ২০০৭ সালে। 

গত ছয় মাসে বিভিন্ন কর্মদিবসে খালেদা জিয়ার মোট ২৭টি মামলা অধস্তন ও উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে হত্যার অভিযোগে দুটি, দুর্নীতির অভিযোগে করা পাঁচটি, রাষ্ট্রদ্রোহের একটি, নাশকতার ১১টি, মানহানির ছয়টি, হত্যা চেষ্টার একটি এবং রহিত হওয়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের একটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় খালেদা জিয়া খালাস ও অব্যাহতি পেয়েছেন। কোনো কোনো মামলার বিচার কার্যক্রম হাইকোর্টের নির্দেশে বাতিল হয়েছে। 

বিএনপির চেয়ারপারসনের অন্যতম আইনজীবী ও দলটির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কিন্তু আগে থেকেই বলে আসছিলাম যে, দেশে যদি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার থাকে তাহলে এসব মামলা টিকবেনা। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়ন করতে আদালতকে ব্যবহার করে বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে হয়রানি করেছেন।’ 

তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে সুষ্ঠু বিচারিক ব্যবস্থা চালু হয় এবং বিএনপির চেয়ারপারসন ন্যায় বিচার পেয়েছেন।’