মাতৃভাষা চর্চার তাগিদ

আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। আমরা এ ভাষায় কথা বলতে যতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি তা অন্য কোনো ভাষায় সম্ভব নয়। আমাদের মনের যত ভাব, যত ব্যথা-বেদনা, আনন্দ-উল্লাস, আবেগ-অনুভূতি আছে সবই আমরা মাতৃভাষা বাংলায় প্রকাশ করি। বিদেশি কোনো ভাষায় হয়তো তা আংশিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব। কিন্তু নিজ মাতৃভাষার মতো তৃপ্তিসহ অনুভূতি প্রকাশ অন্য ভাষায় সম্ভব নয়। ইসলাম মাতৃভাষা চর্চার গুরুত্ব দিয়েছে। দ্বীনের প্রচার-প্রসারে মাতৃভাষা চর্চার কোনো বিকল্প নেই। তাই আমাদের মাতৃভাষা চর্চায় জোর দিতে হবে। মহান আল্লাহর একমাত্র দ্বীন ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিতে যারা মাতৃভাষা চর্চা করবে, তাদের সেই কাজ ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।

ভাষাশহীদদের স্মৃতিবিজড়িত মাস ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষের চেতনার অনির্বাণ এক বাতিঘর। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার জন্য জীবন দেন আমাদের ভাষাসৈনিকরা। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষা নিয়ে এমন আন্দোলন আর কোথাও হয়নি। যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আর ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

ভাষাশহীদদের মূল্যায়ন : পৃথিবীর সব ভাষাই মহান আল্লাহর বিশেষ দান ও নেয়ামত। কোরআন মাজিদে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তাদের শিখিয়েছেন ভাষা।’ (সুরা আর-রাহমান ৩-৪) এই আয়াতে আল্লাহতায়ালা মানব সৃষ্টির কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি ভাষা শিক্ষার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ভাষা না থাকলে মানুষ অনভূতি প্রকাশে অক্ষম। ভাষা ও মানুষ একে অপরের সম্পূরক। উক্ত আয়াত এ কথারও ইঙ্গিত বহন করে যে, আল্লাহতায়ালা অন্য কোনো প্রাণীকে মানুষের মতো ভাষা দান করেননি। এ ক্ষেত্রে মানব অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা। তাই পৃথিবীর বুকে যত ভাষাই চালু আছে সবগুলোই আল্লাহর এক অসাধারণ নেয়ামত। যার কোনো বিকল্প নেই। এ কারণেই আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে যত নবী-রাসুল পাঠিয়েছে সবাইকেই স্বজাতি ও এলাকার ভাষা দিয়েই পাঠিয়েছেন। এভাবে সব আসমানি কিতাবও যে জাতির জন্য নাজিল করেছেন সে জাতির ভাষাতেই নাজিল করেছেন। কোরআন মাজিদে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আমি সব রাসুলকেই তাদের স্বজাতির ভাষাতেই পাঠিয়েছি, যেন তারা তাদের আল্লাহর হুকুম-আহকাম পরিষ্কারভাবে বুঝাতে পারেন।’ (সুরা ইবরাহিম ৪) এই আয়াতেও মাতৃভাষার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদানের বার্তা বহন করে। এক কথায় ইসলামের দৃষ্টিতে প্রত্যেক ভাষারই গুরুত্ব সীমাহীন এবং এর নিয়মতান্ত্রিক চর্চা আমলে সালেহ বা নেক আমল বলে গণ্য। সেই হিসেবে মাতৃভাষা বাংলার গুরুত্বও সীমাহীন এবং এর চর্চায় আত্মনিয়োগ করাও পুণ্যের আমল বলে বিবেচিত। তাই একে অবহেলা করা বা গুরুত্বহীন মনে করার কোনো সুযোগ আমাদের নেই।

বাংলা ভাষা চর্চা করা সবার কর্তব্য। কিছু দ্বীনদার মানুষের তো এর জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করা অপরিহার্য। মাতৃভাষায় কথা বলা মানুষের জন্মগত অধিকার। কারণ মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। কেউ যদি এ অধিকার ছিনিয়ে নিতে চায় তার প্রতিরোধ করা অপরিহার্য। আর এ প্রতিরোধে কেউ নিহত হলে ইসলামের দৃষ্টিতে সে শহীদের মর্যাদা পাবে। তবে শর্ত হলো, তাদের প্রকৃতভাবে এমন মুসলিম হতে হবে যে, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিহত হয়। আর আমরা বাংলাদেশের অধিবাসী, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। আমরা আজ মাতৃভাষায় কথা বলি। এতে বায়ান্নর ভাষাশহীদদের অবদানই সর্বাগ্রে। কাজেই এ ভাষাশহীদদের প্রতি আমাদেরও কিছু করণীয় রয়েছে। তারা আমাদের অধিকার আদায়ের জন্যই প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। সুতরাং মুসলিম হিসেবে তাদের জন্য আমাদের কর্তব্য হলো মহান আল্লাহর কাছে মাগফিরাত তথা ক্ষমা ভিক্ষা চাওয়া। যেসব কাজকর্ম তাদের উপকারে আসে তাদের জন্য সেসব কাজই বেশি বেশি করা।

মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি, এই তিনটি শব্দ সব মানুষের কাছে পরম আবেগের। মাতৃভাষা মানে মায়ের ভাষা। দুনিয়ার সব দেশের নিজ নিজ ভাষা রয়েছে। এ ভাষা তাদের মুখের ভাষা, মায়ের ভাষা, স্বপ্নের ভাষা এবং জীবনযাপনের ভাষা। মায়ের কাছ থেকে এ ভাষা শেখে বিধায় এর নাম হয়েছে মাতৃভাষা। মহান আল্লাহ মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। তারা নিজ জাতির ভাষায় ধর্ম প্রচার করতেন। আর বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত প্রচারের জন্য বিশ্বের প্রতিটি ভাষারই চর্চা করা ইসলামের দাঈদের কর্তব্য। অতএব প্রতিটি ভাষায় ইসলামি সাহিত্য গড়ে তুলে মানব কল্যাণে কাজ করতে হবে।