ভাষাসংগ্রামের ৭৩ বছর পরও সেই একই আশা

জাতীয় জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি এক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ১৯৫২ সালের এ দিনে এ বাংলার ছাত্র-যুবারা বুকের রক্তে রঞ্জিত করেছিল ঢাকার রাজপথ। ওই রক্তদান, প্রাণবিসর্জন এবং তখন পর্যন্ত ভাষার জন্য অনন্য জাগরণের ঘটনায় বিশ্ব-সচকিত হয়ে ওঠে। এজন্যই বলতে হয়, একুশের অর্জন, উত্তরপ্রভাব এবং প্রত্যাশাপ্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির কথা।

কেন বায়ান্নর ফেব্রুয়ারিতে রক্ত দিতে হয়েছিল রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত, শফিউর, অহিউল্লাহ, আউয়ালসহ অনেককে? কেনই বা জেল-জুলুম, পুলিশি নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল অগণিত মানুষকে? আর কী জন্যই বা আহতদের হাসপাতালের বিছানায় ছটফট? একটু গভীর পর্যালোচনায় যেতে হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ববঙ্গের মানুষকে চিরতরে পদানত করার দুরভিসন্ধি থেকেই সংখ্যালঘিষ্ঠের ভাষা উর্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা বোঝেনি বাংলার মাটি কতটা দুর্জয় ঘাঁটি! এখানে কোনো দুর্বৃত্তই কোনোকালে টেকেনি, তাও তারা বুঝতে পারেনি। বায়ান্নতেই তারা দেখল, বাঙালির শক্তি-সাহস আর আত্মত্যাগের দৃপ্ত অঙ্গীকার। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের অনেক আগে থেকেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও, সাত চল্লিশোত্তর পরিবর্তিত রাষ্ট্রিক বাস্তবতায় তা নতুন মাত্রা লাভ করে। মুসলিম লীগ সরকার ও পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকরা তাদের কথিত অভিন্ন তমদ্দুন ও এককেন্দ্রিক পাকিস্তান গড়ার জিকির তুলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টা চালান। কিন্তু এ অঞ্চলের ছাত্র-যুবারা তা বাস্তবায়ন করতে দেয়নি। এ ক্ষেত্রে ভাষিক আবেগ তো কাজ করেছিলই, পাশাপাশি আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটিও সামনে এসেছিল। কারণ দীর্ঘ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের রেশ কাটতে না কাটতেই পাকিস্তানিরা শুরু করে নিষ্ঠুর শোষণ ও  সীমাহীন দুঃশাসন। বাংলার মানুষ সর্বত্রই বৈষম্যের শিকার হয়। সেই বৈষম্য ও বঞ্চনা তাদের মধ্যে নিদারুণ ক্ষোভের সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার যথার্থ স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে কেন্দ্র করে ঘটে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ।

ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষার মর্যাদাই শুধু প্রতিষ্ঠা করেনি, জন্ম দিয়েছে ভিন্ন এক জাতীয়তাবোধ আর স্বকীয় অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার প্রত্যয়, যা পূর্ববঙ্গের মানুষদের জাগ্রত এবং ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ করে। এই ঐক্যের সূত্র ধরেই স্বাধিকার থেকে ক্রমে স্বাধীনতার পথে অভিযাত্রা শুরু হয়।

ভাষা আন্দোলন জাতির মনে এমন এক দ্রোহের বীজ বপন করে, যা একপর্যায়ে সব শোষণ-বঞ্চনার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা মূলোৎপাটনের মহাসংগ্রামে পরিণত হয়। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগে ছিল মহৎ উদ্দেশ্য : ভাষা-সংস্কৃতির ওপর আসা আগ্রাসন বন্ধের ব্যাপার যেমন ছিল, তেমনি ছিল সব নাগরিকের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। কিন্তু তাদের সেই আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য সর্বাংশে সফল হয়নি। বায়ান্নর রক্তবীজ থেকে যে চেতনার বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত একটি দেশ দিলেও মানুষের সামগ্রিক মুক্তি আসেনি।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, আজও শোষণ-বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ে ওঠেনি। দেশের মানুষের ভাগ্যপরিবর্তন যতটা হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। এর মূলে কাজ করেছে এক শ্রেণির মানুষের সীমাহীন লোভ-লালসা আর ভোগস্পৃহা। যে উদ্দেশ্যে ভাষাশহীদরা জীবন দিয়েছিলেন, তার প্রধান দিক সর্বস্তরে বাংলা আজও প্রচলিত হয়নি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ ভাষাকে বিশ্বজনীন করা যায়নি। সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন কমেনি। কাক্সিক্ষত উন্নত জীবন তারা পায়নি।

ভাষা আন্দোলনের তিয়াত্তর বছর পরও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমরা গড়তে পারিনি। বরং বারবার সামরিক, বেসামরিক ও গণতান্ত্রিক লেবাসের স্বৈরশাসন চেপে বসেছে এ জাতির কাঁধে। কিন্তু তাতেও দমানো যায়নি তাদের। তারা বারবার রক্ত ও জীবন দিয়ে অত্যাচারী শাসকের রক্ত চক্ষুর জবাব দিয়েছে। মুক্তির সোনালি সূর্য ছিনিয়ে এনেছে। স্বৈরশাসনের কবর রচনা করেছে। কিন্তু আর কতকাল চলবে এভাবে? আর কত রক্ত ঢালতে হবে এ জাতিকে? কাছাকাছি সময়ে স্বাধীন বহু দেশের মানুষ উন্নত জীবন পেলেও আমাদের দুর্ভাগ্যের রাত বুঝি আজও ঘোচেনি।

ভিন্ন বাস্তবতায় চব্বিশের রক্তের সাগর পাড়ি দিয়ে এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি এসেছে। সবার প্রত্যাশা, দেশে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও বৈষম্য দূর হোক। অপরাধীর শাস্তি হোক, নিরপরাধ স্বস্তিতে থাকুক। নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ যেন আর না শুনতে হয়। ধর্মের নামে, সম্প্রদায়ের নামে এবং দৈশিক-বৈশি^ক আগ্রাসনের কবলে এ দেশের মানুষ যেন আর পিষ্ট না হয়। বাংলাদেশ একটি ন্যায়ানুগ সমাজভিত্তিক মানবকল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিণত হোক।

লেখক : ভাষা আন্দোলন গবেষক

অধ্যাপক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়