মাতৃভাষা দিবসে ফেইল্ড ক্যামেরা স্টোরিজের বিশেষ আয়োজন

একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে স্টোরিটেলিং প্ল্যাটফর্ম ফেইল্ড ক্যামেরা স্টোরিজ আয়োজন করেছে অভিনব এক অনুষ্ঠানের। ‘৫২-র তে ২৪-এ তফাত কই রে? কথা ক’- র‍্যাপার শিল্পী সেজানের জুলাই আন্দোলনের সময়ে গাওয়া এই গানটির প্রথম চরণকে শিরোনাম করে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির মহান ভাষা আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন এর বিখ্যাত নানা পোস্টার ও চিত্রকর্ম এবং ডকুমেন্টারি প্রদর্শনীর আয়োজন করে সংগঠনটি।

চট্টগ্রাম নগরীর জামালখান মোড়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি শুরু হয় বিকাল ৪টা থেকে, শেষ হয় রাত ৮টার পর। শুরুতেই জাতীয় সংগীত পরিবেশনার পর ভাষা শহীদ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। তারপর জামালখান মোড়ে ফুটপাত ঘিরে তৈরি করা ভাষা আন্দোলন ও জুলাই অভ্যুত্থানকে ঘিরে বিভিন্ন বিখ্যাত পোস্টার ও চিত্রকর্ম নিয়ে তৈরি গ্যালারি খুলে দেওয়া হয় দর্শনার্থীদের জন্য।

সেসব ছবিতে উঠে আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ভাষা সংগ্রামের চিত্র। পরের সেকশনে দেখা যায় জুলাই আন্দোলনের আলোচিত পোস্টার ও গ্রাফিতির নানা ছবি।

দেবাশিষ চক্রবর্তীর বিখ্যাত জুলাই অভ্যুত্থানের পোস্টারসমূহও স্থান পায় এখানে। এসব দেখতে এসে ফাইরুজ নুজহাত নামে এক শিক্ষার্থী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। জুলাই আর বায়ান্ন যে এক সুতোয় গাঁথা সে মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় আবহ সংগীতে বাজছিলো ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো...’, ‘মোদের গরব মোদের আশা’, ‘সালাম সালাম...’, ‘ভুলে যাই আমি ভুলে যাও তুমি...’-সহ নানা দেশাত্মবোধক গান।

সেইসঙ্গে স্টেইজে চলছিল আবৃত্তিশিল্পীদের নানা কবিতা আবৃত্তি। সন্ধ্যায় শুরু হয় বায়ান্ন ও চব্বিশের বিভিন্ন ডকুমেন্টারির প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ফেইল্ড ক্যামেরা স্টোরিজ এর সংগঠক সাজেদ বিন হেলাল, আবু নাসের আলিফ, অহনা বড়ুয়া, শাহ মেহেদি হাসান প্রমুখ। তারা বায়ান্নর স্বাধীকারবোধ ও জুলাইয়ের ত্যাগকে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এই আয়োজন এ সভাপতিত্ব করেন ফেইল্ড ক্যামেরা স্টোরিজের পরিচালক, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা কমিটির সদস্য সাইদ খান সাগর। তিনি বলেন, ‘২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের আগের আর পরের বাংলাদেশি সংস্কৃতিতে একটা বিশেষ পরিবর্তন লক্ষণীয়। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের কালচারে র‍্যাপ সং নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। গ্রাফিতি বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। পোস্টারেরও যে শক্তিশালী ভাষা থাকতে পারে সেটাও দেখা গেছে এই আন্দোলন ও আন্দোলন পরবর্তী সময়ে। ফেইল্ড ক্যামেরা স্টোরিজ এই নতুন কালচারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই যে কথ্য কিংবা লেখ্য ভাষার বাইরেও রূপক হিসেবে ভাষার শক্তিশালী হয়ে উঠা এই মুক্ত ভাষাচর্চাটাই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রাপ্তি। ভাষার বৈষম্যকে দূরে ঠেলে যে বাঙ্গালি রাজপথে নেমেছিলেন বায়ান্নতে, ২০২৪ এ এসে ঠিক সেই বৈষম্যহীনতার লক্ষ্যেই রাজপথ অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন এত মানুষ। ১৯৫২ কিংবা ২০২৪ দু'টোই একই সুতোয় গাঁথা। আমরা সেই মেলবন্ধনটাই দেখাতে চেয়েছি আজকের আবেদনে। এই আয়োজন থেকে দ্রুতই জুলাইয়ের গণহত্যাকারীদের বিচারের দাবী জানাই আমরা।’

স্ক্রিনিংয়ের শুরুতেই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। তারপর ১৯৫২ থেকে ২০২৪ এর মেলবন্ধন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড নিয়ে সাইদ খান সাগরের প্রামাণ্যচিত্র 'জুলাই শিখা' প্রদর্শিত হয়। তারপর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৈরি ‘জুলাই অনির্বাণ, জুলাই ম্যাসাকার আর্কাইভের তৈরি জুলাই টাইমলাইন’, ভাষা দিবস উপলক্ষে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গানের ভিডিও প্রভৃতি প্রদর্শিত হয় এখানে।

তারপর প্রথম আলোর জুলাই গণহত্যা নিয়ে ডকুমেন্টারি দেখানো হয়। এ সময়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে জামালখান মোড়। প্রদর্শনী দেখতে আসেন সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, জুলাইয়ে ছাত্রজনতার এই মহতী ত্যাগকে জাতীয় মানসে ধরে রাখতেন হলে জনগণের স্মৃতিতে বারবার জুলাইকে হাজির করতে হবে। ভাষা আন্দোলন এবং জুলাইয়ের মধ্যে এই মেলবন্ধন তৈরি প্রশংসার দাবিদার।

প্রদর্শনী দেখতে আসা স্কুল শিক্ষক আব্দুল হালিম বলেন, জুলাইয়ে মারা যাওয়া শিক্ষার্থীদের ভেতর হয়তো আমার ছাত্রও থাকতে পারতো। শিক্ষক হিসেবে আমি চাই এই ধরণের আয়োজন থেকে যেন জুলাইয়ের গণহত্যার বিচারের দাবি উঠে। এ সময় জামালখান মোড়ে দেখা মেলে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে পেশাজীবী, রিকশাচালকসহ নানা ধরনের দর্শনার্থীর। ফেইল্ড ক্যামেরা স্টোরিজ এই স্ক্রিনিংয়ের আয়োজন দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চায় বলে জানান আয়োজকেরা। এই অনুষ্ঠানের সহযোগিতায় ছিলো চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ।