পাঠকের মুখোমুখি লেখক-প্রকাশক

শৈল্পিক শিশুমনের অস্তিত্ব নিজের মাঝে টের পাই

মাসুম মাহমুদ গল্পকার। কচি-কাঁচার আসর-এ লেখালেখির শুরু। নিয়মিত শিশুতোষ গল্প লিখছেন ২০১৯ থেকে। অণুগল্পের লিটলম্যাগ ‘বায়োস্কোপ’ সম্পাদনা করতেন। শিশুতোষ পত্রিকা ইকরিমিকরির সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫টি। এর মধ্যে শিশুতোষ গ্রন্থ বন্ধু, ইফার বন্ধু, মাকে আমার পড়ে মনে, হাহা হিহি হো হো, প্রিয় বন্ধু হই, ইফা ও জাদুর পেনসিল।

এবারের বইমেলায় নতুন কী কী বই আসছে, কোন কোন প্রকাশনী থেকে?

লেখায়, ছবিতে, প্রকাশনায় সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে একটি ভালো শিশুতোষ বই প্রকাশ করার। বছরে একসঙ্গে এই তিনটি ব্যাপার মেলানো কঠিন। তাই একাধিক বইয়ের থেকে একটি বইয়ের দিকেই বেশি মনোযোগ দিই। এবারের মেলায় আমার একমাত্র বই ‘ইফা ও জাদুর পেনসিল’। বইটি প্রকাশ করেছে শিশুদের প্রিয় ময়ূরপঙ্খি প্রকাশনী। বইটির জন্য লম্বা সময় নিয়ে (প্রায় দুই বছর) ধরে ছবি এঁকেছেন সৃষ্টিশীল শিল্পী মানব। বইটি আমার কাছে খুব আবেগের একটি জায়গা দখল করে আছে, কারণ ‘ইফা ও জাদুর পেনসিল’ আমার লেখা প্রথম শিশুতোষ গল্প, যে গল্পটি লেখার পরে শিশুদের জন্য নিয়মিত লিখব এই সিদ্ধান্ত নিই।

আপনার কাছে শিশুসাহিত্যের সংজ্ঞা কী? শিশুদের বই কেমন হওয়া উচিত?

শিশুর মানসিক গঠনে ভূমিকা রাখে, তার কাছে উপভোগ্য হয় এমন শব্দ, বাক্যে রচিত সাহিত্য যা তার কল্পনাকেও রাঙিয়ে তোলে সেটিই আমার কাছে শিশুসাহিত্য।

আনন্দের মধ্য দিয়ে শিশুরা প্রকৃতি, পরিবেশ, দেশ, পরিবার, মানুষ, পশুপাখি সম্পর্কে আরও জানতে পারে, সচেতন হয় এমন বই বেশি বেশি হওয়া উচিত।

কখন ঠিক করলেন শিশুদের জন্যই লিখবেন, কোন চিন্তা থেকে?

শুরুতে বড়দের জন্য লিখতাম। যখন শিশুদের স্বপ্নরাজ্য প্রিয় ইকরিমিকরিতে কাজ শুরু করলাম, ইকরিমিকরির বই, পত্রিকায় কাজ করতে করতে একদিন হঠাৎ করে একটি শিশুতোষ গল্প লিখে ফেলি। শিশুরা গল্পটি পছন্দ করল, বড়রা প্রশংসা করল। আমি খুব উৎসাহ পেলাম। তখনই সিদ্ধান্ত নিই নিয়মিত শিশুদের জন্য লিখব।

সবসময় নিজের মাঝে শৈল্পিক শিশুমনের অস্তিত্ব টের পাই। শিশুদের জন্য লিখতে পারা আমায় নির্মল আনন্দ দেবে বুঝতে পারি। আনন্দ চিরকাল সুন্দর সেই চিন্তা থেকেই নিয়মিত শিশুদের জন্য লিখছি।

লেখার বিষয় হিসেবে গল্পকে বেছে নিলেন কেন?

মানুষ, প্রকৃতি কিংবা অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোর মনস্তাত্ত্বিক দিক গল্পের মধ্য দিয়ে সহজে ফুটিয়ে তোলা যায় বলে গল্প আমাকে টানে। প্রকৃতি ও মানব জীবনের টানাপড়েন, হাসি-আনন্দ, চারপাশের অসংখ্য ঘটনা অক্ষরে অক্ষরে, শব্দে শব্দে গল্প হওয়ার আকুতি জানায় আমার কাছে। এমনটা আমি অনুভব করি। তাদের একত্রিত করে বাঁচিয়ে রাখতেই আমার গল্পকে বেছে নেওয়া।

নতুন লেখক যারা শিশুদের জন্য লিখছেন তাদের মধ্যে কোন ধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ করছেন?

নতুন লেখক এখন যারা লিখছেন তাদের ভীষণ আত্মবিশ্বাসী মনে হয়। এটা ভালো দিক, এই আত্মবিশ্বাস লেখককে আরও ভালো লিখতে উৎসাহিত করবে। তবে একটা ব্যাপার দেখা যায়। একটা ‘ভালো লেখা’ লেখার থেকে পরিমাণে অনেক বেশি লেখার তাড়না আছে বলে মনে হয় কারও কারও মধ্যে। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রকাশিত একই লেখকের একাধিক লেখার কোনো কোনোটি পড়ে মনে হয় আরেকটু সময় নিলে, ঘষামাজা করলে লেখাটি আরও অর্থবহ, আরও ঝরঝরে হতো। এ বিষয়টা কখনো কখনো আমি নিজের মধ্যেও অনুভব করি। নতুন লেখকদের অনেকেই একই লেখা একসঙ্গে অনেক জায়গায় পাঠায়। ধৈর্য ধরে রাখতে পারেন না, প্রকাশের জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। ধৈর্য ধরতে পারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের জন্য মেলার পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত?

শিশুদের জন্য মেলায় খোলামেলা পরিবেশ থাকতে হবে। শিশুরা ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেলে কোথাও বসে একটু বিশ্রাম নেবে তেমন জায়গা থাকতে হবে। শহরের বাসাবাড়িতে এমনিতেই শিশুরা বদ্ধ ঘরে দিন কাটায়। শিশুচত্বরটি আরও বড় হলে, স্টলগুলো গাদাগাদি না হয়ে আরও খোলামেলা হতে পারত। মেলায় বাংলা একাডেমির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বই সম্পর্কিত ইভেন্ট থাকতে পারত, যেখান থেকে শিশুরা বই সম্পর্কে আরও জানবে, বইয়ে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

আপনি ‘ইকরিমিকরি’ পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পত্রিকা প্রকাশের সময় কোন চিন্তাটি প্রধান হিসেবে কাজ করে?

‘ইকরিমিকরি’র উদ্দেশ্য শিশুর আনন্দময় শৈশব নির্মাণ। পত্রিকাটির মধ্য দিয়ে শিশুদের পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা থাকে। তাদের মধ্যে শিল্পীসত্তা, লেখকসত্তা জাগিয়ে তুলতে আমরা চাই। ইকরিমিকরি পত্রিকা এখন অবধি ৩৭টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি সংখ্যার প্রচ্ছদ শিশুরাই করেছে। নিজেদের লেখা, আঁকা দিয়ে সংখ্যাগুলোতে প্রায় ১০০০ শিশুর অংশগ্রহণ রয়েছে। তারা ভালো করছে। তাদের মধ্যে থেকেই ভবিষ্যতে অনেক লেখক, শিল্পী বেরিয়ে আসবে।