মানুষ কি নিরুপায়?

ঐতিহাসিক একটা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও মানুষের আশা ছিল খুবই সীমিত। ভেবেছিল ভোট দেওয়ার অধিকারটুকু ফিরে পাবে, নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারবে, চাঁদাবাজ থেকে রেহাই পাবে, জিনিসপত্রের দাম কমবে। ব্যস, এই তো। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং বহুমাত্রিক চিন্তায় আষ্টেপৃষ্ঠে প্রতিজন। ঘরে-বাইরে নিরাপদ নয় কেউ। গত বছরের ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি ভেঙে পড়লে অন্তর্বর্তী সরকারের শুভাকাক্সক্ষীরা বলতে চাইলেন একটা ‘বিপ্লবের’ যেকোনো দেশেই এমন বিশৃঙ্খলা হয়। কিন্তু সাত মাস বয়সী সরকার এখনো তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। একের পর এক রোমহর্ষক যে ঘটনাগুলো ঘটছে তা একই সঙ্গে ক্ষুব্ধ এবং হতাশ করে তুলছে সবাইকে। ছিনতাই হত্যা ডাকাতি খুন ধর্ষণ এই জনপদে নতুন কিছু নয়। কিন্তু তার মাত্রা এবং ধরনের যে ভয়াবহতা, তাতে প্রধান উপদেষ্টার বাণী আমাদের কাছে প্রশ্নবোধক মনে হয়। শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা এখন বেশি শক্তিশালী, উদ্যমী ও সৃজনশীল। আমাদের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন অতীতের যেকোনো প্রজন্মের স্বপ্নের চেয়ে দুঃসাহসী। তারা যেমন নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টি করতে চায়, তেমনি একই আত্মবিশ্বাসে নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করতে চায়।’

সোমবার রাতে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী চলন্ত বাসে ডাকাতির পাশপাশি দুই নারী যাত্রীকে ধর্ষণ এবং তার পরে যা ঘটল, তা মেনে নেওয়া যায় না। চলন্ত বাসে এসব ঘটনা কোন জেলার সীমানায় ঘটেছে, সেই প্রশ্নে দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা চলতে থাকে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর মধ্যে। তিন দিন পর নেওয়া হয় মামলা। যাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বড়াইগ্রাম থানা পুলিশ বাসের চালক, চালকের সহকারী ও সুপারভাইজারকে আটক করেছিল ঠিকই। তবে ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে যান তারা। বুধবার সকালে খোদ রাজধানীর উত্তরায় অফিসগামী মানুষের ভিড়ের মধ্যে প্রকাশ্যে একজনকে ছুরিকাঘাত করে চোখের পলকে যাত্রীদের ফোন আর ওয়ালেট নিয়ে গেল ছিনতাইকারীরা। পুরো অপারেশনে সময় লাগল দুই মিনিট। এর আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি সাভারের যাত্রীবাহী বাসে ছিনতাই হয়। ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে অন্তত ৩ জন আহত হন। ২০ ডিসেম্বর সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চলন্ত বাসে যাত্রীদের জিম্মি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সোমবার রাতে উত্তরার একটি এলাকায়  মোটরসাইকেলে করে বাসায় ফিরছিলেন মেহেবুল হাসান ও নাসরিন আক্তার ইপ্তি। পথের মাঝে কয়েকজন কিশোরের সঙ্গে রিকশা আরোহীদের ঝামেলা দেখে সমঝোতার জন্য এগিয়ে যান তারা। শুরু হয় তাদের সঙ্গেও কথা কাটাকাটি-বাগবিতণ্ডা। একপর্যায়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা রামদা দিয়ে কোপাতে থাকেন তাদের। ওই নারীর সঙ্গে থাকা পুরুষকে বাঁচানোর জন্য জীবন বাজি রেখে তার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ান। কিন্তু নৃশংসভাবে কোপানো হয় তাদের দুজনকেই। শুক্রবারও হিন্দি মুভি স্টাইলে ডাকাতি হয়েছে মিরপুরে এক বাসায় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। এমন ঘটনা নিশ্চিতভাবে সারাদেশে ঘটে চলেছে কমবেশি, যার সবটা আমাদের চোখে পড়ে না, পত্রিকার পাতায়ও সংবাদ হয়ে উঠে আসে না। কোনো কোনো ঘটনা সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলেও পুলিশের চোখে পড়ে না অনেক কিছুই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে মহাসড়কে ডাকাতির কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পর্যন্ত নেই। ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনীর জায়গায় পাড়া-মহল্লায় এখন নতুন নতুন বাহিনীর উৎপাত। চাঁদাবাজি চলছে মহাসমারোহে। না দিলে আক্রমণ, ভাঙচুর। অভিযোগ উঠছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের।

কিন্তু কেন ঘটছে এমনটা? পরিস্থিতির উন্নতির জন্য পুলিশকে সহায়তা করতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের শুরু থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও মাঠে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তবু ফল আসছে না কোনো। কারণ অপসংস্কৃতির পরিবর্তন হয়নি এতটুকু। ক্ষেত্র বিশেষে মাত্রা আরও বেড়েছে। এসব অপরাধীকে ‘শয়তান’ আখ্যা দিয়ে শুরু হয়েছে অপারেশন ডেভিল হান্ট। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গণগ্রেপ্তারেই যৌথ বাহিনীর এই বিশেষ অভিযান, এমন অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাদা পোশাকে গভীর রাতে অনেককে আটক করছে বলে জানাচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। ৮ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে শুরু করে ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেল পর্যন্ত ‘অপারেশন ডেভিল হান্টে’ সারা দেশে মোট ৭ হাজার ৩১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ‘যাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, বিগত দিনেও আমরা স্বৈরাচার সরকারের আমলে যেমন দেখেছি বয়স বিবেচনা করা হয়নি, তারপর শারীরিক অসুস্থতা বিবেচনা করা হয়নি। ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এ রকম অভিযোগও কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে। এটি কোনোভাবে কাম্য না। (বিবিসি; ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)।’ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে সাবেক (আওয়ামী লীগ) সরকারের সমর্থক হলেও তাদের সভা, সমাবেশ ও আন্দোলনের অধিকার অস্বীকার করতে পারে না অন্তর্বর্তী সরকার। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এগুলো মানুষের মুখ্য অধিকার। কর্র্তৃপক্ষ যখন কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘শয়তান’ বলে আখ্যায়িত করে, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমেই নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা বেড়ে যায়, যা কখনোই জবাবদিহির আওতায় আসে না।

গণঅভ্যুত্থানের আগে এবং পরে পুলিশের ওপর দিয়ে বড় একটা ধকল গেছে। পুলিশ হত্যার ঘটনায় বাহিনীর অনেকে ট্রমার মধ্যে রয়েছেন। তাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে, যেটা এখনো তারা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। বাহিনীতে আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবেও কিছু সদস্য এখনো নিষ্ক্রিয়। সাবেক সরকারের বেনিফিশিয়ারি হিসেবে চিহ্নিত পুলিশের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাসহ পলাতক কয়েকশ। অনেককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে একটা ষড়যন্ত্রের বয়ানও তুলে ধরছেন অনেকে। সবকিছুতে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তৈরি করা হলে তাতে বিপদ ছাড়া সমাধানের কিছু থাকে না। আওয়ামী লীগও যা কিছু খারাপ-বিতর্কিত, সবটাতে বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্র হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। আখেরে লাভের লাভ কিছুই হয়নি। মোদ্দা কথা হলো- আওয়ামী সরকারের অপসংস্কৃতির কিছুই বদলায়নি। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের শায়েস্তা করতে নানা ধরনের উপায় এখনো চলছে। গায়েবি মামলার গতি এখনো প্রবহমান। ঘুষ সমান তালে চলছে। ঢালাওভাবে পুলিশের পুরো বাহিনীর সদস্যদের রাখা হয়েছে অভিযোগের কাঠগড়ায়। সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগে অপরাধীকে আটক করা হলে মব সৃষ্টি করে তাকে ছাড়িয়ে আনতে দেখা যাচ্ছে। চাঁদাবাজির অভিযোগ পুলিশ-বিএনপি-জামায়াত-বৈষম্যবিরোধী ছাত্র নেতাদের বিরুদ্ধে সমানভাবে। আমলাতন্ত্র যে সরকারকে ঠিকমতো কাজ করতে দিচ্ছে না, সে কথাও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই আমলাতন্ত্রের সঙ্গে নিয়োগ বদলি-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছে সরকারেরই একটি অংশ, এমন অভিযোগও রয়েছে। অতএব দায়িত্বশীল পুলিশ সদস্যরাও রয়েছেন বিভ্রান্তির মধ্যে।

সবকিছু ড. ইউনূস সরকার জানেন। কিন্তু সমাধানের পথে হাঁটতে পারছেন না বিশেষ একটি গোষ্ঠীর কারণে। সেই গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে লেজেগোবরে পাকিয়ে যাচ্ছে সব ধরনের পরিকল্পনা। কখনো কখনো বাধ্য হয়েই হাঁটতে হচ্ছে উল্টোপথে। পুলিশও কথা বলছে আওয়ামী সরকারের পুলিশের মুখে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে নানা ধরনের যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তার ন্যূনতম বাস্তবায়ন অন্তত এই সরকারের সময় সম্ভব নয় বলেই মনে হচ্ছে। সব কিছুর পর যে মানুষই সত্য, এ কথা কেউই মনে রাখে না। মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভের জন্ম হচ্ছে তারও বিস্ফোরণ ঘটতে পারে যেকোনো সময়। মানুষের এই ক্ষোভ আর চরম বাস্তবতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা হচ্ছে। রাজনৈতিক সরকারগুলোর মতো আজ্ঞাবহ পুলিশি চরিত্রে এখনো চলছে সমানভাবে, যা ফুটে উঠছে তাদের বক্তব্যেই। তাদের নির্লিপ্ত কথাবার্তা মানুষকে আতঙ্কিত করছে অধিক মাত্রায়। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের একটি বক্তব্য তুলে ধরলেই বোঝা যায়, বাস্তবতাকে তারা পাশ কাটাতে চাইছে কতটা ভয়ংকরভাবে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, ‘সবকিছু মিলিয়ে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় কোনো ঘটনা নেই। ল অ্যান্ড অর্ডার ভেরি গুড। আমি মনে করি, বিচ্ছিন্ন একটি-দুটি, মেইনলি মোবাইল ছিনতাই ব্যতীত কোনো অপরাধ নেই। এভরিথিং ইজ নরমাল। তিনি বলেন, দুদিন আগে উত্তরার ঘটনার পাঁচজনকেই অ্যারেস্ট করা হয়েছে। আমরা সাকসেসফুললি ওইটা হ্যান্ডেল করছি। আমার অফিসার, ফোর্স সবাই আমরা মনোবল ফিরে পেয়েছি এবং চমৎকারভাবে কাজ করছি’ (মানবজমিন; ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

monjurpanna777@gmail.com