বিহানবেলা লাগে ভালো পিঠাপুলি খাইতে

পিঠা শুধু খাবার নয়, এটি আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সংযোগ। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসবে, হয়তো মা-চাচির হাতের সেই ঘরোয়া পিঠার স্বাদ কমে যাবে, তবে হারিয়ে যাবে না। কারণ সংস্কৃতির সঙ্গে যার সম্পর্ক গভীর, সেটি সহসা বিলীন হয় না। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

পিঠা, এই একটি শব্দেই যেন বাংলার মাটির গন্ধ মিশে আছে। পিঠা বাঙালির সংস্কৃতি, আবেগ এবং পারিবারিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি। শীতকাল এলেই বাংলার ঘরে ঘরে ধোঁয়া ওঠা পিঠার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, যেন বাংলার মাটিও খুশিতে উল্লাস করে ওঠে।

পিঠার শিকড় কত গভীর

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নারীরা বয়ে নিয়ে চলেছে পিঠা তৈরির প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যা। রন্ধনশিল্পে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষের উপস্থিতি থাকলেও পিঠা তৈরির প্রক্রিয়াটি দীর্ঘকাল ধরে নারীদের হাতেই ছিল। ‘পিঠা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পিষ্টক’ থেকে, যার মানে হলো চূর্ণিত বা মর্দিত। অর্থাৎ যা গুঁড়া করে বানানো হয়, সেটাই পিঠা! আর বাংলার প্রধান খাদ্যশস্য ধান থেকে তৈরি চালই তো পিঠার মূল উপকরণ। হাজার বছর ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য তাই আজও টিকে আছে বাঙালির রান্নাঘরে। বাংলার খাবারের ইতিহাসে পিঠার গুরুত্ব অপরিসীম, এবং এটি বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পিঠা তৈরির কৌশল হাজার বছরের পুরনো। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার বঙ্গীয় শব্দকোষে লিখেছেন, পিঠা হলো চালের গুঁড়া, ডাল বাটা, গুড় ও নারিকেলের মিশ্রণে তৈরি একটি মিষ্টান্ন। বাংলাদেশে প্রধান খাদ্যশস্য ধান, যা থেকে চাল তৈরি হয়ে পিঠার মূল উপাদান হয়ে ওঠে। আনুমানিক পাঁচশ বছর আগে থেকেই বাঙালি খাদ্য সংস্কৃতিতে পিঠার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল এবং এটি একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে শতাধিক ধরনের পিঠা তৈরি হয় এবং সব ধরনের পিঠার একটি নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে। গ্রামীণ জনগণের মধ্যে পিঠার তৈরি ও খাওয়ার প্রথা এখনো গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং শহরেও শীতকালে পিঠা খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। পিঠা-পুলি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান এবং এটি সম্পর্কিত অনেক গান, কবিতা ও ছড়া প্রচলিত রয়েছে। পিঠা এক ধরনের আনন্দের প্রতীক, যা শীতকালের সন্ধ্যায় পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হয়ে উপভোগ করা হয়। পিঠা উৎসব ও পিঠামেলা আয়োজনের মাধ্যমে শহরেও এই ঐতিহ্যকে সজীব রাখা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পিঠার স্বাদ গ্রহণের জন্য এ ধরনের উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সংস্কৃত সাহিত্য থেকে শুরু করে মঙ্গলকাব্য, রামায়ণ, মনসামঙ্গল সব জায়গাতেই পিঠার অস্তিত্ব ছিল। কল্পনা করুন, আজ থেকে পাঁচশ বছর আগেও হয়তো কোনো গ্রামীণ বাড়ির উঠানে মা-মাসিরা বসে পিঠা বানাচ্ছেন আর পাশের ছোট্ট ছেলে মুখ লুকিয়ে গুড় চুরি করছে!

নামের বাহার

বাংলার পিঠার নামও যেমন বাহারি, স্বাদেও তেমন বৈচিত্র্যপূর্ণ। পিঠার নাম শুনলেই জিভে জল চলে আসে! আহা, কত স্বাদের কত রকম পিঠা! শীত এলেই ঘরভর্তি অতিথি, পিঠার গন্ধ আর একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ এসবই বাঙালির ঐতিহ্য। চিতই, ভাপা, ঝাল পিঠা, ছাঁচ পিঠা, দুধ চিতই, বিবিখানা, লবঙ্গ লতিকা, রসফুল, জামদানি, নকশি, নারকেল পিঠা, সরভাজা, পুলি, পাটিসাপটা, মালপোয়া, কলা পিঠা, খেজুরের পিঠা, মালাই, ক্ষীরকুলি, গোকুল, গোলাপ ফুল পিঠা, দুধচিতই, গোলাপ পিঠা প্রতিটি নামের মধ্যেই রয়েছে আলাদা স্বাদ, আলাদা আবেগ। এসব পিঠার মধ্যে কিছু আছে মিষ্টি, কিছু ঝাল, কিছু আবার দুধ বা নারকেল দিয়ে তৈরি।

পিঠা মানেই উৎসব

বাংলাদেশের ষড়ঋতুর মধ্যে শীতকাল যেন পিঠার নিজস্ব রাজত্ব! নতুন ধান উঠলেই চালের গুঁড়া আর খেজুরের গুড় দিয়ে শুরু হয় পিঠা বানানোর উৎসব। নবান্ন, পৌষসংক্রান্তি, চৈত্রসংক্রান্তি, বৈশাখী, ঈদ, দুর্গাপূজা, জামাই খাওয়ানো, বিয়ে, জন্মদিন কোনো উৎসবেই পিঠা বাদ যায় না। শীতকালে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে পিঠা-পায়েস তৈরির উৎসব আয়োজন করা হয়। বিশেষত, পৌষসংক্রান্তিও মাঘ-ফাল্গুন মাসে পিঠা তৈরির ধুম পড়ে। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে বা সন্ধ্যায় গাঁয়ের বধূরা চুলার পাশে বসে পিঠা তৈরি করেন। অতিথিদের বিশেষ করে জামাইদের পিঠা খাওয়ানোর রেওয়াজ রয়েছে এ সময়ে। খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড়ের মিষ্টান্ন এবং পিঠা বিশেষত মোহনীয় গন্ধে আরও সুস্বাদু হয়ে ওঠে।

বাংলার সাহিত্যে পিঠার উজ্জ¦ল উপস্থিতি আছে। সুফিয়া কামালের কবিতায় ফুটে ওঠে মায়ের হাতের পিঠা খাওয়ার আনন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতায় পাই পৌষ পার্বণে পিঠার ধুমধাম। পল্লী সমাজে পিঠার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল রাতভর ঢেঁকিতে চাল ভাঙা, গাছিরা খেজুর রস সংগ্রহ করা এবং নারীরা দলবেঁধে পিঠা বানানো।

পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে ঘরে ঘরে পিঠা তৈরির ধুম লেগে যেত। মধ্যযুগের কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত তার ‘পৌষ পার্বণে’ কবিতায় লিখেছেন :

‘আলু তিল গুড় ক্ষীর নারিকেল আর।

গড়িতেছে পিঠেপুলি অশেষ প্রকার।’

বাংলার লোকসংস্কৃতির অংশ পিঠা

বাংলার মানুষের জীবনে পিঠার রয়েছে এক দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য। যদিও সময়ের পরিবর্তনে পিঠার স্থান রান্নাঘর থেকে উঠে এসেছে দোকানে, তথাপি বাঙালির হৃদয়ে এর গুরুত্ব অটুট রয়ে গেছে। এক সময় বাংলাদেশে যেমন শত শত ধানের নাম ছিল, তেমনি সেসব ধানের পিঠারও অসংখ্য বিচিত্র নাম ছিল। পিঠা তৈরি ছিল বাংলাদেশের মেয়েদের ঐতিহ্য। এ প্রাচীন সংস্কৃতি বাঙালি সমাজে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, আজও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পিঠা-পায়েস নিয়ে অসংখ্য গান, কবিতা ও ছড়া প্রচলিত রয়েছে। পিঠাকে নিয়ে বিখ্যাত কবি বেগম সুফিয়া কামাল তার ‘পল্লী মায়ের কোল’ কবিতায় লিখেছেন, ‘পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশীতে বিষম খেয়ে/আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।’ এই কবিতায় পিঠার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আনন্দ ও উল্লাসের এক নিখুঁত চিত্র ফুটে ওঠে।

বাংলাদেশে পিঠা শুধু খাবারেরই নয়, বরং আনন্দ ও উদযাপনের প্রতীক। শীতের সকালে এবং সন্ধ্যায় পিঠার মিষ্টি গন্ধ পরিবেশকে সজীব করে তোলে। পিঠা খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের সম্পর্ক আরও মধুর হয়, আর এই আনন্দের মুহূর্তগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকে।

শহরের বিভিন্ন স্থানে এখন পিঠা উৎসব বা পিঠামেলা আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পিঠা একত্রিত করা হয়। এই উৎসবগুলোতে মানুষ বিভিন্ন ধরনের পিঠা দেখতে এবং খেতে আসে, পিঠার ঐতিহ্যকে আরও বিস্তৃত করে তোলে। পিঠামেলার মাধ্যমে, শুধু পিঠা নয়, বাঙালি সংস্কৃতির গভীর ঐতিহ্য এবং শীতকালীন আনন্দও শহরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলা ভাষায় লেখা কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত ইত্যাদি কাব্যে পিঠার উল্লেখ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও মৈমনসিংহ গীতিকার ‘কাজলরেখা’ আখ্যানে পিঠা তৈরির একটি

বর্ণনা মেলে :

‘নানা জাতি পিঠা করে গন্ধে আমোদিত।

চন্দ্রপুলি করে কন্যা চন্দ্রের আকিরত॥’

ফাস্টফুডের যুগেও টিকে থাকবে বাংলার পিঠা

বার্গার-পিজ্জার দাপটে কি আর পিঠার দিন আছে? অনেকেই মনে করেন, আধুনিক ফাস্টফুড সংস্কৃতির মধ্যে বাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠা টিকে থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুগ পাল্টাক, রুচির পরিবর্তন আসুক, ফাস্টফুডের ঝড় উঠুক বাংলার পিঠা তার আপন ঐতিহ্য আর স্বাদে অবিচল থাকবে।

আজও শহরের অলিতে-গলিতে ভাপা পিঠার দোকান বসে। শীতের সকালে কিংবা সন্ধ্যায় গরম ধোঁয়া ওঠা পিঠার গন্ধে পথচারীদের মন ভরে যায়। শুধু গ্রামের মাটির চুলায় নয়, বড় বড় রেস্টুরেন্টেও এখন বাহারি পিঠার আয়োজন দেখা যায়। এমনকি, অনলাইনেও হোমমেড পিঠার চাহিদা ক্রমে বাড়ছে।

বিদেশে পিঠার জয়যাত্রা

শুধু দেশেই নয়, বাংলার পিঠা এখন বিদেশেও জনপ্রিয়। কলকাতার রাস্তায় ‘ভাক্কা পিঠা’ নামে বিক্রি হয় আমাদের পরিচিত ভাপা পিঠা! বিদেশিরাও এখন একে ‘স্ট্রিট কেক’ বলে ডাকে। ইউরোপ-আমেরিকায় অভিবাসী বাঙালিরা নিজেদের খাবারের স্বাদ ধরে রাখতে পারলে, বিদেশিরাও এতে আগ্রহী হচ্ছেন। পিঠার মিষ্টি স্বাদ, চালের গন্ধ আর খেজুর গুড়ের ঐতিহ্য যেকোনো রুচির মানুষের মন জয় করতে পারে।

স্মৃতি ও সংস্কৃতির অংশ

পিঠা কেবল একটি খাবার নয়, এটি আমাদের শেকড়ের প্রতিচ্ছবি, এটি স্মৃতির ভাণ্ডার। শীতের রাতে গরম গরম ভাপা পিঠা, পাটিসাপটা বা ক্ষীর পুলি খেয়ে যে আনন্দ, তা আর কোনো খাবারে পাওয়া যায় না। পিঠার স্বাদ আমাদের ছেলেবেলার শীতের সকাল, মা-দাদির হাতের মমতা আর পারিবারিক মিলনমেলার কথা মনে করিয়ে দেয়।

তাই যুগ যতই বদলাক, প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক, বাংলার পিঠা তার নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে টিকে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। একদিন হয়তো আমাদের সন্তানরাও গুনগুন করে গাইবে

‘ভাপা পিঠার বাঁকা ধোঁয়া, তেলে গরম তেল পোয়া;

দুধে ভেজা দুধ চিতই আর খেজুর গুড়ে চিড়ার মোয়া!

শিশিরের ঘোমটা দেওয়া পৌষ মাস’

কিংবা

‘চান্দের আলো লাগে ভালো চাঁদনী পসর রাইতে,

বিহানবেলা লাগে ভালো পিঠাপুলি খাইতে!’

কিংবা

‘বন্ধু আমার নাইয়র যাইব মনে তাহার আশ রে

বন্ধু আমার দেশও যাইব মনে তাহার আশ!

ভাপা পিঠার বাঁকা ধোঁয়া, তেলে গরম তেল পোয়া;

দুধে ভেজা দুধ চিতই আর খেজুর গুড়ে চিড়ার মোয়া!

শিশিরের ঘোমটা দেওয়া পৌষ মাস।’

পিঠা বর্তমানে সারা বছর ধরে পাওয়া যায়। পিঠাঘরগুলোর মাধ্যমে শহুরে জীবনে এই ঐতিহ্য এখন আর কেবল গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং শহরের ব্যস্ত জীবনে পিঠার স্বাদ উপভোগ করা যায়। পিঠা-পুলি, আমাদের লোকজ ও নান্দনিক সংস্কৃতির এক অনন্য প্রকাশ, যা যুগে যুগে বাঙালির ঘরে ঘরে রয়ে যাবে।

এই ঐতিহ্য বয়ে চলবে আমাদের হৃদয়ে, আমাদের সংস্কৃতিতে।