বাংলাদেশের বিনোদন জগৎ এক আশ্চর্যজনক পরিভ্রমণের সাক্ষী, যেখানে প্রতিটি যুগের সঙ্গে বিনোদনের মাধ্যমও বদলেছে। যাত্রাপালা থেকে শুরু করে টেলিভিশন এবং সিনেমা, এরপর ওয়েব সিরিজের উত্থান এ বিষয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব।
বাংলার যাত্রাপালা
যাত্রাপালা একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা মূলত পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে জনপ্রিয় ছিল। এটি ছিল মঞ্চনাটক এবং সংগীতের একটি সুমিষ্ট সমন্বয়। যাত্রা, বিশেষত বাংলার গ্রামীণ জনজীবনে, বহু বছর ধরে অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনের মাধ্যম ছিল। এটি এক ধরনের লোকনাট্য, যেখানে অভিনয়, গান, নৃত্য এবং কথামালা একত্র হয়।
যাত্রাপালার উৎপত্তি ১৮শ শতাব্দীতে হলেও এটি আধুনিক বাংলা নাটকের জন্মের পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়। যাত্রাপালার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ, প্রাঞ্জল এবং হৃদয়গ্রাহী কাহিনি, যা সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন করত। বিভিন্ন পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক কাহিনির ওপর ভিত্তি করে যাত্রাপালার গল্প সাজানো হতো, যেখানে থাকত প্রেম, দ্বন্দ্ব, রাষ্ট্রনীতি এবং মানবিক কাহিনির গভীরতা।
বিশেষভাবে যে চরিত্রগুলো যাত্রাপালায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা হলো রাধা, কৃষ্ণ, শ্রীরাম, মনসা, চাঁদমনি, বীরভদ্র। এই চরিত্রগুলো সাধারণত মানবতা, দয়ালুতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করত। পাশাপাশি, যাত্রাপালায় শক্তিশালী নারী চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতযেমন ‘চাঁদমনি’, ‘বুড়ি মাতা’, ‘রাধিকা’ ইত্যাদি।
যাত্রাপালার মঞ্চে অভিনয় অত্যন্ত নাটকীয় এবং বৃহৎ পরিসরে হতো। সাধারণত এটি যাত্রাপালার দল দ্বারা পরিবেশিত হতো, যেখানে একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রী অংশ নিতেন। তারা অত্যন্ত রঙিন পোশাক পরতেন, হালকা সাজগোজ করতেন এবং একেবারে দর্শকদের কাছে পৌঁছে যেতে এক রকম শক্তিশালী অভিনয়ের ভঙ্গি ব্যবহার করতেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি, সংগীতও যাত্রাপালার অঙ্গ ছিল। গান ছিল অত্যন্ত প্রাঞ্জল এবং প্রচলিত লোকসংগীতের সঙ্গে মিশে যেত। বিশেষত, গানের মধ্যে আস্থা, নৈতিকতা, প্রেম এবং বিচ্ছেদের কাহিীি প্রকাশ করা হতো। আর, নাচের মাধ্যমে গানের সমর্থন করা হতো। এই সমন্বয়টির মাধ্যমে এক অন্যরকম যাত্রা নির্মাণ হতোযার মধ্যে লোকজীবনের সাদাসিধে আনন্দ ও দুঃখ ছিল।
তবে, ১৯ শতকের শেষভাগে এবং ২০ শতকের প্রথম দিক থেকে যাত্রাপালার জনপ্রিয়তা কমে আসতে থাকে। টেলিভিশন, সিনেমা এবং আধুনিক বিনোদন মাধ্যমগুলোর আগমনে এটি ধীরে ধীরে মুছে যেতে শুরু করে। তবে এখনো বাংলার অনেক গ্রামে, বিশেষত দক্ষিণবঙ্গের কিছু অঞ্চলে, যাত্রাপালা নিয়ে প্রচলিত রয়েছে ছোট ছোট পরিবেশনা। এগুলোর মধ্যে এখনো জীবন্ত সংস্কৃতির ছোঁয়া পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে বাংলার মাটিতে এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য একদিন বিস্মৃত না হওয়া পর্যন্ত, এর অস্তিত্বে এক বিশেষ স্থান পেয়েছে।
এক কথায়, যাত্রাপালা ছিল সেই সময়ের এক ধরনের সমাজকথা, যেখানে মানুষের আনন্দ, দুঃখ, প্রেম, যুদ্ধ সব কিছু মঞ্চে তুলে ধরা হতো। যদিও আজকের দিনে এটি কম প্রচলিত, কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে যাত্রাপালার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশে সার্কাস
বাংলাদেশে সার্কাসের সোনালি যুগ শুরু হয়েছিল ১৯০৫ সালে, ‘দি লায়ন সার্কাস’ নামে এক দলে। তারপর ১৯৭০ সালে ‘দি সাধনা লায়ন সার্কাস’ নামটি বদলে গেল। সে দিনগুলোতে তো সার্কাস ছিল একটা বিশেষ ধরনের উৎসব। এমনকি আপনি যখন মেলার দিকে পা বাড়াতেন, সার্কাসের তাঁবু ছিল মেলার মূল আকর্ষণ। কিন্তু এখন কী অবস্থা? সার্কাসের তাঁবু এখন শুধুই ফেলে আসা অতীতের এক টুকরো স্মৃতি! আজকাল যে কোনো টেলিভিশন চ্যানেলেই আপনি সার্কাস দেখতে পারেন, আর সার্কাসের এই দুনিয়া যেন হারিয়ে গেছে সেলুলয়েডের পর্দার গাঢ় কালোতে।
এবং তারপর আমরা যাদের নিয়ে কথা বলতাম ‘দি বেবি সার্কাস’, ‘দি আজাদ সার্কাস’, ‘দি নিউ স্টার সার্কাস’ আজকের দিনে, তাদের খেলা আর সেই উত্তেজনা কোথায়? কোথায় সেই রঙবেরঙের কাপড়ের হাসি, সেই পাখির চোখ দিয়ে রড বাঁকানো, সেই এক চাকার ওপর ঘুরতে থাকা সাহসী মানুষগুলো?
সময়টা যেমন নিজের গতিতে চলে, তেমনি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়েও কিছু পুরনো বিনোদন মাধ্যম হারিয়ে গেছে।
ভিডিও ক্যাসেট রেকর্ডার
১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে ভিডিও ক্যাসেট রেকর্ডার (ঠঈজ) ও ভিডিও ক্যাসেট মানুষের ঘরে ঘরে বিনোদনের নতুন দুয়ার খুলে দেয়। সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার বাইরে ঘরে বসেই সিনেমা উপভোগ করার সুযোগ দেয় এই মাধ্যম। সন্ধ্যা হলেই পাড়ার এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে খবর যেত ‘নতুন সিনেমার ক্যাসেট এসেছে!’ তারপর শুরু হতো হুলস্থুল কাণ্ড। কেউ চটজলদি ভিসি (ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার) চালু করছে, কেউ জানালা-দরজা বন্ধ করছে যেন আলো কম পড়ে, আবার কেউ সগর্বে বলছে, ‘আরে ভাই, কাহিনি আমি আগেই দেখেছি!’
কলের গান, ক্যাসেট, ভিসিআর এগুলো একসময় ছিল আমাদের বিনোদনের উৎস। এক সময় মানুষের গান শোনার প্রধান মাধ্যম ছিল অডিও ক্যাসেট ও ক্যাসেট প্লেয়ার। পছন্দের শিল্পীর নতুন অ্যালবাম প্রকাশিত হলে মানুষ ক্যাসেটের দোকানে ভিড় করত। ক্যাসেটে গান সংরক্ষণ করা হতো দুই দিকে এ ও বি সাইডে, যা শুনতে হলে মাঝেমধ্যে উল্টে দিতে হতো।
এরপর ১৯৬৩ সালে ক্যাসেট এসেছিল, আর ঠিক তখন থেকেই বাঙালি বাড়ির অন্দর মহলে হো হো রব পড়ে গিয়েছিল ‘মান্না দে’, ‘লতা মঙ্গেশকর’, ‘নীনা হামিদ’! এসব গান ক্যাসেটে শোনা যেত, তখনকার টেপ রেকর্ডার যেন এক মহামূল্যবান বস্তু! ধনী, গরিব, সব শ্রেণির মানুষ ক্যাসেট বাজিয়ে গান শোনার আনন্দ পেত। মেঘনার কূলে ঘর বান্দিলাম অথবা আমার প্রাণের প্রাণ পাখি এই সব গানের সুরে গ্রাম-বাজার, রাস্তায় চলতে চলতে শোনা যেত!
রেডিও ছিল সেই সময়ে এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এখনকার টিভি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়ে রেডিও যেন একটু ফিকে হয়ে গেছে, তবে এক সময় রেডিওর আওয়াজ ছিল দেশের সব খবর, খেলা, গান এবং প্রিয় অনুরোধের অনুষ্ঠানগুলোর জন্য একমাত্র স্থল। রাত জেগে রেডিওতে পছন্দের গান শোনার অপেক্ষা করা, আর সেই গান রেকর্ড করে রেখে দেওয়া ছিল বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ।
পরবর্তী সময়ে, ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে যখন সিডি (ঈড়সঢ়ধপঃ উরংপ) জনপ্রিয় হতে শুরু করে, তখন অডিও ক্যাসেটের জনপ্রিয়তা কমে যেতে থাকে। সিডির শব্দমান ভালো ছিল, জায়গা কম দখল করত এবং রিওয়াইন্ড বা ফরোয়ার্ড করার ঝামেলা ছিল না। ফলে ধীরে ধীরে অডিও ক্যাসেট বাজার থেকে হারিয়ে যায়।
সিডি ও ডিভিডি ছিল বিনোদনের জগতে এক নতুন বিপ্লব। চারপাশে ধীরে ধীরে ক্যাসেটের দোকান কমে যেতে লাগল। সবাই তখন ছোট, চকচকে ডিস্কের প্রেমে পড়ল। কোনো ক্যাসেটের ঝামেলা নেই, পেনসিল দিয়ে রিওয়াইন্ড করার দরকার নেই একটা ডিস্ক প্লেয়ারে বসালেই সব ঝকঝকে পর্দায় দেখা যাবে! গানও এখন এমপি-থ্রিতে চলে এসেছে, যার ফলে পছন্দের গানের জন্য আর রেকর্ডিংয়ের ঝামেলা নেই।
১৯৯০-এর শেষের দিকে ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ডিভিডির ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। সিনেমা, নাটক, গান, ভিডিও গেম সবই তখন ডিভিডিতে সংরক্ষণ করা হতো।
একসময় ভিডিও ক্যাসেটের জায়গা পুরোপুরি দখল করে নেয় এই মাধ্যম। সেই সময়কার এক চমৎকার ব্যাপার ছিল পাইরেটেড সিডি। দোকানে গিয়ে একশো টাকায় চার-পাঁচটা সিনেমা ভর্তি একটা সিডি কিনে আনার মজা ছিল আলাদা! তখনকার দিনের সিনেমার ভক্তরা বাজারের ‘স্পেশাল কালেকশন’ থেকে নিজেদের জন্য পছন্দের সিডি নিয়ে আসত। তবে সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল স্ক্র্যাচ পড়া! যদি কোনো সিডির গায়ে সামান্য দাগ পড়ত, তবে সিনেমা দেখা বা গান শোনা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যেত। তখন সেটা শার্টের হাতা দিয়ে ঘষে ঘষে ঠিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করত সবাই।
কিন্তু ডিভিডির জনপ্রিয়তাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২০১০-এর পর থেকে পেনড্রাইভ, হার্ডড্রাইভ, মেমোরি কার্ড ও ইন্টারনেট স্ট্রিমিংয়ের প্রচলন বাড়তে থাকায় ডিভিডিও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে শুরু করে।
ডিজিটাল যুগ
ডিভিডির দাপটও বেশি দিন স্থায়ী হলো না। এরপর এলো ইউএসবি, হার্ডড্রাইভ, মেমোরি কার্ড, আর তারও পরে ইন্টারনেটের দুনিয়া। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, স্পটিফাইয়ের যুগ শুরু হলো, যেখানে বিনোদনের জন্য কিছু ডাউনলোড করারও দরকার নেই সবকিছু অনলাইনে দেখা আর শোনা যায়।
একসময় যে ক্যাসেট প্লেয়ারের আশপাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো হতো, এখন সেটি জাদুঘরে জায়গা পেয়েছে। যে ভিসি প্লেয়ার নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় হইচই হতো, এখন হয়তো কারও স্টোররুমে সেগুলোতে ধুলো জমছে।
কিন্তু বিনোদন তো বদলায়, তবে স্মৃতি থেকে যায়। ভিসি, ক্যাসেট, ডিভিডির যুগ পেরিয়ে আমরা এখন ডিজিটালের রাজ্যে পা রেখেছি, তবু মাঝে মাঝে পুরনো দিনের সেই রিওয়াইন্ড করা, ক্যাসেটের ফিতা ঠিক করা, কিংবা স্ক্র্যাচ দেওয়া সিডি চালানোর জন্য হাপিত্যেশ করার দিনগুলো মনে পড়েই যায়।
বর্তমানে বিনোদনের মাধ্যম পুরোপুরি ডিজিটাল হয়ে গেছে। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, হইচই, চরকি, ডিজনি+ এর মতো অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এখন সিনেমা ও টেলিভিশন বিনোদনের মূল কেন্দ্র।
গান শোনার ক্ষেত্রেও এসেছে বিশাল পরিবর্তন। আগে যেখানে গান শোনার জন্য ক্যাসেট বা সিডি দরকার হতো, এখন মানুষ স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিক, ইউটিউব মিউজিকের মতো স্ট্রিমিং সাইট থেকে গান শোনে। পছন্দের গান খুঁজে পেতে আর দোকানে যেতে হয় না, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইন্টারনেট থেকে তা পাওয়া যায়।
এই পরিবর্তনের ফলে ক্যাসেট, ভিসি ও ডিভিডির যুগ এখন কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। আজকের প্রজন্ম হয়তো এগুলোর নামই শোনেনি, অথচ মাত্র দুই-তিন দশক আগেও এগুলো ছিল মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।