যেভাবে সরকার ফ্যাসিবাদী হয়

ইতালির জাতীয় শ্রমিক আন্দোলনে এক ধরনের ‘জাতীয়তাবাদী’ চেতনা থেকে ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কোনো রাজনৈতিক দলই খোলাখুলিভাবে নিজেদের ফ্যাসিবাদী বলে দাবি করতে চায় না, আচরণে ফ্যাসিবাদী হয়েও। শুরুতে দেশের সব শ্রেণির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, শ্রেণিবিভাজনের বিপরীতে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করা ছিল সেই ইতালীয় ফ্যাসিবাদের লক্ষ্য।

সেই শুরুর কথা যা-ই থাক, এখন ফ্যাসিবাদ মানে কী? সামাজিক বিজ্ঞানী ও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর মতে, ‘ফ্যাসিবাদ মূলত রাজনৈতিক ব্যাপার, যা ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রোথিত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কার্যকলাপ দ্বারা বাস্তবায়িত  হয়’। কিছু বিশ্লেষকের মতে, ফ্যাসিবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের মাঝখানে থাকা একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা। কিন্তু তত্ত্ব কথা আর বাস্তবতা ভিন্ন। ইতিহাসের ঘটনাক্রম বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ‘হিস্টরি চেঞ্জ দি ওয়ার্ল্ড’। ইতিহাস আমাদের একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেয়, যেমন প্রযুক্তি, শাসনব্যবস্থা এবং সমাজ অতীতে কীভাবে কার্যকর ছিল। যাতে আমরা বুঝতে পারি, এটি বর্তমানে যেভাবে কাজ করছে, সেই অবস্থায় কীভাবে পৌঁছেছে। ইতিহাসের ঘটনা বহু বছর ধরে চালু থাকা বিশ্বাস ও তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। ফ্যাসিবাদের প্রাথমিক লক্ষ্য কেবল বয়ানে থেকেছে, বাস্তবে ক্রমান্বয়ে হয়েছে একেবারে উল্টো।

সহযোগী শক্তি : এ ক্ষেত্রে ভালো করে খেয়াল করার ব্যাপারটি হলো, ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী জনগণের সামনে সোনালি অতীতের কাহিনি শোনায় এবং জাতিকে সেই সোনালি অতীতের মতো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রলোভন দেখায়। বিশে^র দেশে দেশে দেখা গেছে, ফ্যাসিবাদের মূল সুবিধাভোগী হয় শহরকেন্দ্রিক শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো এবং সিভিল ও সামরিক আমলাতন্ত্র। এরা ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় শক্তি সঞ্চার করে। দেখা যায়, ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম রাজনৈতিক নেতা কঠোর জাতীয়তাবাদ প্রচার করেন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দিতে ভূমিকা রাখেন। সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দমনমূলক নীতিগুলো কার্যকর করতে সহায়তা করে। বৃহৎ করপোরেশন ও শিল্পপতিরা অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা করতে একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন দিতে থাকে। এগিয়ে আসে গোঁড়া জাতীয়তাবাদী ও কট্টরবাদী গোষ্ঠী। তারা জাতিগত বা সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতার দোহাই দিয়ে ফ্যাসিবাদী নীতিকে সমর্থন করে। প্রচারমাধ্যম ও প্রোপাগান্ডা মেশিন ব্যবহার হয় সরকার-সমর্থিত প্রচার মাধ্যম জনগণকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করার জন্য। বিরোধী দল ও স্বাধীন মত দমনে আগ্রহী গোষ্ঠী এগিয়ে আসে গণতান্ত্রিক অধিকার ও বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করতে সহযোগিতা দিতে।

কার্যক্রম : দেখা যাক, ফ্যাসিবাদীরা কীভাবে কাজ করে? এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা সাধারণত কয়েকটি মূল বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কাজ করে। এই ব্যবস্থা সমাজে শত্রু তৈরি করার কাজটি করে। কেননা, ফ্যাসিবাদী নেতারা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। এটি হতে পারে জাতিগত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কোনো গোষ্ঠী। এই বিভাজনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ভয় এবং ক্ষোভ ছড়ানো হয়। বিভক্ত প্রতিপক্ষকে উসকে দিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত অ্যাকশন নেওয়া হয়।

এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনুসারীরা জাতীয়তাবাদকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকে। দেশের গৌরব, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে বাড়িয়ে দেখিয়ে অন্যদের নিচু করার দিকে যেতে থাকে। মানে তাদের বয়ানে নিচু করা আর কী। সেখানে ‘আমরা বনাম তারা’ আকারে দেশের জনগোষ্ঠীকে ভাগ করা হয়। সারগর্ভ নয়, এমন কিছু যুক্তি খাড়া করে নিজেদের পক্ষে মানুষকে নেওয়ার চেষ্টা করে। সাধারণ অনেক মানুষ তাদের বয়ানে সাড়াও দেয়। একটা নির্দিষ্ট সময় পরে এই মানুষগুলোই ফ্যাসিবাদীদের ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থ হাসিলের মতলব বুঝে ফেলে। ওরা দেখে তাদের বঞ্চনা পাহাড়সম হতে থাকছে। তাই ফ্যাসিবাদীদের দ্বারা শত্রু চিহ্নিত জনতা ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বেপরোয়া হয়ে উঠে তাদের পতন ঘটায়।

ফ্যাসিবাদী শাসকরা দেশের মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। তারা শুধু এমন তথ্য প্রচার করে, যা তাদের পক্ষে যায় এবং বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমন করে বিভিন্নভাবে। একটা মিডিয়া গোষ্ঠী কালক্রমে লালন করতে থাকে, যাতে ওই মিডিয়াগুলো ফ্যাসিবাদী ব্যক্তিত্বের পক্ষে নেতৃত্বের গৌরবের বয়ান ও প্রচার জারি রাখে। একজন নেতাকে পরম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তারা। সাধারণ জনগণকে বোঝানো হয় যে এই ধরনের নেতা কখনো ভুল করতে পারেন না এবং তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত মেনে চলা উচিত দেশের ও দশের স্বার্থে। দেখা গেল, মন ভোলানো কথাবার্তা বলে বলে ফ্যাসিবাদীরা দেশের সংবিধান, আইন এবং মানবাধিকারকে অবজ্ঞা করতে থাকে। তারা নিজেদের শক্তি বজায় রাখতে যেকোনো ধরনের দমনমূলক কার্যকলাপ করতে দ্বিধা করে না।

তারা তাদের দ্বারা তৈরি প্রতিপক্ষকে আতঙ্কের মাঝে রাখে এবং প্রয়োজনে সহিংসতা টুল ব্যবহার করে। এই টুল ফ্যাসিবাদের একটি মূল কৌশল। বিরোধীদের চুপ করানোর জন্য গুপ্ত পুলিশ বা বিশেষ টিম ব্যবহার করে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী দলের ছাত্র সংগঠনকে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তাদের চিহ্নিত ‘শত্রুপক্ষ’ যে এ দেশেরই নাগরিক সেদিকে একবিন্দু নজর দেওয়া হয়নি। এ জন্য প্রতিপক্ষ যাতে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হয় সে ব্যাপারে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ফ্যাসিবাদী শাসকরা অর্থনীতির কিছু নির্দিষ্ট অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং বড় করপোরেশন বা ধনী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ রেখে কাজ করে। ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে অসমতা বা বৈষম্য বাড়ে। তাদের বয়ানে তথাকথিত ‘রাষ্ট্রের স্বার্থে শ্রেণিবিভাজন দূর করার জিগির তুলে বৈষম্য লালন করা হয়।

তার মানে, ফ্যাসিবাদ এক ধরনের কর্র্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা, যা আসলে মুক্তচিন্তা এবং গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে সমাজে অসাম্য, দমন এবং সংঘাত বাড়ে। জনগণ শান্তিতে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফ্যাসিবাদীরা সংঘাত জিইয়ে রাখে তাদের স্বার্থেই।

ইতিহাস কী বলে : ইতালির শাসক বেনিতো মুসোলিনি কুঠার সমেত রোমান ফ্যাসেস প্রতীক থেকে প্রেরণা নিয়ে তার দলের নাম ও আদর্শ তৈরি করেছিলেন। আসলে, ফ্যাসিবাদ বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। বেনিতো মুসোলিনি ১৯২২ সালে ‘মার্চ অন রোম’ করে ক্ষমতা দখলে নিজেকে ‘ইল ডুচে’ (দ্য লিডার) ঘোষণা করেছিলেন। তার শাসনামলে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা দমন, রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্যাতন করা হয়েছিল।

অ্যাডলফ হিটলার জার্মানিতে (১৯৩৩-১৯৪৫) সময়খণ্ডে নেতৃত্বে ছিলেন। জার্মান ফ্যাসিবাদের রূপটিতে ছিল নাজি মতবাদ। এটি মূলত চরম জাতীয়তাবাদী ব্যবস্থা। জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদ (বিশেষ করে আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা), সামরিক আগ্রাসন এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গঠিত। যা হিটলারের নেতৃত্বে বিকশিত হয়। ১৯৩৩ সালে চ্যান্সেলর হয়ে হিটলার দ্রুত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেন। নাজি মতবাদে জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, ইহুদি বিদ্বেষ (অ্যান্টি-সেমিটিজম) এবং সামরিক আগ্রাসন ছিল মুখ্য ব্যবস্থা। নাজি মতবাদ দুনিয়ার মানুষকে দিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫)।

স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ (১৯৩৬-১৯৩৯) শেষে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় স্পেনে ১৯৩৬-১৯৭৫ সময়খণ্ডে। নেতৃত্বে ছিলেন ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকো। তার শাসনে বিরোধীদের নির্মমভাবে দমন করা হতো। ফ্রাঙ্কো ফ্যালাঞ্জ নামের একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল চালু করেন, যা ইতালির ফ্যাসিবাদী ও জার্মানির নাৎসি মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তার শাসন ছিল কট্টর ক্যাথলিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হয়। উল্লেখ্য, স্পেনের গৃহযুদ্ধ চলাকালে হিটলার ও মুসোলিনির সমর্থন পেয়েছিলেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ থাকলেও, অক্ষশক্তির প্রতি তার সহানুভূতি ছিল।

তা ছাড়া জাপান, পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরিসহ পূর্ব ইউরোপের নানা দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। স্মরণ করা যায়, নিকোলাই চসেস্কুকে। রোমানিয়ার কমিউনিস্ট নেতা এবং ১৯৬৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী ব্যক্তি। তিনি প্রথমে রোমানিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন এবং পরে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। তার শাসনকালে রোমানিয়ায় একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে তিনি ও তার স্ত্রী এলেনা চসেস্কু রাষ্ট্রের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ব্যক্তিত্ব পূজার মাধ্যমে নিজের শাসনকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন এবং কঠোর দমননীতির মাধ্যমে বিরোধীদের দমন করে সাংঘাতিক ফ্যাসিবাদী হয়ে যান। ১৯৮০-এর দশকে তার অর্থনৈতিক নীতিগুলো রোমানিয়ার জনগণের ওপর তীব্র সংকট সৃষ্টি করে। ব্যাপক দারিদ্র্য, খাদ্য সংকট ও নাগরিক স্বাধীনতার অভাবের কারণে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। অবশেষে ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট সরকারগুলো একে একে পতনের মুখে পড়লে রোমানিয়াতেও গণবিক্ষোভ শুরু হয়। ২৫ ডিসেম্বর ১৯৮৯ সালে এক সামরিক ট্রাইব্যুনালে চসেস্কু ও তার স্ত্রীকে দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং গণহত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বিচারের পরপরই তাদেরকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

লেখক: কবি, সাংবাদিক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক

sarwarch@gmail.com