১৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প রক্ষায় ২৭০ কোটির প্রকল্প

পতেঙ্গায় যুগোপযোগী হচ্ছে কর্ণফুলী টানেল জংশন 

আউটার রিং রোড, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও কর্ণফুলী টানেলের ত্রিমুখী ট্রাফিকে দিশেহারা পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের টানেল জংশন। সপ্তাহের ছুটির দিন ও বন্ধের দিনগুলোতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে গেলেই ফৌজদারহাট থেকে আসা আউটার রিং রোড, শহর থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও টানেল-বিমানবন্দরমুখী ট্রাফিকে স্থবির হয়ে পড়ছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে ট্রাফিকবিহীন সড়ক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।

শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পর্যটক ও যানবাহনে অচল হয়ে পড়ে রয়েছে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকা। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে গাড়ির বহর নামতে পারছে না বলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপরে দীর্ঘ জ্যাম। অন্যদিকে টানেল জংশনের ওপর দিয়ে মানুষ রাস্তা পারাপার হচ্ছে বলে আউটার রিং রোড দিয়ে আসা গাড়িগুলো আটকে রয়েছে দীর্ঘসময় ধরে। শুধু তাই নয়, এতে ফৌজদারহাট থেকে বিমানবন্দরগামী যাত্রীরা যানজটে আটকে থাকায় তাদের বিমান শিডিউল মিস করারও সুযোগ তৈরি হয়েছে। আবার টানেল দিয়ে যারা আনোয়ারা প্রান্তে যাবে তারাও যেতে পারছে না। সব মিলিয়ে মানুষ ও যানবাহনের জটলায় এক দুর্বিষহ পরিবেশ তৈরি হয়েছে টানেল জংশনে। নগরে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের। 

এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে উপ-কমিশনার (ট্রাফিক-বন্দর) কবির আহমেদ বলেন, ‘পতেঙ্গা নগরবাসীর সবচেয়ে বড় বিনোদন স্পট। ছুটির দিনগুলোতে এই এলাকায় মানুষের উপচেপড়া ভিড় থাকে। কিন্তু এখানে গাড়ি পার্কিংয়ের কোনো জায়গা নেই এবং কোনো ফুটপাতও নেই। এতে মানুষ ও গাড়ি পাশাপাশি চলাচল করতে গিয়ে দীর্ঘ যানজট যেমন তৈরি হচ্ছে তেমনিভাবে দুর্ঘটনারও ঝুঁকি বাড়ছে।’

তাহলে এই অবস্থা থেকে মুক্তির পথ কী? 

পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় জংশন ডেভেলপমেন্টের কাজ করছে সিডিএ। আউটার রিং রোড ডেভেলপমেন্টের আওতায় জংশন ডেভেলপমেন্টে ২৭০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের প্রকৌশলী মেরাজুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখন যে ডিজাইনে কাজ করছি এতে কোনো ট্রাফিক পুলিশ লাগবে না। শুধু সড়ক নির্দেশনা অনুযায়ী গাড়ি চলাচল করবে।’ 

সেই ডিজাইনে কী রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এলিভেটেড এক্সপ্রেস ও নিচ দিয়ে যেসব ট্রাফিক শহর থেকে এসে যারা বিমানবন্দরমুখী যাবে তাদের জন্য অতিরিক্ত আরও দুটি লেন করা হচ্ছে। এ ছাড়া নৌ বাহিনীর ওয়েস্ট পয়েন্টের কাছে একটি ইউ লুপ থাকবে। যেখান থেকে গাড়িগুলো ঘুরে আবারও প্রয়োজনে টানেলের দিকে যেতে পারবে এবং একই পয়েন্ট থেকে একটি ওভারপাস থাকবে যা দিয়ে গাড়িগুলো আউটার রিং রোড হয়ে ফৌজদারহাটের দিকে যেতে পারবে। এ ছাড়া টানেল থেকে বের হয়ে যেসব গাড়ি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করে শহরের দিকে যেতে চায় সেগুলোর জন্য একটি রিং আকারের ওভারপাস ও নিচ দিয়ে আরেকটা আন্ডারপাস নির্মিত হচ্ছে।

নতুন এই ডিজাইন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিডিএর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যমান ডিজাইনে টানেলের মুখে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, আউটার রিং রোড ও টানেল দিয়ে ট্রাফিক এসে জড়ো হয় পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায়। অধিক ট্রাফিকের কারণে বিমানবন্দরমুখী যাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগামীতে বে টার্মিনাল চালু হলে এই এলাকায় আরও ট্রাফিক বাড়বে। তাই নতুন ডিজাইনে যে জংশনটি নির্মিত হলে ট্রাফিক পুলিশ ছাড়াই পুরো এলাকায় গাড়ি সহজে চলাচল করতে পারবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আউটার রিং রোড প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘আমরা এখানে গ্রেড সেপারেশন, ওভারপাস, আন্ডারপাস প্রভৃতির মাধ্যমে ট্রাফিকগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছি। এ ছাড়া পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার জন্য চার লেনের একটি রোড ছাড়াও তিনটি ফুট ওভার ব্রিজ ও দুটি পার্কিং স্পেস নির্মাণ করছি। এগুলো হয়ে গেলে পুরো এলাকার ট্রাফিক নিয়ে আর ভাবতে হবে না।’

কিন্তু আপনারা টানেল চালু হওয়ার আগে এই জংশন নিয়ে ভাবেননি কেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তখনো বলেছিলাম যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, টানেল ও আউটার রিং রোড দিয়ে অনেক ট্রাফিক পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে আসবে। কিন্তু তখন সবগুলো প্যারামিটার নিয়ে সমন্বিত নকশা তৈরি করা হয়নি। এখন আমরা সব সংস্থার সঙ্গে কথা বলে পৃথক প্রকল্পের মাধ্যমে এই জংশনটি ডেভেলপমেন্ট করছি। ২৭০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অধীনে ইপিজেডের সঙ্গে আউটার রিং রোডের সংযুক্তিও দেওয়া হবে।’ 

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম নগরের সবচেয়ে বৃহৎ পর্যটন স্পট পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। একই পয়েন্টে এসে জড়ো হয়েছে ৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার আউটার রিং রোড এবং এই দুইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প। এই রোড দিয়ে আবার চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরেও যেতে হয় যাত্রীদের। সব মিলিয়ে টানেলের জংশনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিন প্রকল্পের আর এই জায়গায় রাস্তার ওপর পার্কিং ইজারা দিতে জেলা প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। সিডিএ এই এলাকায় মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় ডেভেলপমেন্ট করছে। সব সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রকল্প নেওয়া না হলে তিন প্রকল্পে বিনিয়োগকৃত ১৮ হাজার ৩১১ কোটি টাকার প্রকল্প প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বর্তমানে আউটার রিং রোড প্রকল্পের আওতায় টানেল জংশন ডেভেলপমেন্টের জন্য নেওয়া হয়েছে ২৭০ কোটি টাকার নতুন এই প্রকল্পটি।