নিজেরা হানাহানি বন্ধ না করলে দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে

‘নিজেরা কাদা ছোড়াছুড়ি বা মারামারি-কাটাকাটি করলে’ দেশ এবং জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে বলে সতর্ক করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্যকালে তিনি এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।

সেনাপ্রধান বলেন, ‘যদি নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ না করতে পারেন, নিজেরা যদি কাদা ছোড়াছুড়ি করেন, মারামারি-কাটাকাটি করেন এই দেশ এবং জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে।’

এর আগে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আপনারা কিছু মনে করবেন না। আজ আমি পরিষ্কার করে কথা বলতে চাই। আপনাদের সবার হয়তো ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস করেন। আমার এটা যদি আপনারা গ্রহণ করেন, আপনারা লাভবান হবেন। কোনো ক্ষতি হবে না দেশের। আমার অন্য কোনো আকাক্সক্ষা নেই, আমার একটাই আকাক্সক্ষা দেশ এবং জাতিটাকে একটা সুন্দর জায়গায় রেখে ছুটি নেওয়া। আই হ্যাড অ্যানাফ। ওয়াজ লাস্ট সেভেন, এইট মানথস আই হ্যাড অ্যানাফ। আমি চাই, দেশ এবং জাতিকে একটা সুন্দর জায়গায় রেখে আমরা সেনানিবাসে ফেরত আসব।’

জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আর একটা জরুরি বিষয়, যেটা আমি ভাবলাম যে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করি। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপের পেছনে কিছু কারণ আছে। প্রথম কারণটা হচ্ছে যে, আমরা নিজেরা হানাহানির মধ্যে ব্যস্ত। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বিষোদগারে ব্যস্ত। এটা একটা চমৎকার সুযোগ অপরাধীদের জন্য। যেহেতু আমরা একটা অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে বিরাজ করছি। তারা খুব ভালোভাবেই জানে, এই সময় যদি এই সমস্ত অপরাধ করা যায়, তাহলে এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। সে কারণে এই অপরাধগুলো হচ্ছে। আমরা যদি সংগঠিত থাকি, একত্রে থাকি, তাহলে অবশ্যই এটা সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।’ 

সেনাপ্রধান বলেন, ‘পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই এগুলো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে অতীতে। খারাপ কাজের সঙ্গে অসংখ্য ভালো কাজ করেছে। আজ যে দেশের স্থিতিশীলতা, দেশটাকে যে এত বছর স্থিতিশীল রাখা হয়েছে এটার কারণ হচ্ছে এই সশস্ত্র বাহিনীর বহু সেনা সদস্য, সিভিলিয়ান সবাই মিলে এই অর্গানাইজেশনগুলোকে এফেক্টিভ রেখেছে। সেই জন্য আজ এতদিন ধরে আমরা একটা সুন্দর পরিবেশ পেয়েছি। এরমধ্যে যারা কাজ করেছে যদি অপরাধ করে থাকে সেটার শাস্তি হবে। অবশ্যই শাস্তি হতে হবে। না হলে এই জিনিস আবার ঘটবে। আমরা সেটাকে বন্ধ করতে চাই চিরতরে। কিন্তু তার আগে মনে রাখতে হবে আমরা এমনভাবে কাজটা করব এই সমস্ত অর্গানাইজেশনগুলো যেন আন্ডারমাইন্ড না হয়।’ ‘সেনাপ্রধান বলেন, ‘আজ পুলিশ সদস্য কাজ করছে না, একটা বড় কারণ হচ্ছে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা, অনেকে জেলে। র‌্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই প্যানিকড। বিভিন্ন দোষারোপ, গুম, খুন ইত্যাদির তদন্ত চলছে। অবশ্যই তদন্ত হবে। দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এমনভাবে কাজটা করতে হবে যেন এই অর্গানাইজেশনগুলো আন্ডারমাইন্ড না হয়। এই অর্গানাইজেশনগুলোকে যদি আন্ডারমাইন্ড করে আপনারা মনে করেন যে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিরাজ করবে, সবাই শান্তিতে থাকবেন, এটা হবে না, সেটা সম্ভব না। আমি আপনাদের পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব শুধু সেনাবাহিনীর না। দুই লাখ পুলিশ আছে, বিজিবি আছে, র‌্যাব আছে, আনসার, ভিডিপি আছে। আমার আছে ৩০ হাজার সৈন্য। এদের আমি এই যে একটা বিরাট ভয়েড আমি এই ৩০ হাজার সৈন্য দিয়ে কীভাবে এটা পূরণ করব। ৩০ হাজার থাকে আবার ৩০ হাজার চলে যায় ক্যান্টনমেন্টে আরও ৩০ হাজার আসে। এটা দিয়ে আমরা দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখানে যে সমস্ত উচ্ছৃঙ্খল কাজ হয়েছে সেটা আমাদের নিজস্ব তৈরি। এটা আমাদের নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচার। আমরা নিজস্ব এইগুলো তৈরি করেছি। এই বিপরীতমুখী কাজ করলে দেশে কখনো শান্তিশৃঙ্খলা আসবে না। এই জিনিসটা আপনাদের মনে রাখতে হবে।’

সেনাপ্রধান বলেন, ‘তদন্ত কমিশন হচ্ছে আবার আরেকটা আমাদের। সর্বদা আমরা চেষ্টা করব তদন্ত কমিশনকে সহায়তা করতে। যে ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন হয় আমরা করব। আমরা দেশে একটা ফ্রি ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশনের দিকে ধাবিত হচ্ছি এবং তার আগে যে সমস্ত সংস্কার করা প্রয়োজন অবশ্যই সরকার সেদিকে খেয়াল করবে। আমি যতবারই ড. ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছি হি কমপ্লিটলি এগ্রিস উইথ মি। দেয়ার শুড বি ফ্রি ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন অ্যান্ড দ্যাট ইলেকশন শুড বি উইদিন ডিসেম্বর অর ক্লোজ টু দ্যাট। যেটা আমি প্রথমেই বলেছিলাম যে ১৮ মাসের মধ্যেই একটা ইলেকশন। আমার মনে হয় যে সরকার সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। ড. ইউনূস যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই দেশটাকে ইউনাইটেড রাখতে। ওনাকে আমাদের সাহায্য করতে হবে, উনি যেন সফল হতে পারেন। সেদিকে আমরা সবাই চেষ্টা করব। আমরা একসঙ্গে ইনশাল্লাহ কাজ করে যাব।’

সেনাপ্রধান আরও বলেন, ‘আসেন আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারি-কাটাকাটি না করে ইউনাইট আওয়ারসেলভস। দেশ জাতি যেন একসঙ্গে থাকতে পারি, সেদিকে আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের মধ্যে মতের বিরোধ থাকতে পারে, চিন্তাচেতনার বিরোধ থাকতে পারে কিন্তু দিনশেষে আমরা সবাই দেশ এবং জাতির দিকে খেয়াল করে যেন এক থাকতে পারি। তাহলেই এই দেশটা উন্নত হবে। এই দেশটা সঠিক পথে পরিচালিত হবে। না হলে আমরা আরও সমস্যার মধ্যে পড়ে যাব। বিশ্বাস করেন। উই ডোন্ট ওয়ান্ট টু হেড, ওইদিকে আমরা যেতে চাই না।’

সেনাপ্রধান বলেন, ‘এই দেশ আমাদের সবার, আমরা সবাই সুখে-শান্তিতে থাকতে চাই। আমরা চাই না হানাহানি-কাটাকাটি-মারামারি। সেই উদ্দেশ্যে আমি কাজ করে যাচ্ছি, আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের সেনাবাহিনীর প্রতি আক্রমণ করবেন না। একটা কমন জিনিস আমি দেখতে পাচ্ছি, সেনাবাহিনী এবং সেনাপ্রধানের প্রতি বিদ্বেষ কারও কারও, কী কারণে আজ পর্যন্ত আমি এটা খুঁজে পাইনি। আমরা হচ্ছি একমাত্র ফোর্স যেটা আপনাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। দাঁড়িয়ে আছি প্ল্যাটফর্মে, অফকোর্স নেভি অ্যান্ড এয়ারফোর্স অল। উই অল। আমাদের সাহায্য করেন। আমাদের আক্রমণ করবেন না। আমাদের অনুপ্রাণিত করেন। আমাদের উপদেশ দেন।’

‘কোনো একটা সমস্যা হয়ে গেলে আমি জেনারেল নুরুদ্দিন স্যারের (নুরুদ্দিন খান) শরণাপন্ন হই এবং উনি আমাদের পরামর্শ দেন।’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সিনিয়র জেনারেলরা আমাকে উপদেশ দেন। আমি সবার কাছে শরণাপন্ন হই। আমাদের প্রতি আক্রমণ করবেন না। উপদেশ দেন, আমরা অবশ্যই ভালো উপদেশ গ্রহণ করব। আমরা একসঙ্গে থাকতে চাই এবং দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’

সবশেষ তিনি বলেন, ‘একটু মন খুলেই কথা বললাম। এতদিন যে কথা মনের মধ্যে ছিল, সব সময় প্রকাশ করতে পারি না। প্রকাশ করাও যায় না। আজ প্রকাশ করে ফেললাম। এবং আমি জানি না, এখানে অনেক মিডিয়া আছে। মিডিয়া না থাকলেই মনে হয় ভালো হতো। সবার সামনে আমি আমার মনের কথাটা প্রকাশ করে ফেললাম। কাউকে যদি দুঃখ দিয়ে থাকি আমাকে ক্ষমা করবেন। চলেন, আমরা একসঙ্গে কাজ করি। দেশ এবং জাতিকে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাই। এখানেই আমাদের ছেলেমেয়েরা বাস করবে। তাদের জন্য আমরা এমন কোনো জায়গা রেখে না যাই যেখানে হানাহানি-কাটাকাটি-মারামারি হবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এদেশে তাহলে থাকতে পারবে না।