বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দলের নাম ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ ঠিক হয়েছে। তবে দলটির নাম ইংরেজিতে ন্যাশনাল পাবলিক পার্টি ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানা গেছে। আজ শুক্রবার বেলা ৩টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করবে। দলটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র আহ্বায়ক পদে থাকছেন নাহিদ ইসলাম আর সদস্য সচিব হিসেবে থাকছেন আখতার হোসেন। দিনটিকে ঘিরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ব্যাপক জনসমাগমের প্রস্তুতি রয়েছে।
জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতৃস্থানীয়রা বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) ব্যাপক জনসমাবেশে নতুন দল আত্মপ্রকাশ করবে। দলটির নাম ইংরেজিতে ন্যাশনাল পাবলিক পার্টি, বাংলায় ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ হতে পারে। তা ছাড়া দলটি ‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’, ‘হাতি’, ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ ও ‘শাপলা’, ‘ইলিশ’ এই পাঁচটি থেকে যেকোনো একটি প্রতীকে নিবন্ধন নিয়ে আগামী নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে অংশ নিতে পারে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, শুরুতে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র ১৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হবে। পরে সেই কমিটিকে বর্ধিত করে ৩০০ সদস্যের করা হতে পারে। এ সময় জাতীয় নাগরিক কমিটির উপজেলা পর্যায়ের ৩২৮টি কমিটি থেকে নতুন রাজনৈতিক দলে যুক্ত হবেন নেতারা। শুরুতে আহ্বায়ক, সদস্য সচিব, মুখ্য সংগঠক এবং মুখপাত্র এই চারটিকে শীর্ষ পদ হিসেবে রেখে দল গঠনের কথা ভাবা হলেও, এর সঙ্গে আরও পাঁচটি পদ যুক্ত হবে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে ৭০ জনকে বাছাইসহ শীর্ষ ৯টি পদের জন্য ৯টি নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, হাসনাত আবদুল্লাহকে দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সারজিস আলমকে উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া শীর্ষ পদগুলোয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখপাত্র সামান্তা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, তাসনিম জারা ও আরিফুল ইসলাম আদীব, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদ থাকবেন বলে জানা গেছে।
এর আগে আসন্ন দলটির কমিটিতে থাকবেন না বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ ও যুগ্ম সদস্য সচিব রাফে সালমান রিফাত। ফেসবুক পোস্টে রাফে সালমান রিফাত বলেন, ‘২৮ তারিখে ঘোষিত হতে যাওয়া নতুন রাজনৈতিক দলে আমি থাকছি না। তবে, আমার রাজনৈতিক পথচলা থেমে থাকবে না। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার যে জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তাতে শর্ট টার্মে খুব ভালো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা রাখি না আপাতত। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখি, রাজনীতি একটা লম্বা রেস। ধৈর্য নিয়ে লম্বা সময়ের জন্যই আমাদের এই রেসে টিকে থাকতে হবে। আমরা নতুন সেই বাংলাদেশের প্রত্যাশী, যেটা হবে সত্যিকার অর্থেই ডেমোক্রেটিক, ইনক্লুসিভ, বৈষম্যহীন এবং আধিপত্যমুক্ত। ঐক্যবদ্ধতা ও মধ্যম পন্থাই হবে আমাদের শক্তি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের জিহাদ চলবে। আঞ্চলিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধেও আমাদের লড়াই চলবে। বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আমরা জান দিয়ে লড়ব। নতুন দলের জন্য দোয়া এবং শুভকামনা রইল।’
নতুন দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই অনুষ্ঠানের মঞ্চসহ সার্বিক প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অনুমতি নেওয়া হয়েছে। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের।
এদিকে মঙ্গলবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাহিদ ইসলাম। গতকাল দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে তার পদত্যাগের বিষয়টি জানানো হয়। এর আগে মাসখানেক ধরেই নাহিদ ইসলামের পদত্যাগের গুঞ্জন ছিল। নাহিদ ইসলামও বেশ কয়েকবার জানিয়েছিলেন পদত্যাগ করেই তিনি নতুন দলে যোগ দেবেন। এ কারণেই রাষ্ট্রীয় পদ ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।
পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমি মনে করেছি, সরকারে থাকার চেয়ে রাজপথে থাকা বেশি প্রয়োজন, তাই পদত্যাগ করেছি।’
এর আগে গত মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলা মোটরে অবস্থিত রূপায়ণ টাওয়ারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘ছাত্রদের রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ নিয়ে মানুষের যে অপেক্ষা, আজ তার অবসান হচ্ছে।’
নতুন দলে বাংলাদেশে প্রচলিত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ এবং দলীয় স্বার্থের বাইরে একমাত্র দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে যাচ্ছে।’
নতুন দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দেশের মানুষকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে সদস্য সচিব আখতার হোসেন এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমরা রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বলেছি। ডান-বামের ও মধ্যম পন্থার কথা বলেছি। মানুষের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলেছি। আমরা আশাবাদী, আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে সব-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গের মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে।’
যাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে ছাত্ররা : নতুন দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সব উপদেষ্টাকে। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াত থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা প্রায় সব দলকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ঢাকায় নিযুক্ত ৫১ দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, কূটনীতিকদের।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যমুনায় গিয়ে সরকারপ্রধানের হাতে আমন্ত্রণপত্র তুলে দেন এনসিপির নেতারা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদের নেতৃত্বে এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম ও জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সাইফ মুস্তাফিজ প্রধান।
নেতারা জানিয়েছেন, নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে ৩৬টি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে নাগরিক কমিটি। তবে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শরিক ১৪ দলের কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।