জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় ৭ বছরের কারাদ-ের ও ১০ লাখ টাকা অর্থদ-ের সাজা থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায় সর্বোচ্চ আদালতে বহাল রয়েছে। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষের করা পৃথক আপিল খারিজ করে গতকাল সোমবার আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের বেঞ্চ এ রায় দেয়।
এর আগে গত বছরের ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ খালেদা জিয়া, তার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর সাবেক একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম ও অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খানকে খালাস দেয়। এ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হারিছ চৌধুরী ইতিমধ্যে মারা গেছেন।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৭ বছরে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ৩০টির বেশি মামলা হয়। তবে, সাজা হয় দুটি মামলায়। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ১০ বছর এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তার সাত বছর কারাদন্ডাদেশ হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গত ১৫ জানুয়ারি আপিল শুনানির পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাকে খালাস দেয়। গতকাল জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আপিল বিভাগের রায়ে খালাস পেলেন তিনি। ফলে দুই মামলায় ১৭ বছরের কারাদন্ড থেকে তিনি সাজামুক্ত হলেন। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচারের পর্যায়ে থাকা সব মামলায় খালাস কিংবা অব্যাহতি পেলেন তিনি। মামলা, সাজা, উন্নত চিকিৎসা নিয়ে কয়েক বছর ধরে নানা ঘটনা ও নাটকীয়তার পর গত ৮ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান বিএনপির চেয়ারপারসন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আপিল বিভাগে দুদকের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী আসিফ হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। খালেদা জিয়ার পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, এম বদরুদ্দোজা বাদল, মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, আইনজীবী আমিনুল ইসলাম প্রমুখ শুনানি করেন।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুনানিতে আমাদের বক্তব্য ছিল এটি একটি প্রাইভেট ট্রাস্ট। সরকার বা রাষ্ট্র এখানে ইনভলবড্ নয়। তারপরও আওয়ামী লীগ সরকার খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্য দুদককে ব্যবহার করে এ মামলা করেছিল। এ মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণ করা যায়নি, যে কথা হাইকোর্ট তার রায়ে বলেছেন। আপিল বিভাগ সে রায় বহাল রেখেছেন।’ তিনি বলেন, ‘যদি মামলাটা সত্য হতো তাহলে বিচার করতে এতদিন লাগত না। মামলাটি মিথ্যা বলেই বিচার করতে সরকার অনেক দিন সময় নিয়েছে। যারা বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার কারিগর ছিলেন তারা এখন পলাতক।’ ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে কুমিল্লায় (বাসে বোমা হামলা) একটিসহ তিনটি মামলা অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। এগুলো এখনো বিচারের পর্যায়ে আসেনি। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া এখন সাজামুক্ত। আগামী নির্বাচনে তার অংশ নিতে আর কোনো বাধা নেই।’
ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় এবং তখনই আমরা মামলাটি বিচারের পর্যায়ে আছে বলে থাকি। এ হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে বিচারাধীন বা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ের কোনো মামলা এখন নেই। আজকের রায়ের পর তিনি সাজামুক্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অন্যায়ভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রভাব খাটিয়ে বিচারের গতিকে অন্যদিকে প্রবাহিত করা হয়। যদি বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারত তাহলে অবশ্যই এ ধরনের মামলায় সাজা তো দূরে থাক অভিযোগ গঠনও হতো না।’
যেভাবে মামলা নিষ্পত্তি :
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের তিন কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় এ মামলাটি হয়। তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে খালেদা জিয়াসহ চার জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালত খালেদা জিয়াকে ৭ বছর কারাদন্ড ও ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড দেয়। অপর তিন আসামিকেও একই সাজা দেয় আদালত। পরে বিচারিক আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়া। একই বছরের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ খালেদা জিয়ার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে তার ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতের দেওয়া অর্থদ-ের আদেশ স্থগিত করে। এর ধারাবাহিকতায় মামলাটি হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে শুনানির পর্যায়ে আসে এবং আওয়ামী লীগ আমলে মামলা দায়েরের ১৪ বছরের বেশি সময় পর সর্বোচ্চ আদালতে এটির নিষ্পত্তি হলো।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছর (হাইকোর্টে সাজা বেড়ে ১০ বছর) কারাদ-াদেশের পর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২০ সালে মার্চে করোনার প্রকোপের সময় সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত হলে তিনি কারাবাস থেকে মুক্তি পান। এর পর ছয় মাস পর পর তার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। গত বছরের ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ১০ বছর ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা মওকুফ হয়। তবে, দুই মামলাতেই আপিল শুনানির উদ্যোগ নেন বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা। যুক্তিতে তারা বলেন, যেহেতু আইন খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়েছে তাই আইনিভাবেই তিনি সাজামুক্ত হতে চান। এর ধারাবাহিকতায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আপিলের পেপারবুক তৈরি জন্য খালেদা জিয়ার আবেদন গত বছরের ৩ নভেম্বর মঞ্জুর করে হাইকোর্ট।
সাজামুক্ত খালেদা জিয়া :
খালেদা জিয়ার মামলাসংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ, দুর্নীতি, নাশকতা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, মানহানি, হত্যা চেষ্টার অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের আদালতে অন্তত ৩৭টি মামলা হয়। গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রদ্রোহ, নাশকতাসহ ২৯টি মামলা উচ্চ আদালত কিংবা অধস্তন আদালতে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বাকি মামলাগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লায় বাসে বোমা হামলার মামলাসহ তিনটি মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।
নাইকো মামলায় খালেদা জিয়াকে খালাস দেয় অধস্তন আদালত। আলোচিত বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াসহ দলের তিন শীর্ষ নেতাকে গত বছরের ২৭ নভেম্বর অব্যাহতি দিয়ে অভিযোগ গঠন করে ঢাকার একটি আদালত। এর আগে গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় গত বছরের ২৪ অক্টোবর খালেদা জিয়াসহ দলের তিন নেতাকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ গঠন করে সংশ্লিষ্ট আদালত। গত ছয় মাসে বিভিন্ন কর্মদিবসে খালেদা জিয়ার মোট ২৮টি মামলা অধস্তন ও উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে হত্যার অভিযোগে দুটি, দুর্নীতির অভিযোগে করা ছয়টি, রাষ্ট্রদ্রোহের একটি, নাশকতার ১১টি, মানহানির ছয়টি, হত্যা চেষ্টার একটি এবং রহিত হওয়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে একটি মামলা ছিল।