ইউরোপের মতাদর্শিক স্থানান্তরের ছবি

ইউরোপের ডানপন্থার বিপদ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে বিদ্যমান এ  বাস্তবতা বিগত এক দশকে ধারাবাহিকভাবে শানিত হয়েছে। ইউরোপ জুড়ে রক্ষণশীলতার জোয়ার সর্বশেষ টের পাওয়া গিয়েছিল গত বছরের মাঝামাঝিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচনে, যখন ডানপন্থি দলগুলো অভিন্ন ইউরোপের আইনসভায় বিপুল শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়। মহাদেশটির দেশগুলোর জাতীয় নির্বাচনগুলোয়ও রক্ষণশীলতা ও অতি-ডানপন্থার তাৎপর্যপূর্ণ বিকাশ লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এক সময় হাঙ্গেরি, ইউরোপে ডানপন্থার প্রধানতম ক্ষমতার মঞ্চ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্স, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলোয় রক্ষণশীল ও অতি-ডানপন্থি দলগুলো নির্বাচনী রাজনীতিতে ব্যাপক প্রাধান্য বিস্তার করেছে। এবার ইউরোপের প্রধান অর্থনীতির দেশ জার্মানিতে অতি-ডান মতাদর্শের দল ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)’ দ্বিতীয় শক্তিধর দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অভিবাসন বিরোধিতা, নাৎসি মতাদর্শের প্রতি দুর্বলতা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নীতি বিষয়ে আপত্তি, ইউক্রেন যুদ্ধে বার্লিনের সহযোগিতার বিরোধিতাসহ নানা প্রেক্ষাপটে জার্মানদের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে তারা। এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গোটা ইউরোপের মতাদর্শিক স্থানান্তরের গতিপ্রকৃতি স্পষ্ট হয়।

জার্মানির জাতীয় নির্বাচনের ফল মতাদর্শিক রূপান্তরের পরিপূরক প্রতিচ্ছবি উন্মোচন করল। বর্তমানের বাস্তবতা হলো ইউরোপ ডানের বিপদ থেকে চরম ডানপন্থার ঝুঁকিকে আলিঙ্গন করতে চলেছে; জার্মানির নির্বাচনী ফল এরই প্রমাণ। ইউরোপের চিন্তকরা অভিবাসন, মতপ্রকাশ, মানবাধিকার ও বিদেশনীতিকে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করেন; যা ক্রমশ বলীয়ান হওয়া অতি-ডান মতাদর্শ বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো চরম ডানপন্থি নেতাদের রক্ষণশীল নীতি ইউরোপের নিরাপত্তা চিন্তা, ট্রান্স-আটলান্টিক ঐক্য ধরে রাখা, রুশ-চীন অক্ষ মোকাবিলা এবং অনুশাসন-ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার (রুলস-বেজড ওয়ার্ল্ড অর্ডার) প্রশ্নে তাদের পশ্চিমা ঐক্যকে চূড়ান্ত হুমকির মুখে নিয়ে যেতে পারে। যেমন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য শান্তিচুক্তির প্রচেষ্টা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে নিজস্ব এজেন্ডায় পরিণত করেছেন, তা যেন ইউরোপীয় নেতাদের অসহায় করে তুলছে। সর্বশেষ ওভাল অফিসে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্প ও তার সহযোগী কর্মকর্তাদের বাক্যবিনিময়ের পরবর্তী প্রেক্ষাপট ইউরোপের নেতৃত্বকে আরও বেশি হতাশায় নিমজ্জিত করেছে। এদিকে, ইউরোপের রাজনীতিতে যেসব গোষ্ঠী প্রথাগত ইউরোপীয় মূল্যবোধের বাইরে ফ্যাসিবাদী-নাৎসিবাদী অতীত এবং ডানপন্থার প্রতি আকুল; তাদের রুশপন্থি বলে দাগিয়ে দেওয়ার চল রয়েছে। জার্মানির রাজনীতিতে অতি-ডানদের ‘রুশপন্থি’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা দৃশ্যমান। আবার ডান নেতাদের একঘরে করার নীতিও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবেই অতি-ডানের এই বল্গাহারা গতি থামানো যাচ্ছে না।

মধ্য ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির জাতীয় নির্বাচনে ২০ শতাংশের ওপর ভোট দখল করে এএফডি। কেন্দ্রীয় আইনসভায় ৬৩০ আসনের মধ্যে ২০৮ আসনে পেয়ে শীর্ষে রয়েছে ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ)। আর ১৫২ আসন দখল করে দ্বিতীয় অবস্থানে এএফডি। জার্মানির সামাজিক পরিসরে অভিবাসনবিরোধী মনোভাবকে একদম রাজনীতির হিসাব-নিকাশের কেন্দ্রে তুলে আনতে ক্রমাগত বিদ্বেষমূলক অবস্থানে দেখা গেছে তাদের। জার্মানিতে নাৎসি মতাদর্শ নিয়ে যে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক পরিমণ্ডল বলবৎ ছিল, তা এএফডির রাজনীতিকরা ভাঙার সাহস দেখিয়ে যাচ্ছেন এবং ভাঙছেনও। বিষয়টিকে একইসঙ্গে ইতালিতে ফ্যাসিবাদের প্রতি নতুন করে তৈরি হওয়া মোহের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। সেখানে ফ্যাসিবাদী ঐতিহ্যকে নতুন করে সমাদর করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি ইতালির ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা রয়েছে। হাঙ্গেরিতে ভিক্তর ওরবানের মতো নেতা একা একাই ইইউ মূল্যবোধের বাইরের বিরুদ্ধে স্বর চড়িয়েছেন। ফ্রান্সে গত বছর প্রথম দফার আইনসভা নির্বাচনে অতি-ডানদের শক্তিবৃদ্ধির নমুনা দেখা গেছে। নেদারল্যান্ডসে গত বছর নির্বাচনে ‘লিটল ট্রাম্প’-খ্যাত গির্ট উইলডার্সের দল সর্বাধিক আসন লাভ করে। জার্মানিতে এএফডির সাফল্য অনেকটা বৃত্তপূরণের মতো। এর মধ্য দিয়ে দেখা গেল যে ইউরোপের পরাশক্তিদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যারা একাধারে বৈশ্বিকভাবেও শক্তিধর দেশ প্রগতির ঝাণ্ডাধারীরা কোণঠাসা।

নির্বাচনের ফলের পর সিডিইউ নেতা ফ্রেডরিখ মেৎজ ঘোষণা দিয়েছেন, তারা এএফডির সঙ্গে কোনো ক্ষমতার দেনদরবার করবেন না। কিন্তু ওলফ শলৎজের সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে সিডিইউ আইনসভায় এএফডির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। অর্থাৎ এএফডির ভোট শতাংশ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে মূল ধারার রাজনীতিকদের ভূমিকা রয়েছে। জার্মান রাজনীতিতে এএফডির বয়স মেরেকেটে ১০ বছরের আশপাশে। এই সময়ের মধ্যে তারা রাজনীতির প্রান্তসীমা থেকে কেন্দ্রে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে জার্মানির অঙ্গরাজ্য-স্তরের নির্বাচনে তারা সাফল্যের জানান দেয়। এবার যেন সেই সাফল্য যোজন যোজন বাড়িয়ে নিল তারা; যার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ দলটি এত বিপুল সাফল্যের দেখা পেল। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে ২০২১ সালের তুলনায় এবার তারা তাদের ভোটের হার দ্বিগুণ করতে সমর্থ হয়েছে। এ মুহূর্তে বার্লিনের ক্ষমতার রাশ সিডিইউ নেতৃত্বাধীন জোটের হাতে; অন্যদিকে বিরোধী রাজনীতির পরিসরটুকুর নিয়ন্ত্রণ থাকছে এএফডির কাছে। বিদায়ী চ্যান্সেলর শলৎজের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসপিডি) নেতৃত্বাধীন জোট এবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। নির্বাচনে তারা ১৬ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে চলে গিয়েছে। এখন সিডিইউ নেতৃত্বাধীন জোট নতুন সরকার গঠন করতে অবধারিতভাবে বর্তমান ক্ষমতাসীন এসপিডির সঙ্গে জোট বাঁধবেন। দুই শিবিরের তরফ থেকে এ সংক্রান্ত ইতিবাচক বার্তা মিলেছে। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে অভিবাসীসমৃদ্ধ সমাজের বৈচিত্র্যের প্রশ্নে যেসব বাম, মধ্যবাম ও উদার শক্তিগুলো একাট্টা ছিল, তারা ভবিষ্যতে এএফডির বৃহৎ রাজনৈতিক প্রচারে আরও কোণঠাসা হতে পারে। বিশেষ করে ‘ডানপন্থি’ ছাতার তলে সমবেত সব রাজনৈতিক শক্তিই অভিবাসনসহ নানা ইস্যুতে রক্ষণশীল। সেক্ষত্রে এএফডি আগামী দিনের ডানপন্থি ছাতায় আবদ্ধ দলগুলোকে মতাদর্শিক আন্তরিকতা নিয়ে কাঠগড়ায় তুলতে পারে।

এদিকে, জার্মানির এই রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সমান্তরালে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ স্বাভাবিকভাবেই বদলে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। বিশেষত, পশ্চিমা অক্ষের অভ্যন্তরে টালমাটাল ভাব বিরাজ করছে। উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের মধ্যে উদ্ভূত আস্থার সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি, যার ফলে ইউরোপ এখন নিজেদের নিরাপত্তা ভাবনায় বদল আনার কথা চিন্তা করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ এমনই এক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্যে প্রবেশ করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে গোটা মহাদেশটির রক্ষাকর্তা হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। জার্মানি সেই পরিকল্পনার বড় অংশীদার ছিল। সেখানে অতি-ডান এএফডির ক্রমবিকাশ এবং মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্পের নীতির সংশ্লেষ ইউরোপকে একক নিরাপত্তাচিন্তায় ঠেলে দিতে পারে। ভবিষ্যৎ জার্মান চ্যান্সেলর মেৎজ সেই আভাস দিয়েছেন, যেখানে ট্রাম্পের নীতি-নিঃসৃত চিন্তাভাবনার সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়।  

হোয়াইট হাউজে দ্বিতীয় মেয়াদে পদার্পণ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন ইউক্রেন যুদ্ধের লাগাম টানতে ইউরোপীয় নেতাদের কার্যত এড়িয়ে চলা অব্যাহত রেখেছেন। সম্ভবত ট্রাম্পের প্রশাসন ইউরোপীয় নেতাদের বাইরে রেখে একটি টেকসই কিয়েভ-মস্কো চুক্তির রূপরেখা প্রণয়ন করবে। অথচ জার্মানি এ যুদ্ধে পশ্চিমা সমর্থন অব্যাহত রাখার বড় ক্রীড়নক। শুধু বার্লিন নয়, নিঃসন্দেহে ট্রাম্পই একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ট্রান্স-আটলান্টিক ঐক্যের প্রশ্নে যথেষ্ট অসংবেদনশীলতা প্রদর্শন করলেন। শুধু ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই যে ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক অভিষ্ট নির্দিষ্ট করেছেন, তা নয়; বরং ট্রাম্প ওয়াশিংটনের ইউরোপ ভাবনাতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে চাচ্ছেন। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ইউরোপের নিরাপত্তার দায়ভার বহন করার চিরাচরিত দায়ভার বহন করতে চায় না ট্রাম্প প্রশাসন। একটি সাক্ষাৎকারে সিডিইউ নেতা ফ্রেডেরিখ মের্জ জানান যে, তিনি ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে মহাদেশকে শক্তিশালী করা নিয়ে কথা বলেছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বাধীন হওয়া যায়। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা শুনে স্পষ্ট হয়েছে যে আমেরিকানরা, বিশেষত এই প্রশাসনের আমেরিকানরা, ইউরোপকে খুব একটা পাত্তা দেয় না।’

ইউরোপের নেতৃত্বকে এখন একটি ব্যবস্থা বা জোটগত পরিকল্পনা করতে হতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে বাইরে রেখে নিরাপত্তাভাবনা ভাবতে হতে পারে। সম্ভবত ন্যাটো সামরিক জোট আরও ভঙ্গুর দশায় পরিণত হতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজেদের তৈরিকৃত ইইউ কাঠামোয় সামরিক চিন্তাভাবনা যুক্ত করতে পারে।  সেক্ষেত্রে জার্মানি হতে পারে সে নতুন ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র।

লেখক: বিশ্লেষক ও অনুবাদক

musfikur.muzahid1993@gmail.com