নতুন আতঙ্ক জিকা ভাইরাস

দেশে নতুন এক আশঙ্কার নাম জিকা ভাইরাস। এক দশক আগে দেশে জিকা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর এই প্রথম গুচ্ছ সংক্রমণ বা ক্লাস্টার সংক্রমণের খবর জানা যাচ্ছে। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, ২০২৩ সালের সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করে ১ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে পাঁচজনের শরীরে এডিস মশাবাহিত এই ভাইরাসটি শনাক্ত করেছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) বিজ্ঞানীরা। আক্রান্তদের সবাই পুরুষ। তাদের মধ্যে তিনজন চাকরিজীবী ও দুজন শিক্ষার্থী। তিনজনের বয়স ২১-২৫ বছর এবং একজন করে ২৬-৩০ বছর ও ৪১-৪৫ বছর বয়সী। তারা গড়ে ২-৪ দিন জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন।

আইসিডিডিআর,বি আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু, এর উষ্ণ তাপমাত্রা এবং দীর্ঘ বর্ষাকাল এডিস মশার জন্য সর্বোত্তম প্রজনন পরিস্থিতি তৈরি করে। এ কারণে মশাবাহিত অনেক রোগ হয়। ডেঙ্গু ছাড়াও এখানে চিকুনগুনিয়া দেখা গিয়েছিল। এবার জিকা ভাইরাসও শনাক্ত হলো।

ক্লাস্টার বা গুচ্ছ সংক্রমণের বিষয়ে আইসিডিডিআর,বি জানিয়েছে যে, গবেষকরা ২০২৩ সালে তাদের ঢাকার রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে আসা রোগীদের নমুনা পরীক্ষা করেন। জ্বরে আক্রান্ত ১৫২ জন রোগীর শরীরে জিকার লক্ষণ রয়েছে এমন সন্দেহে তাদের নমুনা পিসিআরভিত্তিক পরীক্ষা করা হয়। এতে পাঁচজনের নমুনায় জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যায়। এই পাঁচজন রোগী এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করতেন। তাদের কেউ-ই দুই বছরের মধ্যে বিদেশ ভ্রমণ করেননি। এসব রোগী একই সময়ে পরীক্ষা করিয়েছেন। ফলে বিষয়টি একই সংক্রমণ চক্রের অংশ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

এই গবেষণা এ বছরের ৩০ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী প্লস-এ প্রকাশ হয়। আইসিডিডিআর,বির প্রকাশিত জার্নালটির রিভিউ দলে থাকা বিজ্ঞানী ডা. মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, দেশে যেহেতু জিকা ভাইরাস পাওয়া গেছে, তাই সামনের দিনগুলোতে আরও পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটা আমাদের কমিউনিটিতে আছে। যে রোগ থাকে, সেটা বেড়ে যেতেই পারে। প্লস পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণায় আইসিডিডিআর,বি বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে সংগ্রহ করা নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশি এই স্ট্রেইন এশিয়ান লাইনেজের অন্তর্গত। এতে আক্রান্ত হলে মাইক্রোসেফালি ও অন্যান্য স্নায়ুবিক রোগের মতো গুরুতর সংকট দেখা দিতে পারে। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে রোগের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। বাকি ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তির চামড়ায় লালচে দানার মতো ছোপ (র‌্যাশ) দেখা দেয়। সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখ লালচে হওয়া, মাংসপেশি ও গিঁটে ব্যথা থাকে। আক্রান্ত হওয়ার ৩ থেকে ১২ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়, থাকে ২ থেকে ৭ দিন।

আইইডিসিআর জানিয়েছে, জিকার কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, এর চিকিৎসা উপসর্গভিত্তিক। আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রাম নিতে হবে, প্রচুর পানি ও তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে, জ্বর ও ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ খেতে হবে। রোগীর অবস্থার অবনতি হলে কাছের সরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে বা রোগীকে ভর্তি করাতে হবে। জিকাসংক্রান্ত নতুন এই তথ্য আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে যেকোনো সংক্রামক রোগ অতিদ্রুত ভয়াবহ মহামারীতে রূপান্তরিত হতে পারে। আর এডিস মশা নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের ভোগান্তি হচ্ছে। ফলে, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ও রোগ নির্মূল জরুরি। জিকা ভাইরাসও ডেঙ্গুর মতো এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। অর্থাৎ এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে একসঙ্গে তিনটি রোগ ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।