আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক পথে ফিরবে?

নানা সমীকরণের মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতি। সাধারণভাবে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার রুটিন কর্মকা-ের বাইরে একটি গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল লক্ষ্যে তাদের পদক্ষেপকে সীমিত রাখে। কিন্তু এবারের সরকার যে সমস্ত সংস্কার কার্যক্রমকে সামনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে কোনোভাবেই এই সরকারকে শুধু অন্তর্বর্তীকালের রুটিন সরকারের মতো বিবেচনার সুযোগ নেই। অবশ্যই পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে। না হলে, রাজনীতি উল্টোপথে হাঁটতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন আরও জটিল এবং দুর্বিষহ হবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকান্ডে, আস্থা ও বিশ্বাস না রেখে উপায় নেই। দেশকে পূর্ণ স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে। কারণ দেশ বেশিদিন রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল থাকলে এক সময় দেখা যাবে, অর্থনৈতিকভাবে আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি। তখন বাংলাদেশের জনগণের জীবনমান হবে বর্তমান থেকে আরও শোচনীয়।

এটা ঠিক যে, সংবিধান থেকে শুরু করে জনপ্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নির্বাচন কমিশনসহ মৌলিক সংস্কারের ঘোষণাগুলো একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইতিমধ্যে বিচার বিভাগ, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, নির্বাচন কমিশনসহ অপরাপর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি একটি বিপ্লবী সরকারের যৌক্তিকতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ রকম পরিস্থিতিতে দেশের সর্বপ্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ কি চরম দুঃসময়কে অতিক্রম করে, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারবে? জনগণ কি এই দলকে প্রশ্নাতীতভাবে রাজনীতিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে দেবে? এমন ধরনের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর কানাডার ক্যালগেরির বাংলাদেশি কমিউনিটিতে আলোচনা-পর্যালোচনার ঝড় তুলেছে। বলা ভালো, যদিও এসব একেবারেই ব্যক্তিগত মতামত। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে রাজনীতি করে এগিয়ে আসা দল আওয়ামী লীগ। তবুও এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। এমন পরিণতিতে উপনীত হওয়ার কারণ অনুসন্ধান না করে, রাজনীতির মাঠ দখলে নেওয়ার পরিকল্পনাটি কাল্পনিক। কেউ বলছেন, নানামুখী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার আওয়ামী লীগ। যদি ধরেও নিই ঘটনাটি সত্যি, তবে গণভবনমুখী জনতার জোয়ার ঠেকাতে আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হলো কেন? কেনই বা ষড়যন্ত্রকারীদের বিপরীতে দলের নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি? দেশের ইতিহাসের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে দীর্ঘতম সময়ে দেশশাসনের পরও কেন শেখ হাসিনাকে দেশান্তরী হতে হলো? কেন আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মী, সমর্থকদের আজ পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে? উত্তর একটাই। আদর্শবান নেতাকর্মী দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। দুর্নীতিবাজ সুবিধাভোগীরা শাসন ক্ষমতাকে ব্যবহার করে লুটপাটের মাধ্যমে জনসম্পদ কুক্ষিগত করেছেন।

অন্যদিকে, সরকারপ্রধান তার আচার-আচরণের মাধ্যমে সামন্ত প্রভুদের মতো ঔদ্ধত্য দেখিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। অসহায় জনতা মুখ ফুটে প্রতিবাদ করতে না পারলেও, বছরের পর বছর হৃদয়ে প্রবল ঘৃণা এবং ক্রোধ লালন করেছে। যার মেম্বার হওয়ার ক্ষমতা নেই, সেই তিনি এমপি হয়ে গেছেন। যার ডাকে ৫০ জন মানুষ রাস্তায় আসবে না, এমন মানুষ মন্ত্রী হয়ে বুক ফুলিয়ে হেঁটেছেন। রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের কোনো ইতিহাস নেই, এমন লোক দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য হয়ে গেছেন। এর মানে রাজধানী থেকে তৃণমূল, রাজপথ থেকে গণভবন সর্বত্রই স্বৈরতান্ত্রিক দুর্বৃত্তায়নের দুষ্ট চক্র গড়ে উঠেছিল। এমন পরিস্থিতিতে ৫ আগস্টের উত্তাল তরঙ্গ, পর্বতশৃঙ্গের মতো দাঁড়িয়ে থাকা একটি দলকে সমতল ভূমিতে পরিণত করে দেয়। পেশাজীবী, লেখক, বুদ্ধিজীবীদের দূরে ঠেলে দুর্নীতিবাজ তোষণকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল দলটি। বরেণ্য অর্থনীতিবিদদের নাজেহাল করে, অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়েছিল অসৎ আর লুটেরা ব্যবসায়ীদের হাতে। টিকিট পেলেই এমপি! সেই নীতির আলোকে আদর্শহীন অর্থবিত্তের মালিকরা সংসদের কর্র্তৃত্ব নিয়েছেন। আমলারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে দুর্নীতি আর লুটপাটের এক অন্ধকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। তৈলবাজদের সমীহ নীতির প্রতিফলন হিসেবে শুধু বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনা নয়, ‘শেখ’ লেখা মার্বেল পাথরে গ্রাম থেকে শহর ছেয়ে গিয়েছিল।

ত্যাগী, আদর্শবান নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ইয়াবা বদি, সোনা আনার, স্মাগলার পিপলুর মতো লুটেরাদের-সহ আর্টিস্ট, সুরেলা-সুকণ্ঠী, গায়ক-নায়কদের সমাহারে ভরে উঠেছিল সংসদ। রাজনীতিবিদদের রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করার অশুভ পাঁয়তারায় দলীয় প্রধানের নীরব সম্মতি ছিল আত্মঘাতী। দলের একটি বড় অংশ মনেপ্রাণে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা কেন্দ্রের বাইরে থাকাই নিরাপদ মনে করেছিল।  দলীয় পদ-পদবি, নমিনেশন বাণিজ্য, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদায়নে স্বজনপ্রীতি আর টাকার খেলার মতো মরণ নেশায় মেতে উঠেছিল আওয়ামী লীগ। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল লন্ডন-কানাডা-সিঙ্গাপুর-দুবাই। সমালোচনা করলেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা আর গুম-খুনের হুমকি! এমন তুঘলকি কারবার পৃথিবীর কোন দেশে আছে? আমলা-নির্ভর গণতন্ত্রে জনগণ শুধু বিক্ষুব্ধই হয়নি, বঞ্চিতও হয়েছে। এর ফলে একমাত্র সাধারণ জনগণ নয়, দলের নিবেদিতপ্রাণ আদর্শিক নেতাকর্মীরাও বিষয়গুলো ভালোভাবে নেননি। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেলের মতো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প যে গণতন্ত্রের বিকল্প নয়, সেটি নিয়ে ভাবনার অবকাশ আওয়ামী লীগ পায়নি। গণভবন থেকে উপজেলার শীর্ষ পদে বসা মানুষগুলো বুঝতে না পারলেও, তৃণমূলের আদর্শিক নেতাকর্মীরা বুঝতে পেরেছিলেন, দুর্দিন বেশি দূরে নয়। এমপি-মন্ত্রীদের অনেকেই কারাগারে। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। শীর্ষ নেতৃত্ব দেশছাড়া। আর তার আত্মীয়স্বজন নিরাপদে বিদেশে। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে ভূলুণ্ঠিত করার দায় কার? আদর্শিক বিরোধীরা সুযোগ নেবেন, সেটি অপ্রত্যাশিত নয়। একটি সরকারের বিরুদ্ধে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র সবসময় থাকে। ইতিহাসের দীর্ঘসময়ের একটি সরকার আসলে বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। আদর্শের কথা বলে রাষ্ট্রকে ঝুঁকিতে ফেলার দায় কি আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে? এ নিয়ে দেশবাসীর মাথাব্যথা কতটুকু, বর্তমানই তার প্রমাণ। প্রশ্ন হচ্ছে, এই দল কি আদৌ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরবে!

লেখক : উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক ক্যালগেরি, কানাডা

mahssan8691@gmail.com