যখন কোনো পণ্যের চাহিদা বাড়ে কিন্তু সেই অনুপাতে তার উৎপাদন অথবা জোগান বাড়ে না বা অপরিবর্তিত থাকে, তখন সেই পণ্যের দাম বাড়ে। স্বাভাবিকভাবেই মূল্যস্ফীতি হলে খাদ্যদ্রব্য, পোশাক, বাড়ি ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসের দাম বেড়ে যায়। মানুষকে এসব সেবা বা পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। আয়ের পরিবর্তন না হলে তখন মানুষ এগুলো প্রয়োজনের চেয়ে কম কিনতে বাধ্য হন। তাদের সঞ্চয় কমে এবং অন্যান্য খাতের খরচ কমিয়ে ফেলতে হয়। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সীমিত এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর। কারণ জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে অনেক দ্রব্য তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।
কোনো দেশই দাবি করতে পারবে না যে, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হচ্ছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। বর্তমানে মূল্যস্ফীতিই সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সরকার নানাভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ। আর সার্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে ১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তবে বেড়েছে সার্বিক খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি। বিবিএসের তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে, গত জানুয়ারি মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। বলার অপেক্ষা রাখে না, যদি ধীরে ধীরে এটি কমে আসে তাহলে জনজীবনে স্বস্তি মিলবে। খাদ্যপণ্যে যে মূল্যস্ফীতি কমেছে, তার প্রতিফলন বাজারেও দেখা গেছে। সাধারণত অন্যান্য বছর রোজার কিছুদিন আগে ও রোজা শুরুর পরপর বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এবার তেমন ঘটনা চোখে পড়েনি। মূল্যস্ফীতি হ্রাসের এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী জুন-জুলাইয়ের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সাত শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
আমদানিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়ে যায় মূল্যস্ফীতি। যদি কাঁচামাল বা উৎপাদন সম্পর্কিত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায় তাহলে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির জন্য চারটি কারণ দেখিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি দেখিয়েছে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির জন্য জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, দুর্বল মুদ্রানীতি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ও কঠোরভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ দায়ী। ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন ও ঋণের সুদহার বাড়ায় দেশের উৎপাদন খাত ও ব্যবসা-বাণিজ্য বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ঋণনির্ভর কোম্পানিগুলোর জন্য ঋণের সুদহার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদনমুখী যেসব কোম্পানি বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য উৎপাদন করে, সেসব কোম্পানি এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। একদিকে কাঁচামাল আমদানিতে ডলারের বাড়তি মূল্যের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে, অন্যদিকে সুদহার বৃদ্ধির কারণে নিট মুনাফা কমছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে পণ্যমূল্য বাড়াতে পারছে না কোম্পানিগুলো। ফলে অনেক কোম্পানি লোকসানে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে এও বলেছেন, শুধু খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়া নিয়ে আনন্দিত হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রকৃত মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে আমদানি সহজীকরণ এবং নির্ভরতা করতে হবে। একই সঙ্গে নিজস্ব পণ্য উৎপাদনের দিকে মনোযোগী হলে মানুষের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিও করা যাবে। যেকোনো দেশের সরকারের প্রথম কাজ হচ্ছে, অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির বিরূপ প্রভাবকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। ব্যবসা-বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সিন্ডিকেটের হাতে গেলে তারা ইচ্ছামতো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। একটি সুনির্দিষ্ট চেইন অব কমান্ডের মাধ্যমে এসব নিয়ন্ত্রণের ভার যদি সাধারণ মানুষের হাতে থাকত, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সহজ হতো। উৎপাদন বৃদ্ধি, মুদ্রা পাচার রোধ করতে পারলে, মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকল, আগামী দিনের নীতিনির্ধারণ সেভাবে হোক যাতে নিম্ন আয়ের মানুষ স্বস্তির সুবাতাস পায়।