জুলাই অভ্যুত্থানে নারী যোদ্ধাদের স্বীকৃতি দাবি

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ। নারীর কাজের স্বীকৃতি প্রদান, নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারীর সাফল্য উদযাপন ও নারীদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রতি বছর দিনটি পালিত হয় বিশ্ব জুড়ে। এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন নারী ও কন্যার উন্নয়ন’।

এদিকে এবারের নারী দিবস সামনে রেখে জুলাই অভ্যুত্থানে নারী সহযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ ১১ দফা দাবি জানিয়েছে নারীপক্ষ। গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়েজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে এসব দাবি জানানো হয়। ‘আমাকে ছাড়া আমার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নয়’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নারীপক্ষ তাদের দাবি জানায়।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দিবসটি উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সক্রিয় সোশ্যালিস্ট পার্টি ১৫ হাজার নারীর স্মরণে দিনটি উদযাপন করেছিল। ওই নারীরা কঠোর কাজের বিনিময়ে কম মজুরির বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কে প্রতিবাদ করেছিলেন। এ দিবসকে আন্তর্জাতিকভাবে পালনের চিন্তাটা মাথায় আসে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী ও সমাজতান্ত্রিক কর্মী ক্লারা জেটকিনের। তিনি তার এ চিন্তাটা জানান ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে নারী শ্রমিকদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। সেখানে ১৭টি দেশের ১০০ জন নারী উপস্থিত ছিলেন এবং তারা সর্বসম্মতিক্রমে তার এ প্রস্তাব মেনে নেন। তবে ক্লারা জেটকিন যখন এ দিনটি প্রস্তাব করেন তখন তিনি কোনো নির্দিষ্ট তারিখের কথা বলেননি। ১৯১৭ সালের আগপর্যন্ত এ তারিখটিও নির্দিষ্ট ছিল না, সেবার যুদ্ধের সময় রাশিয়ান নারীরা ‘রুটি ও শান্তি’র দাবিতে এক আন্দোলন শুরু করে টানা চার দিন ধরে চলা সেই আন্দোলনে অবশেষে সেখানে জার শাসনের অবসান ঘটে এবং অন্তর্বর্তী সরকার নারীদের ভোটের অধিকার মেনে নেয়। যেদিন এ আন্দোলন শুরু হয় রাশিয়ায়, সেদিন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি। আর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ছিল ৮ মার্চ। মূলত তারপর থেকেই ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্বীকৃতি পায়।

এদিকে এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, নারীদের সম্ভাবনা ও কর্মদক্ষতাকে উৎপাদনমুখী কাজে সম্পৃক্ত করে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে যাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের নারী সমাজের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।’

ড. ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাক্সক্ষায় ছাত্র-শ্রমিক-জনতা যে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করেছিল গত জুলাই-আগস্টে, তার সম্মুখসারিতে ছিল নারী। লাখ লাখ ছাত্রী বিভিন্ন ক্যাম্পাসে দমন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়েছে। একাধিক নারী এই গণঅভ্যুত্থানে শাহাদাতবরণ করেছে। আমি এই গণঅভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’

তিনি বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। তারা এগিয়ে যাচ্ছে সর্বক্ষেত্রে। নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

ড. ইউনূস বলেন, নির্যাতিত, দুস্থ ও অসহায় নারীদের জন্য শেল্টার হোম, আইনি সহায়তা দিতে ‘মহিলা সহায়তা কেন্দ্র’, কর্মজীবী মহিলাদের আবাসন ও নারীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সহায়তা ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের অদম্য মেয়েরা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বমহিমায় এগিয়ে যাচ্ছে। নারীর অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে ‘অদম্য নারী পুরস্কার’ ও ‘বেগম রোকেয়া পদক’ প্রদানসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

নারী সহযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দাবি : গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন নারীপক্ষ তাদের ১১ দফা দাবি জানায়। সংবাদ সম্মেলনে যেসব দাবি জানানো হয় সেগুলো হলো ১. নারীর ওপর যেকোনো ধরনের সংঘবদ্ধ সহিংসতা বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে; ২. সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, দাপ্তরিক বা অধিকারভিত্তিক কমিটি, রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নারীর সমান উপস্থিতি ও কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; ৩. জুলাই অভ্যুত্থানের নারী সহযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে; ৪. নারী, কন্যাশিশু, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিগত, লিঙ্গভিত্তিক, সাম্প্রদায়িক ও গণসহিংসতা বন্ধ এবং মৌলবাদী ও উগ্রবাদী সংস্কৃতির বিস্তার রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে; ৫. ধর্ষণ, যৌতুক, যৌননিপীড়ন ও উত্ত্যক্তকরণ এবং নারীর প্রতি সহিংসতাবিরোধী প্রচলিত আইনসমূহ নারীর বৈচিত্র্যময় জীবন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ স্বার্থ ও সমঅধিকার বিবেচনায় সংশোধন ও পরিমার্জন করতে হবে; ৬. আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী, গৃহকর্মী, গার্মেন্টস কর্মী এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারী ও প্রবাসী নারীদের সর্বোচ্চ স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে; ৭. প্রতিবন্ধী নারীর জন্য গণপরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ প্রবেশগম্য করতে হবে এবং বিশেষ সহায়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে; ৮. প্রতিটি জেলায় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, নারী সহায়তা ও তদন্ত বিভাগ, কাউন্সেলিং, সাইবার সাপোর্ট ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা চালু করতে হবে; ৯. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীবিদ্বেষী কার্যক্রম ও প্রচার নিষিদ্ধ করতে কঠোর সাইবার আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; ১০. নারীর প্রতি সহিংসতাবিরোধী আইন, নারীর অধিকার ও সহায়তাসংক্রান্ত সব ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে; ১১. জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে বয়সভিত্তিক জেন্ডার সংবেদনশীলতা ও ইতিবাচক যৌনশিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে।