অগ্নিদুর্ঘটনায় বোধহীনতা

যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা এবং অগ্নিকাণ্ডের ফলে বসবাসের অযোগ্য শহরের খাতায় নাম লিখিয়েছে রাজধানী ঢাকা। কিন্তু এর মধ্যে অগ্নিকাণ্ড মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাজধানীসহ দেশে অগ্নিকা-ের ঘটনা নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে, কিছুদিন পরপরই এমন ঘটনা ঘটছে। মানুষ মারা যাচ্ছে অগুনতি। আহত হচ্ছেন শত শত। কিন্তু কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চূড়ান্ত মাত্রার পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। কিছু অগ্নিকাণ্ড সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আবার কোনো কোনো অগ্নিকাণ্ড ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ক্ষতিও হয় যথেষ্ট। ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল ভোরে রাজধানীর বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আশপাশের চার-পাঁচটি মার্কেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেইলি রোডের আগুনের লেলিহান শিখা কেড়ে নিয়েছিল ৪৫ জন নিরীহ-অসহায় মানুষের প্রাণ। জানা যাচ্ছে, অগ্নিদুর্ঘটনার ৩৮ শতাংশ ক্ষেত্রে আগুনের সূত্রপাত হয় বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। তখন ফায়ার সার্ভিস অগ্নিদুর্ঘটনার আরও কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছিল।

বেইলি রোডের ঘটনার পর চতুর্মুখী অভিযানে নামে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রেস্তোরাঁ থেকে আগুনে এত হতাহতের কারণে ঘটনার পরদিন থেকে ঢাকার খাবারের দোকানগুলোতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়। কিন্তু তারপর? বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনটিতে যে আগুন লাগে, সেখানেও প্রায় সব ফ্লোরেই ছিল রেস্তোরাঁ। আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল নিচতলার একটি রেস্তোরাঁ থেকে। তবু রেস্তোরাঁগুলো অগ্নিকা-ের ঝুঁকিমুক্ত করার তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে শনিবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে ভয়াবহ যে তথ্য জানা যাচ্ছে, তাতে রাজধানীসহ দেশবাসীর উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণে রয়েছে। জানা যাচ্ছে,  বেশিরভাগ রেস্তোরাঁয় নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। ফায়ার সার্ভিসের সবশেষ হিসাব বলেছে, দেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ রেস্টুরেন্ট অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। এমন ঝুঁকি মাথায় নিয়েই চলছে বেশিরভাগের কার্যক্রম। ২০২৪ সালে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে দেশের ৮৫৯টি রেস্টুরেন্ট পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৪২টি ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ ও ৪১৮টি ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। ওই বছর সারা দেশে ১ হাজার ১৮১টি বহুতল ভবন পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিস। তাদের তথ্যমতে, এর মধ্যে ৩৭ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। স্কুল-কলেজসহ ৭ হাজার ৫৬৮টি বাণিজ্যিক ভবনের মধ্যে ২ হাজার ৭৩১টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৫৪টি ভবন অতিঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তারপরও কি কোনো ধরনের প্রতিকারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

অগ্নিনিরাপত্তা সনদ নেই এমন ভবন ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাত দিনের মধ্যে ঢাকায় যৌথ অভিযানে নামার কথা অনেকবার বলেছে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। কিন্তু কোনো সমাধান আসেনি। গত বছর বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্স ও পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা’র তথ্য বলেছিল, ৯ বছরে বাংলাদেশে ১ লাখ ৯০ হাজার ১৬৭টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।  এতে ১ হাজার ৫১ জন নিহত ও সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে। কিন্তু কোনো কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা প্রায়ই বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট কিংবা মশার কয়েল বা সিগারেট থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, কিন্তু নাশকতা নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ওই পর্যন্তই।

সারা দেশের কথা বাদ। নিমতলী, বঙ্গবাজার, মগবাজার, চুড়িহাট্টা থেকে বেইলি রোড। রাজধানীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৩ শতাধিক মানুষের। বঙ্গবাজার, নিউমার্কেট, মগবাজার ছাড়াও গত কয়েক বছরে ঢাকায় বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। দেশ জুড়ে এ রকম অগ্নিবলয়ে বসবাস করে, কতটা নিশ্চিন্তে মানুষ খেতে পারে, ঘুমাতে পারে! প্রতিবার আগুন লাগার পর নড়েচড়ে বসে সরকার। আশ্বাস দেওয়া হয়, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু দৃশ্যপটে খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায় না। অভিযোগ রয়েছে, বড় কোনো দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে। এর বাইরে অন্য সময় তেমন কঠোর কোনো ভূমিকায় দেখা যায় না। জনগণের সার্বক্ষণিক অনিশ্চয়তা দূর করে নিশ্চিন্ত বসবাস কবে হবে, কে জানে! মৃত্যুভয়ে তাড়িত মানুষ কোনো স্বাভাবিক আচরণ করেন না। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বোধোদয় কবে হবে?