তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আজ থেকে গণশুনানি শুরু

চীনের চায়না পাওয়ার কোম্পানির হাত ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রথমবারের মতো তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমীক্ষা চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। এ জন্য উত্তরাঞ্চলে তিস্তাপাড়ের পাঁচ জেলায় শুরু হচ্ছে গণশুনানি। আজ রবিবার থেকে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে এই গণশুনানি। এতে চায়না কোম্পানির প্রতিনিধিরা তিস্তা নিয়ে তাদের পূর্বের সমীক্ষা তুলে ধরবেন। যেখানে সরাসরি মত-দ্বিমত প্রকাশ করবেন তিস্তাপাড়ের বাসিন্দারা। এ ছাড়াও তিস্তা নিয়ে কাজ করছে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাদের মতামত দেবেন।

আজ রবিবার গাইবান্ধা, দ্বিতীয় দিন আগামীকাল সোমবার রংপুরে, তৃতীয় দিন মঙ্গলবার লালমনিরহাটে, চতুর্থ দিন বুধবার নীলফামারীতে এবং পঞ্চম ও শেষ দিন বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রামে জেলার স্ব-স্ব জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সরাসরি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি তিস্তা নদী রক্ষায় করণীয় রংপুরের কাউনিয়ায় বিশেষ গণশুনানিতে পানিস¤পদ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে একমাত্র তিস্তা অববাহিকার বাসিন্দাদের চাওয়া পাওয়ার ওপর। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মধ্যে তা চূড়ান্ত করা হবে। কি থাকবে কি থাকবে না এটা শুনার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড চীনের পাওয়ার চায়না কোম্পানিকে নিয়ে আপনাদের কাছে আসবে ও শুনবে।’ এই বক্তব্যের এক মাস পর তিস্তা মহাপরিকল্পনার সমীক্ষা চূড়ান্ত করতে প্রথমবারের মতো তিস্তা অববাহিকার পাঁচ জেলায় হতে যাচ্ছে এই গণশুনানি।

অন্তর্বর্তী সরকারের এমন উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারে চরম হুমকিতে পড়েছে তিস্তা অববাহিকার দুই কোটি মানুষের জীবন জীবিকা। এমন পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে দীর্ঘ সময় ধরে তিস্তাপাড়ের বাসিন্দারা আন্দোলন গড়ে তুলে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি। তাই প্রত্যাশা ভূ-রাজনৈতিক দ্বৈরথ কাটিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের হাত ধরে আলোর মুখ দেখুক তিস্তা মহাপরিকল্পনা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, তিস্তা নদীপাড়ের বাসিন্দাদের ভাবনা চিন্তা গুরুত্ব পাবে এই মহাপরিকল্পনায়। কি থাকবে কি থাকবে না তা নিয়েও আলোচনা হবে এই গণশুনানিতে।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মাহবুবর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনগণের যে মতামত, তাদের কি প্রয়োজন রয়েছে, কি প্রয়োজন নেই তারা সেগুলো পাওয়ার চায়না কোম্পানির কাছে তুলে ধরবে। ইতিমধ্যে তারা যে সমীক্ষা করেছে সেখানে তিস্তাপাড়ের মানুষের যে দাবি থাকবে তা যুক্ত করা হবে এবং তা নিয়ে তারা আবার স্টাডি করবে।

উল্লেখ্য, তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন দাবিতে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪৮ ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়েছিল। যা ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগানে তিস্তা নদীরক্ষা আন্দোলনের নেতারা এ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল। যার মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রংপুর বিভাগের আসাদুল হাবিব দুলু। ১১টি পয়েন্টে ৪৮ ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচিতে ১১৫ কিলোমিটার তিস্তা নদীর তীরে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নিয়েছিল। এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কর্মসূচির শেষ দিন লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালী যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিয়েছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে ২৭টি প্রকল্পের চুক্তি হয়েছিল। তার মধ্যে তিস্তা প্রকল্পও ছিল। ওই সময় প্রস্তাবিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভাটি থেকে তিস্তা-যমুনার মিলনস্থল পর্যন্ত নদীর প্রস্থ কমিয়ে ৭০০ থেকে ১০০০ মিটারে সীমাবদ্ধ করা হবে। নদীর গভীরতা বাড়ানো হবে ১০ মিটার। নদী শাসনের মাধ্যমে তিস্তা নদীকে সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পানি বহনক্ষমতা বাড়ানো হবে, নদীর দুই পাড়ে বিদ্যমান বাঁধের মেরামত করা হবে, নদীর দুই পাড়ে মোট ১০২ কিলোমিটার নতুন বাঁধ নির্মাণ করা হবে, ৫০টি গ্রোয়েন স্থাপন করা হবে, ড্রেজিংয়ের মাটি ভরাট করে নদীর দুই পাড়ে ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি উদ্ধার করা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তাবিত তিস্তা নদীর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, ৯৮৩ মিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্পের মাধ্যমে বন্যানিয়ন্ত্রণ, পানিপ্রাপ্যতা বৃদ্ধি, জমি উদ্ধার, নৌচলাচল বৃদ্ধিসহ তিস্তাপাড়ে কৃষি অঞ্চল, শিল্প-কারখানা, আবাসন প্রকল্প, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা হবে এবং তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা হবে।