অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি আয়েশা। ২০১৫ সালে যখন কলেজে ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনাই অনিশ্চিত ছিল, তখন তার মা গহনা বিক্রি করে মেয়ের শিক্ষার পথ সুগম করেন। সেই সহায়তায় উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন আয়েশা। তবে শিক্ষাজীবনের পথে অর্থাভাবের বাধা এসে দাঁড়ায়। তবু তিনি দমে যাননি, সেন্ট্রাল ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট (সিজেএম) বৃত্তির সহায়তায় তিনি তার পড়াশোনা চালিয়ে যান। কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে ধাপে ধাপে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যান। তিনবার ব্যর্থ হওয়ার পরও তিনি হাল ছাড়েননি, চতুর্থ বারেই সফলতা অর্জন করেন।
তার সফলতার পথে তার স্বামীও এক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন। বারবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হলেও তিনি তাকে সাহস, মনোবল ও উৎসাহ প্রদান করেন। আয়েশার এই অদম্য সংগ্রামের ফলস্বরূপ ১৭তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সহকারী জজ পদে তিনি ৯৭তম স্থান অধিকার করেন। এভাবেই আয়েশার অনুপ্রেরণামূলক জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন দেশ রূপান্তরের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ইদুল হাসান।
দেশ রূপান্তর: ১৭তম বিজেএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আপনার জন্ম, শৈশবকাল সম্পর্কে জানতে চাই?
আয়েশা : আমার জন্মসাল ১২ অক্টোবর ১৯৯৭ সালে। আমার বেড়ে উঠা সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার অন্তর্গত বয়ড়াবাড়ী গ্রামে। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ১৬তম বিজেএস পরীক্ষার দেওয়ার সময় বাবা মারা যান। আমি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি গ্রামের একটি স্কুলে। ২০১৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হই। এরপর শুরু হয় জীবন যুদ্ধ। কলেজে ভর্তি হওয়ার টাকা নেই, মায়ের গহনা বিক্রি করে রাজশাহী নিউ গভমেন্ট ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হই। ২০১৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হই। এরপর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ার সুযোগ পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শুরু হয় স্টাগল। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পড়াশোনা চালিয়েছি সেন্ট্রাল ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজেএম) টাকা দিয়ে। আমি ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়ির সকল কাজে মা-বাবাকে সাহায্য করেছি। কোনো কাজকে কখনোই ছোট মনে করিনি।
দেশ রূপান্তর: এখন তো আপনি সহকারী জজের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। আপনার এ অনুভূতিটা সম্পর্কে বলুন।
আয়েশা: সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষা সন্দেহাতীতভাবে একটি কঠিন পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর জীবনের যত অপ্রাপ্তি ও ব্যর্থতার কষ্ট ছিল তা দূর হয়ে গেছে। তবে এই সফলতায় সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হতেন আমার বাবা যিনি এ পৃথিবীতে আর নেই। বাবার শূন্যতায় এই প্রাপ্তি অপূর্ণই রয়ে গেল।
দেশ রূপান্তর: বিচারক হওয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা কে, কীভাবে এ স্বপ্নের শুরু হয়েছিল?
আয়েশা: ছোটবেলা থেকে নির্দিষ্ট কিছু হওয়ার স্বপ্ন না থাকলেও লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হতে হবে এই লক্ষ্য সামনে রেখেই জীবনের প্রতিটি ধাপে এগিয়েছি। আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর বিভাগের বড় ভাই-আপুদের জজ হতে দেখে ইচ্ছে হলো আমিও জজ হব। আব্বা- আম্মা আমাকে খুব উৎসাহ দিতেন। প্রতি ওয়াক্ত নামাজে আমার জন্য দোয়া করতেন। আমার ব্যর্থতায় শান্তনা দিতেন। আবারো লেখাপড়া করার উৎসাহ দিতেন। আমার ভাইয়েরা পরামর্শ দিয়ে সবসময় আমার পাশে ছিলেন।
দেশ রূপান্তর: বিচারক হওয়ার স্বপ্ন কখন থেকে? বিচারক হওয়ার পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি?
আয়েশা: ছোটবেলা থেকেই আমাদের ৫ ভাই-বোনের লেখাপড়ার প্রতি আমার আব্বা-আম্মা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য হওয়ায় ঈদে কখনো নতুন জামা না পেলেও বই বা টিউশন ফি সবসময় আম্মা যোগার করে রাখতেন। আব্বা-আম্মার পরিশ্রম, সততা, দূরদর্শিতা, ধৈর্য্য সবকিছুই আমার বিচারক হওয়ার পেছনে অবদান রেখেছে। আম্মা বলতেন প্রয়োজনে রক্ত বিক্রি করে তোমাকে পড়াব, তবুও তুমি হাল ছেড় না। ২০২০ সালে অনার্স ৪র্থ বর্ষে আমার বিয়ে হয়। মূলত তখন থেকেই জজ হওয়ার জন্য লেখাপড়া শুরু করি।
আমার স্বামীও আইনের ছাত্র হওয়ায় দুজন আলোচনা করে আইন পড়তাম। কঠিন বিষয়গুলো সে খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন। সে আইনের নোট করতেন আর আমি জেনালের বিষয়ের নোট করতাম। লেখাপড়ার পাশাপাশি সে আমাকে মানসিকভাবেও বিচারক হিসেবে প্রস্তুত করেছেন। যেমন একটা ঘটনা বলি রান্না করতে গিয়ে হাত কেটে বা পুড়ে গেলে সে বলতেন, তোমার এই হাত শুধু কলম ধরার জন্যই উপযুক্ত। অতিরিক্ত কষ্টের মুহূর্তে কুরআনের আয়াত পড়ে সে আমার মধ্যে আশা জাগিয়েছেন। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি তাদের সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ সহায়তা করেছেন।
দেশ রূপান্তর: আপনার সাফল্যের পেছনে কোন বিষয়গুলো কাজ করেছে?
আয়েশা: আমি মনে করি বিচারিক পেশায় আশার জন্য শুধু লেখাপড়া করলেই হবেনা বরং হতে হবে কৌশলী। আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা রেখে সঠিক দিকনির্দেশনায় থেকে সর্বোচ্চ পরিশ্রম করতে হবে। সেইসঙ্গে ধৈর্য্য, মানসিক স্থিরতা, সততা, বিনয়, সহনশীলতা ও কথাবার্তায় স্পষ্টতার মতো মৌলিক মানবীয় বিষয়গুলোর চর্চা করতে হবে এবং আফসোস ও অহংকার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। শেষ সময়ে এই বিষয়গুলোর ওপর আমি বেশ গুরুত্ব দিয়েছি।
দেশ রূপান্তর: অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার সঙ্গে জুডিসিয়ারির পড়া কিভাবে সামলে নিয়েছেন?
আয়েশা: জুডিসিয়ারি পরীক্ষায় ৬০% প্রশ্ন সরাসরি আইন থেকে হয় আর সে আইনগুলোই আমরা ৪ বছরের অনার্স কোর্সে পড়ে থাকি। তাই অ্যাকাডেমিকে বাড়তি চাপ না নিয়ে আইনগুলো বুঝে বুঝে পড়েছি ও কিছুটা নোট করে মুখস্থ রাখার চেষ্টা করেছি।
দেশ রূপান্তর: কিভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন, দিনে কত ঘণ্টা করে পড়ালেখা করেছেন?
আয়েশা: প্রস্ততির শুরুটা ছিল হাতের লেখা ঠিক করার মধ্য দিয়ে। আমার লেখা এতটাই খারাপ ছিল যে কী লিখেছি তা বোঝাই যেতো না। খাতায় মার্জিন টেনে অ,আ,ক,খ লিখতাম। যাদের লেখা সুন্দর তাদের খাতা এনে সেইভাবে লেখার চেষ্টা করতাম আর নিজে নিজে বলতাম লেখা সুন্দর করতে পারলে জজও হইতে পারব।