দেশ রূপান্তরে সংবাদ প্রকাশ

শেষ পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টাকে ব্রিফ করতে পারলেন না সিএএবি প্রধান

দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রকৌশল বিভাগের প্রধান হাবিবুর রহমানকে দিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরের সার্বিক পরিস্থিতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ব্রিফ করার চেষ্টা হয়েছে। এই নিয়ে দেশ রূপান্তরে সংবাদ প্রকাশের পর টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের। পরে বাধ‍্য হয়ে হাবিবুর রহমানের নামে কাটা বিমানের টিকিট বাতিল করতে বাধ্য হয়। তার পরিবর্তে প্রধান উপদেষ্টাকে বিমানবন্দরে সর্বশেষ পরিস্থিতি ব্রিফ করেন বেবিচকের চেয়ারম‍্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মন্জুর কবীর ভুঁইয়া।

জানা গেছে, দুদকের মামলার আসামি প্রধান উপদেষ্টাকে ব্রিফ করার বিষয়ে সম্প্রতি এ স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়েছেন দুর্নীতি বিরোধী সমন্বয় কমিটির ড. মো. জোবাইর আলম।

চিঠিতে বলা হয়, ১৪ মার্চ প্রধান উপদেষ্টা কক্সবাজার সফর করবেন এবং দুপুরে নির্মাণাধীন কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পরিদর্শন করবেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টাকে ব্রিফ করার জন্য প্রেজেন্টেশন তৈরি করেছেন ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর সিএএবির প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান।

হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে চারটি দুর্নীতির মামলা করেছে দুদক। এসব মামলার অন্য আসামিরা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক সিনিয়র সচিব মহিবুল হক, সাবেক যুগ্ম সচিব জনেদ্রনাথ সরকার, বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান, বেবিচকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেক, এরোনেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আনাম ও এরোনেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের পরিচালক লুৎফুল্লাহ মাজেদ।

চিঠিতে বলা হয়, তারিক আহমেদ সিদ্দিকী এবং মহিবুল হকের সাথে হাবিবুর রহমানের গভীর সম্পর্ক ইতিমধ্যে জাতীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হয়েছে। দুর্নীতির মামলা আসামি কিভাবে প্রধান উপদেষ্টার মিটিংয়ে উপস্থিত হয়ে প্রেজেন্টেশন দিতে পারে? এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয় চিঠিতে।

বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলতি মাসের ২৩ তারিখে হাবিবুর রহমানের অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এমনকি তাকে সরাতে উচ্চতর আদালতে রিট পর্যন্ত করা হয়েছিল। তারপরও ‘বোর্ড সভায় তাকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে সিদ্ধান্ত নেয়। এই নিয়ে সমালোচনা ঝড় উঠে। হয়।

তিনি আরো বলেন, দুর্নীতির দায় সিএবির প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান এরকম একটি জাতীয় অনুষ্ঠানে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু দুর্নীতির মামলার কারণে প্রশাসন তাকে উপস্থাপনের অনুমতি দেয়নি সেই রকম একজন কলঙ্কিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা আমরা সিভিলিবেশনে চাই না। তাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে তার বিচার করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। সিভিল এভিয়েশন এর মতো একটি প্রতিষ্ঠানে পরবর্তী কলঙ্কিত লোক আছে এটা ভাবতে আমাদের লজ্জা হয়।

জানা গেছে, হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ আছে। টেন্ডারের কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৫ লাখ টাকার ঘুষ নিয়েও কাজ না দেওয়ায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ১৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান ও সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আবদুল মালেকের নাম রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, আসামিরা যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে হাবিবুর রহমানের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে আবারও দুই বছরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে নানা মহলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। গত ২৬ জানুয়ারি সংস্থাটির চেয়ারম্যানের কাছে আবেদনও করা হয়েছে। এ নিয়ে পুরো বেবিচকে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত সরকারের আমলেও সংস্থাটির সাবেক প্রধান আবদুল মালেকের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় দুদক তদন্ত করে। তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ম্যানেজ করে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ভাগিয়ে নেন।

বেবিচক সূত্র জানায়, বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় প্রকৌশল বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘদিন বেবিচকের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজ করেছেন। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দুদক তদন্ত করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বেচিকের যত মেগা প্রকল্প রয়েছে, প্রায় সবগুলোতেই অর্থ-বাণিজ্য করেছেন তিনি।

বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে করা আবেদনে হাবিবুর রহমানকে নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা আখ্যায়িত করা হয়েছে। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে কক্সবাজার বিমানবন্দর (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদ্যামান রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তিবৃদ্ধিকরণ প্রকল্প, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তিবৃদ্ধিকরণ প্রকল্পসহ আরও ছোট-বড় প্রকল্পের পরিচালক পদে নিষ্ঠা ও সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য আটটি ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, হাবিবুর রহমানের অবসর ছুটি বাতিলপূর্বক ২৩.০৩.২৫ তারিখ হতে ২২.০৩.২৭ পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।

এর আগে দরপত্রের কাজ পেতে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এক ঠিকাদার। কিন্তু তিনি কাজ না পেয়ে অর্থ ফেরত চেয়েছেন। এই নিয়ে টালবাহানা চলতে থাকে কয়েক মাস ধরে। সবশেষে ঠিকাদার সিরাজুল ইসলাম ডিএমপির দুটি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তাছাড়া দিয়েছেন উকিল নোটিস। পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা ও বেবিচক চেয়ারম্যানকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জিডির বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে তদন্তকারী সংস্থা।

গত ১১ জানুয়ারি উত্তরা পূর্ব থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২২ সালে ১৪ মে বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে ঠিকাদারি কাজের জন্য অগ্রিম টাকা দিই। কাজ না দেওয়ার পাশাপাশি টাকা ফেরত না দিয়ে হাবিবুর রহমান আমাকে ঘোরাতে থাকে। গত ৫ জানুয়ারি দক্ষিণখানের ‘একুশে ভোজ’ রেস্তোরাঁয় তাকে সামনে পেয়ে টাকা ফেরত চাইলে সে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে হুমকি দেয়।

গত ১২ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে পাঠানো উকিল নোটিশে বলা হয়, হাবিবুর রহমান বেবিচকের পিঅ্যান্ডডি কিউএস সার্কেলে এসই পদে থাকাবস্থায় ৫ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার কথা বলে সিরাজুল ইসলামের কাছে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করে। তার মধ্যে ৫ লাখ টাকা উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে দেওয়া হয়। বাকি ৫ লাখ টাকা কাজ দেওয়ার পর পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু এখনো কাজ বা টাকা ফেরত না দিয়ে সিরাজুল ইসলামকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছেন হাবিবুর রহমান। এজন্য থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নোটিসের জবাব না দিলে নিয়মিত মামলা করার কথা বলা হয় নোটিশে।