গত কয়েক বছর বেলুচিস্তানে বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বেসামরিক মানুষ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও সরকারি অবকাঠামো লক্ষ্য করে সেই হামলা হয়। এর আগে চীনের নাগরিক ও চীনা প্রকল্পগুলোতে বেশ কয়েকটি হামলা হয়েছে। এখন পাঞ্জাব থেকে আসা মানুষদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই বার্তা দিতে চাচ্ছে যে, বেলুচিস্তানে বহিরাগত ব্যক্তিরা নিরাপদ নন।
মঙ্গলবার বেলুচিস্তানের বোলান এলাকার কাছে কোয়েটা থেকে পেশোয়ারগামী জাফর এক্সপ্রেস নামের যাত্রীবাহী ট্রেনের নিয়ন্ত্রণ নেয় সশস্ত্র একটি গোষ্ঠী। এ সময় তারা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে যাত্রীদের জিম্মি করে। ট্রেনটির ৯টি বগিতে চার শতাধিক যাত্রী ছিলেন। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় সময় বেলা ১টার দিকে ট্রেনটি বোলান পাস পার হওয়ার সময় হামলা হয়। এই পাহাড়ি অঞ্চলে ব্রিটিশ আমলে তৈরি হওয়া অনেক টানেল আছে। আক্রমণকারীরা এ সুযোগই নেয়। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবিতে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বালুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। বুধবার রাতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, ট্রেনটিতে তাদের অভিযান শেষ হয়েছে। ৩৪৬ যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছে। ৩৩ হামলাকারী সবাই নিহত হওয়া ছাড়াও প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ যাত্রী, ট্রেনচালক ও আধা সামরিক বাহিনীর ১ জন সদস্য। পবিত্র রমজান মাসে নিরীহ মানুষের ওপর চালানো এ হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে জাতীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে মুক্তি পাওয়া যাত্রীরা কয়েক ঘণ্টার জিম্মিদশায় যে ভয়ানক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন, তার বর্ণনা দেন।
বেঁচে ফেরা ট্রেনের আরোহীদের একজন গুলাম সারওয়ার (৪৮)। তিনি ট্রেনের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আলজাজিরাকে বলছিলেন, ‘আমি চোখের সামনে অনেককে মরতে দেখছিলাম। ভাবছিলাম, এরপর আমার পালা। কিন্তু বুধবার সকালে (ট্রেন ছিনতাই হওয়ার পরদিন) আমি অন্য যাত্রী ও সহকর্মীদের সঙ্গে পালাতে সক্ষম হই।’ চার সশস্ত্র রেলকর্মী ও পাঁচ সেনাসদস্যের সঙ্গে কোয়েটা থেকে ট্রেনটিতে উঠেছিলেন সারওয়ার। এই রেলকর্মী ও সেনারা নিয়মমাফিক যাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। সারওয়ার বলছিলেন, যখন হামলা শুরু হয়, তখন তিনি ও অন্য সশস্ত্র কর্মীরা পাল্টা গুলি চালানো শুরু করেন। মুরাদ আলী (৬৮) স্ত্রীকে নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলীয় জাকোবাবাদে যাচ্ছিলেন। হামলাকারীরা তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনিও ট্রেনকে লক্ষ্য করে বিএলএর সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলার দৃশ্য দেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাপক গুলিবর্ষণের শব্দ শোনার পর আমি দেখলাম, একটি রকেট ট্রেনের ইঞ্জিনে আঘাত করেছে। তারা আমাদের বগির ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং আমার জাতিগত পরিচয় জানতে চান। আমি যখন নিজেকে সিন্ধি বলে পরিচয় দিই, তখন তারা আমাকে ছেড়ে দেন।’
আয়তনের দিক দিয়ে পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ প্রদেশ বেলুচিস্তান, লোকসংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখ। ২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ২৪ কোটি। বেলুচিস্তান প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ। সেখানে তেল, কয়লা, সোনা, তামা ও গ্যাসের খনি রয়েছে। এরপরও পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চল এটি। পাকিস্তান সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস বেলুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ এই প্রদেশের বাসিন্দাদের কঠোর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিন যাপন করতে হয়। পাকিস্তানের একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দরও বেলুচিস্তানে, গোয়াদার সমুদ্রবন্দর। ছয় হাজার কোটি মার্কিন ডলারের চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্প মূলত এই সমুদ্রবন্দর ঘিরেই গড়ে উঠেছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য দক্ষিণ-পশ্চিম চীন এবং আরব সাগর দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সংযোগ গড়ে তোলা। বেলুচিস্তান প্রদেশের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পাকিস্তান সরকার খুবই কৌশলে ক্রমাগত তাদের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে যাচ্ছে এবং তাদের সম্পদের অপব্যবহার করছে। এর ফলে তাদের মধ্যে (সরকার দ্বারা) প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি গড়ে উঠেছে এবং তাদের সমর্থন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক বেলুচিস্তান-বিশেষজ্ঞ মালিক সিরাজ আকবর বলেন, আগে বিএলএ মূলত ব্যক্তিগত হামলা বা পাইপলাইন ধ্বংসের মতো ছোট আকারের হামলা চালাত। কিন্তু এখন তারা বৃহৎ পরিসরের সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে। আকবর বলেন, ‘এই গোষ্ঠী এখন যাত্রীবাহী ট্রেনের ওপর আক্রমণ চালানোর মতো বড় হামলা করছে। এটি প্রমাণ করে যে, তারা শুধু আগের চেয়ে বেশি সাহসীই হয়নি, বরং তারা বিশ্বাস করে যে- সরকার তাদের দমাতে পারবে না। এমনকি হামলার পরও সরকার কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম নয়।’ বেলুচিস্তানবিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক রফিউল্লাহ কাকর জানান, বিএলএ তাদের কমান্ড কাঠামো আরও সংগঠিত করেছে। ফলে মাঠপর্যায়ে যোদ্ধারা সরাসরি অপারেশন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন। তিনি আরও বলেন, শুধু গোয়েন্দা ব্যর্থতা থেকেই যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে, ব্যাপারটা এমন নয়। এর মূল কারণ হচ্ছে, বালুচ নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের বাড়তে থাকা দূরত্ব। কয়েক দশক ধরে বালুচিস্তান প্রদেশ সামরিক বাহিনীর হাতে যেন রাজনৈতিক পরীক্ষার ল্যাবরেটরি হয়ে আছে। গত ১০ বছরে ৬ জন মুখ্যমন্ত্রী বদল হয়েছে এখানে। এ অস্থিরতা গণতান্ত্রিকব্যবস্থা ধসিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্র আর নাগরিকের মধ্যে এই বাড়তে থাকা ব্যবধান থেকে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। তারা ব্যাপকভাবে তরুণদের দলে টানতে পারছে। বাড়ছে আত্মঘাতী হামলা। আর বালুচরা মনেই করেন যে রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করে না। বালুচিস্তানে এখন যে প্রাদেশিক প্রশাসন, তা আসলে সামরিক বাহিনীর হাতের পুতুল। ইসলামাবাদের ভরসা এই পুতুল সরকার, জনগণ যাদের ভরসা করে না। একদিকে বালুচদের দীর্ঘদিনের অপমানবোধ, অন্যদিকে তাদের সম্পদের প্রতি দেশি ও বিদেশি শাসক ও পুঁজিপতিদের লোভ পৃথিবীর আরও অনেক অঞ্চলের মতো এই অঞ্চলকেও করছে রক্তাক্ত। হয়ে উঠেছে এক ভয়াল জনপদ।
লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক