মহাশূন্যের যাত্রীদের জীবন

মহাকাশের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বহু পুরনো। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে তার অজানা পৃথিবীকে জানতে চেয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে, সেই আকাক্সক্ষা একদিন সত্যি হতে শুরু করে। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

ভেবে দেখুন, বেড়াতে গেছেন ৮ দিনের জন্য, কিন্তু ফিরলেন প্রায় ৯ মাস পর! ঠিক এমনই এক চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা হয়েছে নাসার দুই নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস আর ব্যারি উইলমোরের। তাদের বোয়িং স্টারলাইনার মহাকাশযানটি একটু বেগড়বাই করেছিল, আর সেই সুযোগে তারা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) এক লম্বা ২৮৮ দিনের ‘বোনাস ট্রিপ’ পেয়ে গেলেন। বিনা টিকিটে অতিরিক্ত সময় কাটানোর মজার গল্পের মতো শোনালেও, আসলে ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিল না! মহাকাশে এতদিন থাকার ফলে তাদের শরীর ও মনে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। পায়ের নিচে মাটি না থাকার কারণে পেশি দুর্বল হয়ে গেছে, হাড়ের ঘনত্ব কমে গেছে, রেডিয়েশনের ধকলও কম যায়নি। আর পৃথিবীতে ফিরেই প্রথম যে জিনিসটি তারা অনুভব করেছেন, সেটা হলো ওজন! এতদিন ভেসে বেড়ানোর পর হঠাৎ মাধ্যাকর্ষণ ফিরে আসায় মনে হয়েছে যেন কেউ তাদের ওপর বিশাল এক বস্তা চাপিয়ে দিয়েছে! কল্পনা করুন প্রতিদিন ভাসমান অবস্থায় কাজ করছেন, পায়ের নিচে মাটি নেই, কোনো ওজন অনুভব করছেন না। শুরুতে ব্যাপারটা মজার মনে হলেও, ধীরে ধীরে শরীরের ওপর বিশাল প্রভাব পড়ে। পেশিগুলো দুর্বল হতে থাকে, হাড় ক্ষয় হয়ে যায়, দৃষ্টিশক্তির ওপর প্রভাব পড়ে, এমনকি শরীরের কিছু ডিএনএ-ও বদলে যায়! মহাকাশের রেডিয়েশন ত্বক ও মস্তিষ্কের জন্য ভয়ংকর হুমকি তৈরি করে। পৃথিবীতে ফেরার পর তারা হঠাৎ করেই অনুভব করেন, শরীর যেন একেবারে অপরিচিত হয়ে গেছে যেন ওজন বেড়ে গেছে কয়েকগুণ!

নভোচারীদের ইতিহাস

নভোচারী হওয়ার পথ খুব সহজ ছিল না। প্রথম মহাকাশ অভিযান শুরু হয় ১৯৬১ সালে, যখন ইউরি গ্যাগারিন, একজন সোভিয়েত মহাকাশচারী, প্রথম মানব হিসেবে মহাকাশে যান। তার মহাকাশযাত্রা ভোস্টক ১ রকেটে ছিল। এটি ছিল একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত, যা পৃথিবী থেকে মহাকাশে মানবজাতির প্রথম পদচিহ্ন রেখে গেল। এর পর থেকেই বিভিন্ন দেশের মহাকাশ সংস্থা, বিশেষ করে নাসা (nasa) এবং সোভিয়েত মহাকাশ সংস্থা (সোভিয়েত ইউনিয়ন), নভোচারী পাঠানোর জন্য নানা অভিযান পরিচালনা করতে থাকে।

১৯৬৯ সালে নিল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন চাঁদে প্রথম মানুষ হিসেবে পা রাখেন, যা ছিল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। তার এই অভিযানের সময় তার বিখ্যাত উক্তি ছিল: ‘এটি একটি মানুষের জন্য একটি ছোট পদক্ষেপ, কিন্তু মানবতার জন্য একটি বৃহৎ পদক্ষেপ।’

নভোচারীদের অভিজ্ঞতা

নভোচারীদের মহাকাশে যাত্রা একেবারেই সহজ নয়। শূন্য মহাকাশে পৃথিবী থেকে আলাদা একটি পরিবেশ তৈরি হয়। সেখানে নেই শ্বাস নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন, নেই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, এবং নেই দিন-রাতের পার্থক্য। নভোচারীরা মহাকাশে শূন্য গ্রাভিটি (Zero Gravity) বা মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিস্থিতিতে থাকেন, যেখানে পৃথিবীর মতো মাধ্যাকর্ষণ কাজ করে না। এর ফলে তারা যে কোনো কিছু তুলতে বা মুভ করতে পারেন না এবং শরীরও ভারমুক্ত হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে প্রথম দিকে নভোচারীদের জন্য শারীরিকভাবে মানিয়ে নেওয়া কঠিন ছিল। যেহেতু শূন্য মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ নেই, সেহেতু তাদের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ সহজেই শূন্যে ভাসতে থাকে। তবে তাদের শরীর সময়ের সঙ্গে শূন্য গ্রাভিটিতে মানিয়ে নেয়। তারা নানান কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করেন, যেমন বিজ্ঞান গবেষণা, মহাকাশযান পরীক্ষা এবং পৃথিবী থেকে পাঠানো তথ্য সংগ্রহ। মহাকাশের এই অভিজ্ঞতা তাদের জন্য অত্যন্ত তীব্র এবং গভীর।

নভোচারীদের পোশাক

মহাকাশে যাওয়ার জন্য নভোচারীদের বিশেষ পোশাক প্রয়োজন। এটি শুধুমাত্র তাদের নিরাপত্তা ও আরাম নিশ্চিত করে না, বরং তাদের শূন্য গ্রাভিটিতে চলাফেরা ও বিভিন্ন কার্যক্রম করতে সহায়তা করে। নভোচারীদের পোশাক স্পেস স্যুট (Space Suit) নামে পরিচিত।

স্পেস স্যুট মূলত একটি বহুস্তর বিশিষ্ট সুরক্ষা পোশাক যা শূন্য গ্রাভিটি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং অক্সিজেন সরবরাহের কাজ করে। এই পোশাকের অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে:

অক্সিজেন ট্যাঙ্ক : মহাকাশে অক্সিজেনের অভাব থাকার কারণে এটি নভোচারীর শ্বাস গ্রহণের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে।

শারীরিক সুরক্ষা : মহাকাশের ভয়াবহ তাপমাত্রা এবং মহাকাশে যেকোনো উঁচু চাপ থেকে সুরক্ষা দেয়।

হেলমেট : নভোচারী মহাকাশে কোনো জায়গায় যেতে গেলে তার মাথা সুরক্ষিত রাখতে এবং দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করতে হেলমেট ব্যবহার করেন।

গ্লাভস : শূন্য মহাকাশে কিছু করতে হলে নভোচারীর হাতের সুরক্ষা প্রয়োজন, তাই তারা বিশেষ ধরনের গ্লাভস পরেন।

রকেট : মহাকাশের যাত্রা

নভোচারীরা মহাকাশে পৌঁছানোর জন্য যেসব রকেট ব্যবহার করেন, তা অত্যন্ত জটিল এবং শক্তিশালী। এই রকেটগুলো পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অতিক্রম করে মহাকাশে পৌঁছানোর জন্য তৈরি করা হয়। বর্তমানে নাসা, স্পেসএক্স এবং অন্যান্য মহাকাশ সংস্থা বিভিন্ন রকেট ব্যবহার করে, যেমন স্যাটার্ন ভি (Saturn V), স্পেসএক্স ফালকন ৯ (SpaceX Falcon 9) এবং অরিয়ান ৫ (Ariane 5)।

এই রকেটগুলো সাধারণত তিনটি স্তরের (Stages) হয়:

প্রথম স্তর : এটি রকেটের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ, যা মহাকাশে পাঠানোর জন্য শুরুতে শক্তি প্রদান করে।

দ্বিতীয় স্তর : এটি রকেটের গতি বাড়ায় এবং মহাকাশে পৌঁছানোর জন্য ও পর্যাপ্ত উচ্চতায় পৌঁছানোর জন্য সহায়তা করে।

তৃতীয় স্তর : এটি মহাকাশের এক নির্দিষ্ট অক্ষাংশে পৌঁছানোর জন্য রকেটকে যথাযথ গতি ও ট্রাজেক্টরি দেয়।

শূন্য গ্রাভিটিতে নভোচারীরা কীভাবে কাজ করেন?

শূন্য গ্রাভিটিতে নভোচারীরা চলাফেরা করার জন্য বিশেষ কৌশল ব্যবহার করেন। শূন্য গ্রাভিটিতে পৃথিবীর মতো কোনো মাধ্যাকর্ষণ শক্তি না থাকায়, নভোচারীরা কোনো কিছু ঠেলে বা টেনে বস্তু নিয়ে কাজ করতে পারেন।

তারা সাধারণত স্পেস স্টেশনে ভাসমান অবস্থায় থাকেন এবং এই অবস্থায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হয়। তাদের হাত, পা এবং শরীরের কোনো অংশকে অযথা নড়াচড়া না করতে দেওয়া হয়, যাতে যন্ত্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তারা যখন সাঁতার কাটেন বা কিছু কাজ করেন, তখন প্রতিটি কাজকে একটু ভিন্নভাবে করতে হয়, যেমন বিশেষভাবে ডিভাইসগুলোকে গ্রিপ করা বা একাধিক কেবল ও সংযোগের সাহায্যে কিছু স্থানে স্থির হওয়া।

নভোচারীদের বিষয়টি অত্যন্ত বিস্তৃত এবং চমকপ্রদ। এদের সম্পর্কে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা নভোচারীদের জীবন, প্রশিক্ষণ এবং অভিযানের সঙ্গে সম্পর্কিত :

নভোচারীদের প্রশিক্ষণ : নভোচারী হওয়ার জন্য, একজন ব্যক্তিকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এই প্রশিক্ষণ শুধু শারীরিক নয় বরং মানসিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকেও গভীরভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে :

ফিজিক্যাল ফিটনেস : মহাকাশে শূন্য গ্রাভিটিতে থাকা এবং সেখানকার যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য নভোচারীদের ফিটনেস বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সাইমনলেটর প্রশিক্ষণ : মহাকাশে পাঠানোর আগে, নভোচারীদের বিভিন্ন মহাকাশযান বা স্পেস স্টেশনের সিমুলেটরে কাজ করতে হয়, যাতে তাদের বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলা করার দক্ষতা তৈরি হয়।

বিকিরণ সুরক্ষা : মহাকাশে যাওয়ার সময় নভোচারীরা গামা রশ্মি, এক্স-রে বা অন্যান্য বিপজ্জনক বিকিরণের শিকার হতে পারেন, তাই তাদের সুরক্ষার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

মহাকাশের সাইকোলজি : শূন্য গ্রাভিটিতে দীর্ঘসময় অবস্থান এবং একাকিত্বের অনুভূতি নভোচারীদের মানসিক অবস্থা প্রভাবিত করতে পারে। একাধিক নভোচারী দীর্ঘ মহাকাশ অভিযানের পরে একাকিত্ব, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের শিকার হয়েছেন। এসব মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলো মহাকাশ অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য নভোচারীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিচালনা এবং তাদের উদ্বেগ কমানোর জন্য কিছু বিশেষ প্রোগ্রাম এবং টেকনিক ব্যবহার করা হয়।

মহাকাশে খাদ্য এবং পানীয় : নভোচারীদের জন্য খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মহাকাশে সাধারণ খাবার তৈরি করা সম্ভব নয়, কারণ শূন্য মহাকাশে পানির তাপমাত্রা এবং চাপ পৃথিবীর মতো নয়। এজন্য তাদের জন্য বিশেষ খাবার প্রস্তুত করা হয়, যা সহজে পরিবেশনযোগ্য এবং দীর্ঘ সময় ধরে তাজা থাকে। মহাকাশে খাবারকে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ করা হয়।

মহাকাশে অবসর সময় : নভোচারীদের কাজ শুধু বিজ্ঞান গবেষণা বা মিশন পরিচালনা নয়, তাদের কিছু সময় অবসরও থাকতে হয়। মহাকাশে থাকা অবস্থায় তারা সাধারণত বই পড়া, সিনেমা দেখা, ভিডিও কল করা, কিংবা পরিবারের সঙ্গে কথা বলার মাধ্যমে তাদের মনোবল শক্ত রাখেন। তারা আবার বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড যেমন সংগীত শোনা, ছবি আঁকা এবং ব্যক্তিগত নোট লিখে কাটান।

মহাকাশের জৈবিক প্রভাব : মহাকাশে দীর্ঘদিন অবস্থান করার ফলে শরীরের ওপর অনেক জৈবিক প্রভাব পড়ে। শূন্য গ্রাভিটি পরিস্থিতিতে মানুষের হাড় এবং পেশির ক্ষয় হতে থাকে। পাশাপাশি, মহাকাশে দীর্ঘসময় থাকলে নভোচারীদের হৃদপিণ্ডের হার এবং রক্তচাপেও পরিবর্তন আসে। এক্ষেত্রে, মহাকাশে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি যেমন বিশেষ হেলমেট, শারীরিক ব্যায়াম সরঞ্জাম এবং অন্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এসব সমস্যার মোকাবিলা করা হয়।

মহাকাশ পর্যটন (Space Tourism) : আজকাল মহাকাশ পর্যটন বা স্পেস ট্যুরিজম একটি নতুন ধারণা হয়ে উঠেছে। কিছু বেসরকারি কোম্পানি যেমন স্পেসএক্স, ব্লু অরিজিন এবং ভার্জিন গ্যালাকটিক মহাকাশে পর্যটন সেবা চালু করেছে। এই রকম অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং প্রস্তুতির বিষয়গুলো নভোচারীদের মতোই। তবে এই ধরনের পর্যটন এখনো শুধুমাত্র উচ্চপদস্থ ধনীরা উপভোগ করতে পারেন।

ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযান : নভোচারীদের জন্য ভবিষ্যতের অভিযানও অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। মঙ্গলগ্রহ এবং চাঁদে মানব বসতি স্থাপন বা আরও উন্নত মহাকাশ গবেষণা মিশন ভবিষ্যতের এক বড় লক্ষ্য হতে পারে। নাসা এবং স্পেসএক্স-এর মতো সংস্থাগুলো চাঁদ এবং মঙ্গলগ্রহে নভোচারী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এতে পৃথিবীর বাইরে নতুন জীবন গড়ার সম্ভাবনা এবং প্রযুক্তির উন্নতি সাধিত হবে।