ঈদ সব উৎসব থেকে আলাদা

দেশ রূপান্তর : ঈদের মূল তাৎপর্য কী?

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য হলো- মাহে রমজান লাভ করা এবং রোজার তওফিকপ্রাপ্ত হওয়ার ওপর আনন্দ প্রকাশ করা। আর এই মহা নেয়ামতের ওপর আল্লাহতায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও তার বড়ত্বের বয়ান করাই হলো এই আনন্দের মূল কথা। আনন্দ প্রকাশের পদ্ধতি শরিয়ত এই নির্ধারণ করেছে যে, গোসল করে পাক-পবিত্র হতে হবে। বেজোড় সংখ্যক খেজুর কিংবা কোনো মিষ্টিদ্রব্য খাওয়া, সদকায়ে ফিতর আদায় করা। নিজের কাছে বিদ্যমান কাপড়গুলোর মধ্যে সর্বোত্তম কাপড় পরিধান করা, যা অবশ্যই পরিষ্কার হতে হবে। এরপর তাকবির বলতে বলতে ঈদগাহে যাওয়া। ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করা এবং খুতবা শ্রবণ করা। ফেরার সময় সম্ভব হলে ভিন্ন রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা। আসা-যাওয়ার সময় এবং ঈদগাহে যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাদের সালাম করা। কারও সঙ্গে নতুন সাক্ষাৎ হলে মুসাফাহা করা। একে অন্যকে কবুলিয়াতের দোয়া করা।

এর বাইরে যেসব প্রচলিত বিষয় রয়েছে, যদি সেগুলোতে কোনো নাজায়েজ বিষয় ও অশ্লীলতা না থাকে, তবে তা মুবাহ (বৈধ) পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। ওগুলো ঈদের সুন্নত আমল নয়। ওগুলোকে যদি সুন্নত মনে না করা হয় এবং এত গুরুত্ব না দেওয়া হয় যে, পরিত্যাগ করা দোষণীয়, তবে তাতে অসুবিধা নেই। অন্যথায় ওগুলো পরিত্যাজ্য বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আর যেসব নাজায়েজ ও অশ্লীল কার্যকলাপ সমাজে প্রচলিত রয়েছে সেগুলো সর্বাবস্থাতেই নাজায়েজ, ঈদের বরকতময় দিবসে সেগুলোতে লিপ্ত হওয়া আরও মারাত্মক নাজায়েজ বলে গণ্য হবে।

দেশ রূপান্তর: ঈদ অনুষ্ঠান আসলে কী?

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী : ঈদ আল্লাহতায়ালার নেয়ামত। প্রত্যেক জাতির ঈদ তথা উৎসব রয়েছে। আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের দুটো ঈদ (ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা) দান করেছেন। বাহ্যত অনেকের মনে হতে পারে যে, এটাও অন্যান্য জাতির উৎসবের মতোই একটি উৎসবমাত্র। কিন্তু বাস্তবতা এই যে, ইসলামে ঈদ অন্যান্য জাতির উৎসব থেকে সব দিক দিয়ে স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী। স্বরূপ ও তাৎপর্য এবং বিধান ও উদযাপন-পদ্ধতি সব দিক থেকে এতে ভিন্নতা রয়েছে। যদি ইসলামে ঈদকে শুধু একটি বার্ষিক উৎসব গণ্য করা হয় এবং অন্যান্য জাতির মতো ঈদের সঙ্গেও মনগড়া কার্যকলাপ যুক্ত করা হয় তবে নিঃসন্দেহে ঈদ অভিশাপে রূপান্তরিত হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দেশ রূপান্তরœ : ঈদের উৎসব নিয়ে কিছু বলুন।

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী  : বর্তমানে তো ঈদের উৎসবটাকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ফলে তা উদযাপনের ক্ষেত্রে সাজসজ্জার সীমাতিরিক্ত আয়োজনে ডুবে যেতে দেখা যায়। রমজানের মহামূল্যবান শেষ দশ দিন এ কাজেই বরবাদ হয়ে যায়। এই সময় দিন-রাত মার্কেট ও শপিংমলগুলোতে প্রচণ্ড ভিড় থাকে। মজার বিষয় এই যে, এই কেনাকাটায় ওইসব লোকেরাই সবচেয়ে অগ্রগামী, যাদের না রয়েছে রোজা-তারাবির চিন্তা, না রমজানের মর্যাদা রক্ষার অনুভূতি। তারাই ঈদ-শপিংয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত। হাদিস শরিফে কোরবানি ঈদ সম্পর্কে এসেছে, ‘যার কোরবানি করার ইচ্ছা নেই সে যেন ঈদগাহে না আসে।’ কোরবানি, যা ওয়াজিব কিংবা (কোনো কোনো মাজহাব মতে) সুন্নতে মুয়াক্কাদা, সেটা পরিত্যাগ করার কারণেই যখন এই ধমক দেওয়া হলো যে, সে যেন ঈদগাহে না আসে তাহলে রোজার মতো ফরজ বিধান যারা পরিত্যাগ করে তাদের কীভাবে ঈদগাহে হাজির হওয়ার অধিকার থাকে? হ্যাঁ, কেউ যদি নিজেকে অপরাধী মনে করে অনুতপ্ত হয়ে ঈদগাহে উপস্থিত হয় তাহলে সেটা ভিন্ন কথা।

এখানে একটা বড় ভুল ধারণা এই যে, অধিকাংশ মানুষ ঈদের দিনের জন্য নতুন পোশাক পরিধান করা এবং অন্যদের পরিধান করানো বা হাদিয়া দেওয়াকে ঈদের অপরিহার্য অংশ মনে করে অথচ এই কথাটা একদম গোড়া থেকেই সঠিক নয় যে, ঈদের জন্য নতুন কাপড় পরা সুন্নত; বরং দলিল দ্বারা শুধু এটুকু প্রমাণ হয় যে, নিজের কাছে বিদ্যমান কাপড়গুলোর মধ্যে উত্তম ও পরিষ্কার কাপড়টি পরিধান করবে।

দেশ রূপান্তর : ঈদ উপলক্ষে দেশবাসীর কাছে কিছু বলতে চান?

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী  : ঈদের দিনে প্রতিটি মুসলিম দেশ ও সমাজেই উৎসবের একটি আমেজ বিরাজ করে। বাচ্চারা নতুন পোশাক ও ভালো খাবারের বিষয়টি উপভোগ করে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বিত্তহীনতা, দারিদ্র, সংকট ও অভাব অন্য বহু সময় ও পরিস্থিতির মতো এ দিনেও একটি বেদনাঘন চিত্রের জন্ম দেয়। গরিব মানুষেরা ঈদের আনন্দে নিজেরাও শরিক হতে পারে না, শরিক করতে পারে না নিজেদের শিশু সন্তানদেরও। এ কারণে আনন্দের এ দিনটিতেও বিরাট সংখ্যক মানুষের জীবন কেটে যায় কিছুটা নিরানন্দে। অথচ সচ্ছল, বিত্তবান প্রতিবেশী মুসলমানরা তাদের দিকে খেয়াল রাখলে পরিস্থিতি এমন হতো না।

সদকাতুল ফিতর, জাকাতসহ সাধারণ দান, হাদিয়া ও উপহারের চর্চা দরিদ্র মুসলমানদের প্রতি ব্যাপক হলে ঈদের দিনের আনন্দের চিত্রটি অনেক বেশি সুন্দর হতো। এ বিষয়ে আমি দেশের বিত্তবানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তারা যেন সাধ্যমতো দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ায়, সেই দাওয়াত পেশ করছি।