ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত মিয়ানমার-থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ-চীন-ভারতেও কম্পন

স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে মিয়ানমার ও তার পার্শ্ববর্তী দেশগুলো। শুক্রবার দুপুরের দিকে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এ ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। পরে উৎপত্তিস্থলের ২০ কিলোমিটারের দূরে ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়।

জানা গেছে, মায়ানমার ও থাইল্যান্ড ছাড়িয়ে চিনের ইউনান প্রদেশ, কলকাতা, মণিপুরের ইম্ফল, ভারতের মেঘালয়ের পূর্ব গারো পাহাড় এবং বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামে কম্পন অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পে মিয়ানমারে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৯ জনে দাঁড়িয়েছে, আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। ভূমিকম্পের পর পরই মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য আফটারশকের আশঙ্কায় প্রস্তুত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল দেশটির উত্তর-পশ্চিমের শহর সাগাইং থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে। এলাকাটি রাজধানী নেপিডো থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, ভূমিকম্পের আঘাতে মিয়ানমারের বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক ভবনের ছাদ থেকে খসে পড়েছে। ভূমিকম্প এতই শক্তিশালী ছিল যে হাজার কিলোমিটার দূরের থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের নির্মাণাধীন ৩০ তলা একটি ভবন ধসে পড়েছে।

মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ মান্দালয়ে ২০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। মিয়ানমারের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, জোড়া ভূমিকম্পের পর একটি মসজিদ ধসে পড়ার কারণে এ হতাহত হয়। এদিকে, টাউঙ্গুতে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া একটি মঠ ধসে পড়লে শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন।

জোরালো কম্পন অনুভূত হয়েছে প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডেও। দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই ঘটনায় এখনো পর্যন্ত তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। ৮১ জন নিখোঁজ। ভূমিকম্পের কারণে ব্যাংককে জরুরি বৈঠকে বসেছেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে ভূমিকম্পের পর বন্ধ রয়েছে ব্যাংককের ট্রেন ও মেট্রো পরিষেবা। মিয়ানমারে ভেঙে পড়েছে বিখ্যাত আভা সেতু।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছিল, ব্যাংককে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। যদিও পরে থাইল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী জানান, জরুরি অবস্থা জারি করা হয়নি। 

গত ২০ বছরে মিয়ানমারে এমন তীব্র মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার নজির নেই। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে দেশটিতে সাত মাত্রার ছয়টি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার সবগুলোই ছিল সাগাইং ফল্টের কাছে। মিয়ানমারে সর্বশেষ ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছিল ২০০৯ সালের ১১ আগস্ট। সে বছর ৭.৫ মাত্রার কম্পন রেকর্ড করা হয়। এছাড়া ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ৯.১-৯.৩ মাত্রার ভূমিকম্পন রেকর্ড করা হয়, যার প্রভাব পড়ে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। দুটি ভূমিকম্পেরই উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের কোকো আইল্যান্ডে।

মিয়ানমারের আজকের ভূমিকম্পের প্রভাবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক দফায় কম্পন অনুভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৭। এর উৎপত্তিস্থল মিয়ানমারের মান্দালয়। ভূমিকম্পটির উৎপত্তি ১০ কিলোমিটার গভীরে।

এমন ভূমকম্পনের প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা জানান, মিয়ানামের সেন্ট্রাল বেসিনের একটি ফল্ট বা চ্যুতি আছে। এর নাম ‘সাগাইং ফল্ট’। এটি শান মালভূমি ও সেন্ট্রাল মিয়ানমার বেসিনের মাঝামাঝি এলাকা। সেখানেই এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এলাকাটি ভূমিকম্পপ্রবণ। এর প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কম্পন অনুভূত হয়েছে। 

থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৩০ তলা যে ভবনটি ধসে পড়েছে সেটি নির্মাণাধীন অবস্থায় ছিল। ভূমিকম্পের পর ৪৩ জন নির্মাণশ্রমিক নিখোঁজ রয়েছে। ব্যাংককের চতুচাক পার্কের কাছে ভবনটির ভেতরে ৫০ জন লোক ছিল।

এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভূমিকম্পে মিয়ানমারে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা প্রাণহানি কতটা হয়েছে তা সম্পর্কে এখনও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতী জানিয়েছে, শক্তিশালী ভূমিকম্পে দেশটির মান্দালায়, নেপিদো ও অন্যান্য কয়েকটি এলাকায় ভবন ধসে পড়ে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল সাগাইং শহরে।

ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত ৯১ বছর বয়সী আভা সেতু ভেঙে পড়ে, যা পুরাতন সাগাইং সেতু নামেও পরিচিত। মান্দালয় ও সাগাইং অঞ্চলের মধ্যে ইরাবতী নদীতে ব্রিটিশরা এই সেতু নির্মাণ করেছিল।

বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ভূমিকম্পের তীব্রতায় মিয়ানমারের বিভিন্ন সড়কে ফাটল এবং ভবন থেকে ছাদের টুকরো ভেঙে পড়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে মিয়ানমারের প্রাচীন রাজধানী মান্দালয়ের ধসে পড়া ভবন এবং রাস্তাঘাটের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখা গেছে। যদিও তাৎক্ষণিক সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

শহরের একজন প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে বলেছেন, ‘সবকিছু কাঁপতে শুরু করলে আমরা সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। আমি আমার চোখের সামনে একটি পাঁচতলা ভবন ধসে পড়তে দেখেছি। শহরের সবাই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে এবং কেউ ভবনের ভেতরে ফিরে যেতে সাহস পাচ্ছে না।’

শহরের আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী থেত নাইং ওও রয়টার্সকে বলেছেন, ‘একটি চায়ের দোকান ধসে পড়েছে এবং ভেতরে বেশ কয়েকজন আটকা পড়েছে। আমরা ভেতরে যেতে পারিনি, পরিস্থিতি খুবই খারাপ।’ তৃতীয় একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, শহরের একটি মসজিদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চীনের সিনহুয়া সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী দক্ষিণ-পশ্চিম ইউনান প্রদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, তবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ইয়াঙ্গুনে যোগাযোগ করা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দেশের বৃহত্তম শহরের ভবনগুলো থেকে অনেক লোক দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিল। থাইল্যান্ডের তুলনায় মায়ানমারে ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।