আরেক মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত বলে ধরেই নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেই যুদ্ধের গতিপথ ভিন্ন হয়েছে। এমনকি বিষয়টি ইউরোপ-আমেরিকার দ্বন্দ্বকে আরও প্রকট করে তুলেছে। হামাসের ইসরায়েলে আক্রমণকেও যুদ্ধের এমন আলামত বলেই অনেকে ধারণা করেছিলেন। এরপর ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের ক্রমাবনতি। সবকিছুকে একপাশে বিবেচনায় নিয়ে একটা কথা বলতেই হবে, যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু তালিকায় এখন এক নম্বরে ‘ইরান’। মুসলিম বিশ্বে সামরিক শক্তিতেও ইরানের অবস্থান সবার ওপরে। একের পর এক মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত এই দেশটি যদি আক্রান্ত হয়, তাহলে হয়তো বিশ্ব এক পারমাণবিক যুদ্ধের মুখোমুখিও হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আরোহণের পর বিশ্বরাজনীতিতে বেশ কিছুটা উত্তাপ লেগেই আছে। তার একপেশে ইসরায়েল সমর্থন ক্রমাগত আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছে। যে কারণে তার তর্জন-গর্জনের কড়া প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে ইরানের তরফ থেকেও।  

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে ‘বোমা হামলা’ করার হুমকির প্রথম প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, কোনো ‘বহিরাগত আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে ‘কঠোর প্রতিশোধ’ নেওয়া হবে। ঈদুল ফিতরের নামাজের সময় নিজ বক্তব্যে এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এ সময় তিনি একটা বিশেষ ইঙ্গিত দেন। বলেন, ‘যদি তারা আমাদের দেশের ভেতরে রাষ্ট্রদ্রোহ উসকে দেওয়ার কথা ভাবে, যেমনটা তারা গত বছরগুলোতে করেছে। ইরানি জনগণ নিজেই তাদের জবাব দেবে।’ খামেনি আরও বলেন, গাজা ও লেবাননের ঘটনাবলির কারণে এই বছরের পবিত্র রমজান মাস বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের জন্য ‘তিক্ত’ ছিল, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি নৃশংসতায় আমেরিকা সরাসরি জড়িত। তিনি ইসরায়েলকে পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে পশ্চিমা শক্তির একটি ‘প্রক্সি শক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, অপরাধী গোষ্ঠীকে ফিলিস্তিন থেকে উৎখাত করতে হবে। সবাইকে জানাতে হবে যে আমাদের অবস্থান আগের মতোই রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইহুদিবাদী সরকারের শত্রুতাও অপরিবর্তিত রয়েছে।

মার্চের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে চিঠি লিখে সতর্ক করেছিলেন যে, তেহরানকে হয় নতুন করে আলোচনায় রাজি হতে হবে, নয়তো সামরিক সংঘর্ষের মুখোমুখি হতে হবে। খামেনি এই আলটিমেটাম প্রত্যাখ্যান করে জোর দিয়ে বলেছেন ইরান কেবল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই আলোচনায় অংশ নেবে। সম্প্রতি এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘যদি তারা কোনো চুক্তি না করে, তবে বোমা হামলা হবে। এটি এমন বোমা হামলা হবে, যা তারা আগে কখনো দেখেনি। এমন সম্ভাবনা রয়েছে যে, যদি তারা কোনো চুক্তি না করে, তাহলে আমি তাদের ওপর চার বছর আগের মতো সেকেন্ডারি শুল্ক আরোপ করব।’ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নিতে তার প্রশাসনের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান নীতিগতভাবে আলোচনার বিরুদ্ধে না হলেও, ওয়াশিংটনকে প্রথমে তার অতীতের ‘অপরাধ’ সংশোধন করতে হবে এবং আস্থা পুনর্র্নির্মাণ করতে হবে।

ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের ফেলো এবং জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রভাষক বারবারা সøাভিন আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ট্রাম্পের অতীত ইতিহাস এবং পূর্ববর্তী চুক্তি থেকে সরে আসার কারণে ইরানিরা তার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। তারা চিন্তিত, তবে বেশিরভাগই ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার অর্থনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনঃস্থাপন এবং বৃদ্ধি নিয়ে, যা আমরা এরই মধ্যে দেখেছি। ইরানি মুদ্রার নাটকীয়ভাবে অবমূল্যায়ন হয়েছে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্ব রয়েছে এবং আমি মনে করি এটি ইরানিদের শারীরিক আক্রমণের চেয়ে বেশি চিন্তিত করে। তবে তারা আক্রান্ত হলে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।’

তেল ট্যাঙ্কার জব্দ : পারস্য উপসাগরে দুটি বিদেশি তেল ট্যাঙ্কার জব্দ করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই দুটি তেল ট্যাঙ্কার ডিজেল পাচারের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। এই অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই সর্বশেষ এই জব্দের ঘটনাটি ঘটল। জব্দের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে তেহরান টাইমস বলছে সৌদি আরব, কাতার এবং কুয়েত গোপনে তেহরানকে জানিয়েছে যে, তারা ইরানে হামলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের বিমান ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে না।

ট্রাম্পকে সতর্ক করল রাশিয়া : ইরানকে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াভকভ বলেছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর বোমা হামলা হলে, তা বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি পদক্ষেপ, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের পদক্ষেপ আমরা উপযুক্ত মনে করি না এবং এর নিন্দা জানাচ্ছি।’ 

পরমাণু যুদ্ধের শঙ্কা : ইরান যে শরীরী ভাষায় অনেকটা চোখে চোখ রেখে আমেরিকার সঙ্গে কথা বলছে, পাল্টা হামলার হুমকি দিচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধ আসন্ন। যার কেন্দ্রে থাকবে ইরান। আর তাতে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার হতে পারে। ইরান হয়তো সম্পদশালী মিত্রদের প্রত্যক্ষ সহায়তা পাবে না। কিন্তু হামাস-হুতিদের মতো পরীক্ষিত মাঠের যোদ্ধাদের বন্ধু হিসেবে পাবেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশ্ব এখন একটি পরমাণু যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, এ কথা বলাই যায়।

লেখক : সাংবাদিক

mshossain.sujan@gmail.com