মোস্তাফিজের জন্য বাংলা শিখছিলেন ওয়ার্নার!

বাংলা শেখার চেষ্টা করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার ডেভিড ওয়ার্নার—শুধু একজন সতীর্থের সঙ্গে ঠিকঠাক যোগাযোগের জন্য! ২০১৬ আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের অধিনায়ক ছিলেন তিনি, আর দলের অন্যতম অস্ত্র ছিলেন বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান।

একজন অজি, আরেকজন সাতক্ষীরার ছেলে। দুই প্রান্তের মানুষ একসঙ্গে মাঠে নামছেন, অথচ ভাষা মিলছে না! এক ভক্ত ওয়ার্নারকে এই ভাষা-বিভ্রাট নিয়ে খোঁচা দিলে টুইটারে তিনি লিখেছিলেন, 'আমি ফিজের জন্য গুগল ট্রান্সলেশন ব্যবহার করছিলাম। চেষ্টা করছি কীভাবে বাংলা বলতে হয়। হা হা। থোরা থোরা।'

ভাষার বাধা মেটাতে হালকা রসিকতা করলেও সমস্যাটা ছিল একেবারে বাস্তব। একবার মাঠে মোস্তাফিজকে মাথার দিকে ইশারা করে ‘মাথা খাটিয়ে বল করার’ নির্দেশ দিতে গিয়ে উল্টো বিপদে পড়েন ওয়ার্নার। মোস্তাফিজ সেটাকে বুঝেছিলেন ব্যাটসম্যানের মাথার ওপর বাউন্সার দিতে বলছেন! এরপরের বলেই তিনি ছুড়ে দেন খাঁটি বাউন্সার!

আইপিএলে এমন ভুল বোঝাবুঝি নতুন কিছু নয়। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে বিশ্বের নানা দেশের খেলোয়াড়েরা এসে ভিড় করেন একই দলে। অথচ তাদের ভাষা, উচ্চারণ, ভাব প্রকাশ—সবকিছুতেই থাকে পার্থক্য। কোথাও কোথাও তা হাসির খোরাক হলেও, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তা হয়ে দাঁড়ায় কঠিন চ্যালেঞ্জ।

২০০৮ সালে প্রথম আইপিএলে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন পীযুষ চাওলাও। ইংরেজি বুঝলেও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের উচ্চারণে সমস্যা হতো উত্তর প্রদেশ থেকে আসা এই লেগস্পিনারের। ব্রেট লি, শন মার্শ কিংবা কোচ টম মুডির কথা বুঝতে হলে যুবরাজ সিংকেই ডাকতে হতো অনুবাদকের ভূমিকায়!

এমনকি পরের দিকে কলকাতা নাইট রাইডার্সে খেলার সময় কোচ জ্যাক ক্যালিস ও সাইমন ক্যাটিচদের কথা বুঝে নিতে চাওলা ভরসা রাখতেন রিংকু সিংয়ের ওপর। একবার এক সাক্ষাৎকারে মজা করেই বলেছিলেন, 'আমি অনেক সময় বলতাম, ভাই তোকে যা বলেছে ওরা, একটু বুঝিয়ে দে।'

২০১৬ সালে মোস্তাফিজকে নিয়েও হায়দরাবাদ দল চ্যালেঞ্জে পড়ে। সেবার দলের কোচ ছিলেন টম মুডি। এক সাক্ষাৎকারে তিনিও বলেন, 'প্রথম দিকে ওকে (মোস্তাফিজ) নিয়ে সত্যিই সমস্যায় পড়েছিলাম। আপনি ভাবছেন আপনি যা বোঝাতে চাইছেন, সেটা পরিষ্কার। কিন্তু খেলোয়াড়টি একদম অন্যভাবে নিচ্ছে।'

দলে তখন একমাত্র বাংলাভাষী ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রিকি ভুই। তাঁকেই মোস্তাফিজের দোভাষী বানায় হায়দরাবাদ। পরে রিকি এক সাক্ষাৎকারে মজা করে বলেছিলেন, 'মোস্তাফিজ দুইটা জিনিস ভয় পায়—ব্যাটিং করা আর ইংরেজিতে কথা বলা।'

তবে ভাষার বাধা টপকে মোস্তাফিজ সে বছর রূপকথাই লিখেছিলেন। ১৬ ম্যাচে ১৭ উইকেট, সেরা পারফরমারদের একজন হয়ে জিতেছিলেন শিরোপা। বিদেশিদের মধ্যে প্রথমবারের মতো হয়েছিলেন উদীয়মান ক্রিকেটারও।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো পরের বছর হায়দরাবাদে রশিদ খানকে নেওয়ার সময় টিম ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিত করে, যেন তাঁর সঙ্গে আরেকজন আফগান ক্রিকেটারও থাকেন। আফগানিস্তানের মোহাম্মদ নবী হয়ে ওঠেন রশিদের ভাষার সেতু। কোচিং স্টাফ বা অধিনায়কের কথাগুলো রশিদকে ঠিকমতো বোঝানোর দায়িত্বই ছিল তাঁর কাঁধে।

২০২২ আইপিএলে গুজরাট টাইটানসে এই একই ভূমিকায় দেখা যায় রশিদ খানকেই। তিনি তখন দোভাষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন নূর আহমেদের জন্য।

এবারের আইপিএলে সব দলই পেয়েছে নতুন চেহারা। মেগা নিলামের পর সর্বোচ্চ ছয়জন খেলোয়াড় ধরে রাখতে পারায় অধিকাংশ দলের খেলোয়াড়রাই এই প্রথম একসঙ্গে খেলছেন। ভাষা নিয়ে নতুন করে আবারও শোনা যাচ্ছে হাসি-কান্নার গল্প।

তবে এই চিত্র বদলে যাবে বলেই বিশ্বাস করেন নিউজিল্যান্ডের সাবেক কোচ মাইক হেসন। পাঞ্জাব কিংসে কোচিং করানো এই কিউই বলেন, 'দিন শেষে এটা তো ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগই! আগামী এক-দুই দশকের মধ্যে আপনি দেখবেন, বিদেশিরাই ভারতীয়দের ভাষা রপ্ত করছে।'

আর মোস্তাফিজ-ওয়ার্নার জুটির মিষ্টি ভুলে ভরা সে অধ্যায়? সেটা এখন আইপিএলের ইতিহাসে রসালো এক স্মৃতি মাত্র।