মাটিখেকোদের হামলায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ৫ সদস্য আহত

কুমিল্লায় গোমতী নদীর চরে অবৈধভাবে মাটি কাটতে বাঁধা দেওয়ায় মাটিখেকোদের হামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাঁচ সদস্য আহত হয়েছে। গতকাল শনিবার রাতে কুমিল্লার গোমতীর চরে এ ঘটনা ঘটে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র গোমতী নদীর চরে অবৈধভাবে মাটি কাটছে। এমন খবরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েক জন সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে দুটি ভেকু, দুটি ট্রাক্টর ও তিনটি ট্রাক আটক করেন। এ সময় মাটিখেকোদের আক্রমণে মহানগর কমিটির কয়েকজন আহত হন। তাৎক্ষণিক খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর একটি টহলদল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অভিযুক্তদের আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য বলেন, ৫ আগস্টের পরও মাটিখেকোদের দৌরাত্ম্য কমেনি। আমরা দেখেছি আগস্টের বন্যায় কী পরিমাণ দুর্ভোগ আমাদের ভোগ করতে হয়েছে। আমরা চাইব আজকের মতো অভিযান চলমান থাকবে, প্রশাসন তার সুদৃষ্টি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করবে।

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুমিল্লা মহানগরের সদস্য সচিব রাশেদুল হাসান বলেন, প্রথমে মাটিখেকোরা মহানগর কমিটির সংগঠক ইনজামুল হক রানার ওপর আক্রমণ করে। তাই ছাত্র-জনতা মাটিখেকোদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এতে অর্ধশত ছাত্র অংশ নেয়। গোমতী নদীর মাটি কাটা বন্ধের দাবি জানান তিনি।

এ ঘটনা গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের কেন্দ্রীয় সংগঠক নুর হাসান বলেন, গোমতী নদীকে বাঁচাতে হলে আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। মাটিখেকোদের জায়গা কুমিল্লায় হবে না।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের উদাসীনতার সুযোগে বাঁধের মাটি কেটে নেওয়ায় পুরো এলাকা হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত গোমতী নদীর দুই পাশে দেদারছে চলে মাটি কাটা। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা না মেনেই প্রতিদিন শত শত ট্রাক ওঠানামা করছে নদীর বাঁধ দিয়ে। শীত আসার পরপরই দুই বাঁধজুড়ে শুরু হয় মাটি কাটার মহোৎসব। গোমতী চরে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন করা হয়ে থাকে। অথচ গোমতী নদীর চরে একটি চক্র নির্বিঘে কেটে নিচ্ছে গোমতী পাড়ের ফসলি জমি। এতে হুমকির মুখে নদী পাড়ের কৃষি ব্যবস্থাও।

কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, গোমতীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার ও বাম তীরে ৩৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ রয়েছে।

নদীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি গোমতী নদী ঘিরে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মাটি কাটা চক্র। জেলার আদর্শ সদর উপজেলার গোলাবাড়ি থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত নদীর টিক্কারচর, সংরাইশ, জালুয়াপাড়া, অরণ্যপুর, চাঁন্দপুর ব্রিজ এলাকা, কাপ্তানবাজার, পালপাড়া, আলেখারচর, বাবুর বাজার, শিমাইলখাড়া, বালিখাড়া, রামনগর, পূর্বহুড়া, নানুয়ার বাজার, মিথিলাপুর, বাহেরচর, শ্রীপুর, গোবিন্দপুর, শ্যামপুর, মালাপাড়া, মনোহরপুর, হাসনাবাদ, কংশনগর বাজার, রামচন্দ্রপুর, এদবারপুর, কাঁঠালিয়া, কিং-বাজেহুড়া, বাজেহুড়া, দেবিদ্বার ও মুরাদনগরের বিভিন্ন এলাকাসহ নদীর অন্তত দুই শতাধিক স্পটে মাটি কাটা চক্র বেশ সক্রিয়। এ ছাড়াও শ্রমিক দিয়ে মাটি কেটে ট্রাক্টরযোগে বাসাবাড়ি, পুকুর ভরাট, ইটের ভাটাসহ নানা স্থানে মাটি সরবরাহ করছে। এতে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধসহ ঐসব এলাকার রাস্তাঘাটগুলো বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপ-পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, যেভাবে গোমতীর চরের কৃষিজমির মাটি কাটা হচ্ছে তা বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। কুমিল্লার শাক-সবজি উৎপাদনের অন্যতম উৎস গোমতীর চর। এ বছর যেভাবে মাটি কাটা হচ্ছে, তাতে চর থেকে অন্তত ৭০০ একর ফসলি জমি হারাবে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, গোমতী নদীর চরের মাটি কাটা বন্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট এ নিয়ে কাজ করছেন।

কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, গোমতীর চরে কিছু লোক চুরি করে মাটি কেটে নিচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা দিলেও মাটি কাটা বন্ধ হচ্ছে না। আমরা চাই গোমতীর চরের স্থানীয়রা গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুক। আমরা এরই মধ্যে কিছু লোকের নাম সংগ্রহ করেছি, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন এবং সরকারিভাবে মামলা হবে।